তিস্তা প্রকল্পে যেভাবে সহায়তা করতে চায় চীন
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা মহাপরিকল্পনায় সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এ প্রকল্পে বেইজিংয়ের নতুন করে সক্রিয় আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত তৈরি করলেও, বাস্তবায়নের পথে ভারতের অবস্থান ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা মহাপরিকল্পনার শুরু থেকেই প্রয়োজনীয় সব ক্ষেত্রে কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। অর্থাৎ সমীক্ষা, প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন- সব পর্যায়েই যুক্ত হতে চায় দেশটি।
তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চীন প্রাথমিক সমীক্ষার কিছু কাজও করেছিল। তবে ভারতের আপত্তির কারণে তখন সরকার প্রকল্পটি নিয়ে আর এগোয়নি।
এদিকে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিও দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত। বাংলাদেশ বছরের পর বছর এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে চুক্তির জন্য তাগিদ দিয়ে আসছে।
প্রায় এক দশক আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। সে সময় ভারত সরকার তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আপত্তিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তবে বর্তমান বিএনপি সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম বিষয়ই হচ্ছে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন। সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এটিকে সরকারের অগ্রাধিকারের প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বৃহস্পতিবার ঢাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, বাংলাদেশের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত তিস্তা প্রকল্পে চীন সহযোগিতা করতে আগ্রহী হয়েছে। এর বাইরে অন্য কোনো বিষয় চীনের বিবেচনায় নেই বলেও তিনি জানান।
ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করা ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদীর একটি তিস্তা। ভারতের সোলামো লেক থেকে উৎপন্ন হয়ে নদীটি সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে রংপুর জেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। পরে কুড়িগ্রামের চিলমারীর কাছে এটি ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রকল্পের আওতায় তিস্তা নদীর তীর ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রংপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার কৃষিতে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, নদীভাঙন কমবে এবং নদীকেন্দ্রিক শিল্প ও পর্যটনেরও বিকাশ ঘটতে পারে।
কর্মকর্তারা জানান, তিস্তার কোথাও প্রস্থ প্রায় পাঁচ কিলোমিটার, কোথাও দেড় কিলোমিটার, আবার কোথাও তিন কিলোমিটার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নদীর গভীরতা বাড়িয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রস্থ কমিয়ে দেড় থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে আনার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এতে নদীর তীরবর্তী শত শত একর জমি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে, যা ভূমিহীন মানুষের পুনর্বাসন কিংবা শিল্পায়নের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
বিএনপি সরকার যেমন তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তেমনি চীনও এতে সহযোগিতার ব্যাপারে জোরালো আগ্রহ দেখাচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভারতের প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে এগোতে হবে।
নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল মালয়েশিয়া। সেখান থেকে তিনি চীন সফর করেন। বিশ্লেষকদের মতে, ওই সফরে আলোচিত দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক করিডর এবং তিস্তা প্রকল্প ছিল সবচেয়ে স্পর্শকাতর।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক হুমায়ুন কবিরের মতে, এই দুটি বিষয়ে বাংলাদেশকে মূলত ত্রিমুখী প্রতিযোগিতার বাস্তবতা মোকাবিলা করতে হবে- চীন-যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে ঘিরে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এই বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতাকে বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে সহযোগিতায় রূপ দিতে পারে, তার ওপরই সম্ভাব্য প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে।
