সংসদ ভবন এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৭:০৬ পিএম
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবিতে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করেছে পুলিশ। পরে তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে।
এর আগে টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও সোমবার এইচএসসি পরীক্ষা আয়োজনের প্রতিবাদে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে গিয়ে অবস্থান নেন।
দিনভর রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালনের পর মঙ্গলবার বিকেল পৌনে ৬টার দিকে শিক্ষার্থীরা পুলিশের ব্যারিকেড অতিক্রম করে সংসদ ভবনের সামনে পৌঁছান।
সকালে সাড়ে ১১টার দিকে তারা রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড়ে প্রথম দফায় সড়ক অবরোধ করেন। প্রায় ৪৫ মিনিট পর, দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে অবরোধ তুলে মিছিল নিয়ে নিউমার্কেট হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। পরে পুলিশ সেখান থেকে সরে যেতে বললে তারা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সামনে গিয়ে কিছু সময় অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
দুপুরের পর আন্দোলনকারীরা আবার সায়েন্স ল্যাব মোড়ে ফিরে দ্বিতীয় দফায় প্রায় এক ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করেন। এরপর জাতীয় সংসদ ভবনের উদ্দেশে পদযাত্রা শুরু করেন।
সায়েন্স ল্যাব থেকে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দিতে মিছিলটি সংসদ ভবনের দিকে অগ্রসর হয়। আসাদ গেট এলাকায় পুলিশ ব্যারিকেড দিলেও শিক্ষার্থীরা সেটি অতিক্রম করে দক্ষিণ প্লাজার প্রবেশমুখে গিয়ে অবস্থান নেন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং তাদের উত্থাপিত দাবিগুলোর দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংসদ ভবন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
এর আগে বিকেল ৫টার দিকে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষে সিটি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী মো. মিরাজ হোসেন তিন দফা দাবি ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে এবং তার ‘অসংগতিপূর্ণ’ বক্তব্যের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
আরও পড়ুন: শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে সংসদের সামনে শিক্ষার্থীরা
এছাড়া ১৩ জুলাই প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে যারা পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষা দিয়েছেন এবং যারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, তাদের স্বার্থ বিবেচনায় পরীক্ষাটি পুনরায় নেওয়ার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে আগামীকালের নির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত করে নতুন রুটিন প্রকাশ এবং শিক্ষার্থীবান্ধব প্রশ্নপত্র প্রণয়নের আহ্বান জানান।
এর আগে বিকেল পৌনে ৪টার দিকে শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব মোড়ে অবস্থান নিলে মিরপুর সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। কর্মসূচির সময় শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। তাদের অভিযোগ, সকাল থেকে আন্দোলন চললেও সরকারের পক্ষ থেকে কেউ আলোচনায় আসেননি।
সোমবার টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার প্রতিবাদে মঙ্গলবার সকাল থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, সমাবেশ, মিছিল এবং সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা।
তাদের অভিযোগ, পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্রে ভুল ছিল এবং প্রশ্নের মান অস্বাভাবিকভাবে কঠিন হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় অভিন্ন প্রশ্নপত্র অনেক বেশি কঠিন হওয়ায় পরীক্ষার্থীরা ভোগান্তিতে পড়েছেন বলেও দাবি করেন তারা।
বিকেল চারটার কিছু আগে শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করেন। এর আগে বেলা পৌনে তিনটার দিকে তারা ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থান নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দেন।
এরও আগে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। পরে পলাশীর মোড় হয়ে শিক্ষা বোর্ডের সামনে যান। সকালেও প্রায় এক ঘণ্টা সায়েন্স ল্যাব মোড়ে সড়ক অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা।
রাজধানীর বাইরে উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, বরিশালে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক এবং ময়মনসিংহে ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। পাশাপাশি কুমিল্লা, বগুড়া ও ময়মনসিংহেও বিক্ষোভ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থী মো. সামির বলেন, কোথায় গিয়ে দাবি জানাবেন তা বুঝতে না পেরে তারা টিএসসির দিকে যেতে চেয়েছিলেন। তবে শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশ বাধা দিয়েছে। হামলায় অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।
ঢাকা আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী অপূর্ব ফিরোজ বলেন, আগামীকালের পরীক্ষা শেষ করে আবারও সায়েন্স ল্যাব মোড়ে আন্দোলনে যোগ দেবেন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি। শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থান কর্মসূচির সময় শিক্ষার্থীরা স্লোগান দেন। একপর্যায়ে ইট নিক্ষেপ ও গেটে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটলে সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নেন।
সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সায়েন্স ল্যাব মোড়ে সড়ক অবরোধের পর শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে গেলে ভিসি চত্বরের সামনে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। পরে তারা নীলক্ষেত হয়ে টিএসসিগামী সড়কে অবস্থান নেন।
উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কেও সকাল থেকে অবরোধ চলে। উত্তরা ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, অবরোধ চলাকালে ওই সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল।
সায়েন্স ল্যাবের আন্দোলনে ঢাকা সিটি কলেজ, ঢাকা আইডিয়াল কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ, লালমাটিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বিএফ শাহীন কলেজসহ ১২ থেকে ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থী ইয়াসিন আরাফাত বলেন, পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার আটটি প্রশ্নের মধ্যে দুটি ভুল ছিল। বাকি ছয়টি প্রশ্নও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার মানের মতো কঠিন ছিল। এতে কেউ ফেল করলে তার দায় শিক্ষামন্ত্রী নেবেন কি না -এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
ঢাকা আইডিয়াল কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আহনাফ মুনজি বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক পরীক্ষার্থী কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি। কেউ পথে পড়ে গেছেন, আবার কারও প্রবেশপত্র ভিজে নষ্ট হয়েছে। এসব পরিস্থিতির দায়ও শিক্ষামন্ত্রীর বলে মন্তব্য করেন তিনি। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনা করতে না পারলে এমন শিক্ষামন্ত্রী তারা চান না বলেও জানান।
রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার রব্বানী হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীরা সড়ক ছেড়ে দেওয়ার পর রাজধানীতে যান চলাচল আবার স্বাভাবিক হয়ে আসে।
