চিফ প্রসিকিউটর
‘বদির পরিকল্পনাতেই’ কাউন্সিলর একরাম হত্যাকাণ্ড
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:০০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হককে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যার পরিকল্পনার নেপথ্যে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি ছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
রোববার (২৬ জুলাই) শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে একরাম হত্যা মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গ্রহণ করার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক (সারকামস্ট্যানশিয়াল) প্রমাণের ভিত্তিতে মামলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির বিরুদ্ধে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির অভিযোগ আনা হয়েছে।
আবদুর রহমান বদিকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমরা তাকে সংসদ সদস্য বলতে লজ্জাবোধ করি। তিনি একজন মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন। তার অত্যন্ত পরিকল্পিত (মেটিকুলাস) নকশার ভিত্তিতেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল।"
আমিনুল ইসলাম আরও দাবি করেন, একরাম ছিলেন বদির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। তিনি বলেন, "পরবর্তীতে সাক্ষ্য-প্রমাণে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। একরামকে হত্যার পর তার সম্পত্তিও বিভিন্ন কৌশলে আত্মসাৎ করা হয়েছিল এবং এর নেপথ্যে আবদুর রহমান বদি ছিলেন।"
রোববার সকালে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের পক্ষে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়।
আদালত অভিযোগ গ্রহণের পাশাপাশি পলাতক আট আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। একই সঙ্গে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার থাকা তিন আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদিও রয়েছেন।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ, অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, অবসরপ্রাপ্ত মেজর রুহুল আমিন, সাবেক ডিজিএফআই কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার নাজমুস সাকিব এবং লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আশেকুর রহমান।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদনে এসব আসামির সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে এবং ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নিয়েছেন।
তিনি জানান, যেসব আসামি ইতোমধ্যে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার রয়েছেন, তাদের শোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়েছে। আর পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। মামলার পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য আগামী ২৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখ নির্ধারণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, "তৎকালীন সরকার তাদের মতের বাইরে গেলেই বিভিন্ন ব্যক্তিকে টার্গেট করত। কাউকে অপহরণ করে আয়নাঘরে রাখা হতো, আবার কাউকে কথিত ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হতো। একরাম হত্যা তারই একটি উদাহরণ।"
তিনি বলেন, "ঘটনার সময় একরামের মোবাইল ফোন চালু ছিল। সেই অবস্থায় তার স্ত্রী ও মেয়েরা গুলির শব্দ এবং একরামের শেষ কথোপকথন শুনতে পেয়েছিলেন।"
এক প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, "রুহুল আমিন ও আশেকুর রহমান সরাসরি গুলি করেছিলেন। আর মিফতাহ উদ্দিনসহ অন্য র্যাব কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে ছিলেন।"
তিনি আরও অভিযোগ করেন, "হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও শেখ হাসিনা বিষয়টি যাতে আর না বাড়ে, সে জন্য একরামের স্ত্রীকে ডেকে নিয়ে ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়ে বিষয়টি নিয়ে আর উচ্চবাচ্য না করতে বলেছিলেন।"
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভে র্যাবের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর একরামুল হক।
ঘটনার পর র্যাবের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে একরামুল হককে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী এবং ইয়াবা কারবারের অন্যতম গডফাদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে বলা হয়, তার বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মাদকদ্রব্য আইনে একাধিক মামলা ছিল।
তবে নিহতের ভাই এহসানুল হক বাহাদুর সে সময় দাবি করেন, ডিজিএফআইয়ের পরিচয় দেওয়া সাদা পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি জমি বিক্রির বিষয়ে কথা বলার কথা বলে ২০১৮ সালের ২৬ মে রাত সাড়ে ৯টার দিকে একরামুল হককে বাড়ি থেকে নিয়ে যান। পরে গভীর রাতে কথিত বন্দুকযুদ্ধে তার নিহত হওয়ার খবর জানতে পারেন তারা।
পরে একরামুল হকের মৃত্যুর সময়কার একটি অডিও রেকর্ড প্রকাশ্যে এলে ঘটনাটি নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। অভিযোগ ওঠে, পরিকল্পিতভাবে তাকে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার করা হয়েছে।
একরামুল হকের বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
