স্পিকার
‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিরোধ যুদ্ধ না করলে দেশ এখনো পাকিস্তান থাকতো’
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৫:২২ পিএম
মহাখালীর রাওয়া কনভেনশন সেন্টারে ‘মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ভূমিকা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ছবি: সংগৃহীত
পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু না করলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। মুক্তিযুদ্ধকে কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ নয়, ‘বাঙালির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি।
বীর বিক্রম খেতাব প্রাপ্ত এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাঁচটি ব্যাটালিয়ন আলাদাভাবে ‘বিদ্রোহ করে জনগণকে সংগঠিত করেছিল’।
শনিবার (১১ জুলাই) ঢাকার মহাখালীর রাওয়া কনভেনশন সেন্টারে ‘মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ভূমিকা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছিলেন তিনি।
স্বাধীনতার এবং সার্বভৌম্যত্যর ক্ষেত্রে কোনো প্রকার আপস মেনে নেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
স্পিকার বলেন, ‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট যদি ১৯৭১ সালে পাক বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু না করত, তাহলে এই দেশ এখনো পাকিস্তান থাকত।’
ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিজের কাছে ‘অত্যন্ত প্রিয় একটি নাম’ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, কমিশন পাওয়ার দিন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এ নাম তিনি হৃদয়ে ধারণ করবেন।
সেনাবাহিনীতে যোগদান, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে আসা, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া এবং নিজের সেনাজীবনের বিভিন্ন স্মৃতি তুলে ধরেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা হাফিজ উদ্দিন।
তিনি বলেন, ‘এখন ৮২ বছর বয়স হয়েছে। মনে হয় যে নিজের ইচ্ছায় কিছুই করি নাই। উপরওয়ালাই পরিচালিত করেছেন। ভাগ্যে যা লেখা আছে, সেভাবেই সময় যাচ্ছে।’
১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে স্পিকার বলেন, সেটি হয়েছিল ছয় দফার ভিত্তিতে। তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সম্পদ ও সুযোগের সমবণ্টন ছিল না। সেই বৈষম্য নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ক্ষুব্ধ ছিল।
তিনি বলেন, “পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশকে যেভাবে তত্ত্বাবধান করে, যেভাবে সমৃদ্ধ করে, পূর্ব পাকিস্তান ছিল অবহেলিত। পূর্ব পাকিস্তানে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় না।
‘তখনকার আন্দোলনটির নাম ছিল ‘সাম্যের আন্দোলন’। দুটি অঞ্চলের মধ্যে সমতা ছিল না। সম্পদের সমবণ্টন ছিল না। এজন্য পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ক্ষুব্ধ ছিল। এটিকে সম্বল করে আওয়ামী লীগ তৎকালীন নির্বাচনটি জিতেছিল।’
এরপর শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে স্পিকার বলেন, “এমনকি যখন ক্র্যাকডাউন করল পাকিস্তান আর্মি ২৫ মার্চ নিরীহ বাঙালিদের উপরে। অব্যবহিত পূর্বে প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সাহেব, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে গিয়েছেন। গিয়ে বলেছেন যে পাকিস্তানিরা আক্রমণ করতে যাচ্ছে। দেশের মানুষ স্বাধীনতা চায়, এখনও সময় আছে, আপনি স্বাধীনতা ঘোষণা করুন।
‘শেখ মুজিবুর সাহেব বললেন যে না, আমি বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে পারি না। পাকিস্তান ভাঙাতে আমার কোনো অবদান থাকুক, এটি আমি চাই না। সুতরাং স্বাধীনতার ঘোষণা আমি দিব না। স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। পাকিস্তান ক্র্যাকডাউন চালালো। লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে উদভ্রান্ত হয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। পাক বাহিনী মেশিনগান, মর্টার, কামান দিয়ে নিরীহ মানুষ গুলি করে হত্যা করছে।’
এ সময় যেকোনো জাতি অবদমিত হয়ে আত্মসমর্পণ করতে পারত মন্তব্য করে হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘সেই মুহূর্তে জনগণের জীবন এবং নারীদের সম্ভ্রম রক্ষায় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই সময় স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন মেজর জিয়াউর রহমান। এটি হল প্রকৃত সত্য। যে ঘোষণায় জাতি উদ্দীপ্ত হয়েছে, অনুপ্রাণিত হয়েছে। হাজার হাজার ছাত্র-যুবক ঘরবাড়ি ছেড়ে দৌড়ে এসেছে যে যুদ্ধ করবে।’
মুক্তিযুদ্ধকে কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই মন্তব্য করে স্পিকার বলেন, এটি ছিল জনতার যুদ্ধ।
তিনি বলেন, ‘১৯৭১ যারা দেখে নাই তারা দুর্ভাগা। আমরা ভাগ্যবান, ১৯৭১ সাল দেখতে পেয়েছি। আমাদের তো মাত্র পাঁচটা ব্যাটালিয়ন ছিল। চার হাজার সৈনিক। মুক্তিবাহিনী ছিল প্রায় লক্ষের মত।’
ছাত্র, শিক্ষক, রিকশাচালক, দোকানদার, বাসের চালক, সহকারী, পিয়নসহ সব পেশার মানুষ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। কিন্তু এই কথা ইতিহাসে নাই।’
স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যুদ্ধ ও যোদ্ধাদের অবদান যথেষ্টভাবে আসেনি বলেও অভিযোগ করেন হাফিজ উদ্দিন।
তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে যে দলটি ক্ষমতায় আসল, তারা বলল যে ৭ই মার্চে একটা ভাষণ শুনেছি, ওই ভাষণেই দেশ স্বাধীন। মাঝখানে যে যুদ্ধ, হাজার হাজার মানুষ জীবন দিল, লক্ষ মানুষ আত্মাহুতি দিল, তার কোনো উল্লেখ নাই স্বাধীনতাযুদ্ধের পরবর্তীকালের ইতিহাসে।’
রাজনীতিকরা সাধারণত অন্যের কৃতিত্ব ‘হাইজ্যাক’ করেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, “কাউকে কৃতিত্ব দিতে চান না, নিজেরা এবং নিজের দলনেতাকে ছাড়া। কিন্তু প্রকৃত তথ্য হল, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনতার যুদ্ধ। একটি জাতির যুদ্ধ।”
পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি জাতির সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে পরাজিত হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘একটা আর্মি আরেকটা আর্মির সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারে। কিন্তু পাকিস্তানিরা বাঙালি জাতির সঙ্গে যুদ্ধ করতে চেয়েছে। এই কারণেই পরাজিত হয়েছে। জাতির সঙ্গে যুদ্ধ করা কোনো সামরিক বাহিনীর কাজ নয়।
