আজ তাজউদ্দীন আহমদের জন্মবার্ষিকী
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:০২ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং জাতীয় চার নেতার একজন তাজউদ্দীন আহমদের ১০১তম জন্মবার্ষিকী আজ (২৩ জুলাই)। ১৯২৫ সালের এই দিনে গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার দরদরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি মেধা, দূরদর্শিতা, সততা, দক্ষতা ও আদর্শিক নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে স্মরণীয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে তাজউদ্দীন আহমদের অবদান অনন্য। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠন করে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক নেতৃত্ব দেন। তার বিচক্ষণ নেতৃত্ব, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্তই মুক্তিযুদ্ধকে সুসংগঠিত ও সফল পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।
তাজউদ্দীন আহমদ ছাত্রজীবন থেকেই প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। তিনি ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলে লেখাপড়া শেষে ঢাকা কলেজ এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা লাভ করেন। ছাত্রাবস্থাতেই গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা ও বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন।
১৯৪৪ সালে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগের বৈষম্যমূলক নীতিতে হতাশ হয়ে দলটি ত্যাগ করেন। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ (বর্তমান আওয়ামী লীগ) প্রতিষ্ঠায় তিনি অন্যতম উদ্যোক্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
আরো পড়ুন : নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে আলোচনায় যাদের নাম
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন সংগঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হন। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সংগঠনকে তৃণমূল পর্যন্ত শক্তিশালী করেন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি প্রণয়ন, প্রচার ও সাংগঠনিক বিস্তারে তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অন্যতম প্রধান সহযোদ্ধা। ছয় দফাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনায়ও তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান সংগঠক। তার সাংগঠনিক দক্ষতার ফলে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা শুরু এবং বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তারের পর তাজউদ্দীন আহমদ ভারতের উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১০ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয় এবং ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (বর্তমান মুজিবনগর) সেই সরকারের শপথ অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি এবং তার অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি রেখে তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি কার্যত মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হিসেবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব দেন।
মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় তাজউদ্দীন আহমদের অবদান বহুমাত্রিক। তার নেতৃত্বে সমগ্র দেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে মুক্তিবাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়।
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ ও সামরিক সমন্বয় নিশ্চিত করা হয়। প্রায় এক কোটি শরণার্থীর আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে ভারতের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় করতে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এছাড়াও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হয় তার নেতৃত্বেই। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মনোবল অটুট রাখতে নিয়মিত নির্দেশনা ও বার্তা প্রচার করা হয়। তার অসাধারণ নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধ সুসংগঠিত রূপ পায় এবং ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফিরে আসা পর্যন্ত তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের পর তিনি অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন, পুনর্বাসন, উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গঠনে তার অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হওয়ার পর তাজউদ্দীন আহমদকে গৃহবন্দি করা হয়। পরে তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। একই বছরের ৩ নভেম্বর গভীর রাতে কারাগারের ভেতরে তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ইতিহাসে নির্মম এই দিনটি জেল হত্যা দিবস হিসেবে পরিচিত।
তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন ক্ষমতার চেয়ে আদর্শকে বড় করে দেখা একজন রাজনীতিবিদ। সততা, স্বচ্ছতা, আত্মত্যাগ এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের জন্য তিনি আজও সব রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধকে বাস্তবে সফলভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে তাজউদ্দীন আহমদের অবদান অপরিসীম। তার বিচক্ষণতা, রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্ব এবং দেশপ্রেম বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। নতুন প্রজন্মের কাছে তাজউদ্দীন আহমদের আদর্শ, নেতৃত্ব এবং আত্মত্যাগ আজও অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।
