×

জাতীয়

কোন প্রকল্প যাবে একনেকে, কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

Icon

নাজমুল হাসান

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৮ পিএম

কোন প্রকল্প যাবে একনেকে, কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

ছবি : সংগৃহীত

একটি সড়ক হবে, একটি সেতু নির্মাণ করা হবে, নতুন রেললাইন বসবে কিংবা কোনো এলাকায় হাসপাতাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা পানি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে উঠবে- এমন বড় বড় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে সরকারের নীতিগত ও আর্থিক অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। আর সরকারের বড় বিনিয়োগ প্রকল্পের সেই অনুমোদন প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হলো জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি- একনেক।

প্রতি সপ্তাহে একনেক সভা ঘিরে তাই সরকারি মহলে তৈরি হয় বিশেষ আগ্রহ। কোন প্রকল্প অনুমোদন পেল, কত টাকা ব্যয় হবে, বাস্তবায়নের সময় কত, কোনো প্রকল্পের ব্যয় বাড়ল কি না- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একনেকের সিদ্ধান্তের দিকে নজর থাকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা এবং অর্থনীতিবিদদের।

সহজ করে বললে, দেশের উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নের পথে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি দরজা হলো একনেক।

একনেক আসলে কী?

‘জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি’-এই দীর্ঘ নামের সংক্ষিপ্ত রূপ একনেক। এটি সরকারের এমন একটি নির্বাহী কমিটি, যেখানে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব বিবেচনা ও অনুমোদন দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন: একনেক সভা কী, কীভাবে কাজ করে

তবে একনেকের কাজ শুধু প্রকল্প অনুমোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা, বিনিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রস্তাব বিবেচনা এবং বৈদেশিক সহায়তার লক্ষ্যমাত্রা ও তার অগ্রগতি পর্যালোচনাও এর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

অর্থাৎ সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অর্থনৈতিক দিকটি দেখার ক্ষেত্রে একনেক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।

একনেক সভায় কী হয়?

একনেক সভাকে একটি প্রকল্পের ‘চূড়ান্ত পরীক্ষার টেবিল’ হিসেবে ভাবা যায়। কোনো মন্ত্রণালয় বা সরকারি সংস্থা বড় কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলে সেটির প্রয়োজনীয়তা, ব্যয়, বাস্তবায়নকাল, সম্ভাব্য সুফলসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে পর্যালোচনার পর তা একনেকের সামনে উপস্থাপন করা হয়। সভায় প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, ব্যয়ের যৌক্তিকতা, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে একনেক প্রকল্পটি অনুমোদন, সংশোধন কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারে।

কারা নেতৃত্ব দেন?

একনেকের চেয়ারম্যান হলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর অনুপস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী বিকল্প চেয়ারম্যান হিসেবে সভায় সভাপতিত্ব করেন।

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা একনেকের সদস্য হিসেবে থাকেন। এর মধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু, কৃষি, তথ্য, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, পরিকল্পনা, শিল্প, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, বাণিজ্য, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা রয়েছেন।

আরও পড়ুন: শেষ ধাপে নতুন পে-স্কেল

কোনো প্রকল্প সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হলে সেই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীও সভায় অংশ নেন।

কর্মকর্তাদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ

একনেকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সচিব, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব, অর্থ বিভাগের সচিব, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সভার কার্যক্রমে সহায়তা করেন।

পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সচিবও প্রয়োজন অনুযায়ী একনেকের সামনে প্রকল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

একনেকের শুরু কীভাবে?

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠার সময় থেকেই উন্নয়ন পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। ১৯৭২ সালে মন্ত্রিসভাকে সাচিবিক সহায়তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাঠামো গড়ে ওঠে।

পরবর্তী সময়ে দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ কার্যক্রমকে আরও সংগঠিত করার লক্ষ্যে একনেকের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। ১৯৮২ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একনেকের গঠন ও কার্যাবলি নির্ধারণ করা হয়। তখন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। শিল্প ও বাণিজ্য, পূর্ত এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরাও এতে যুক্ত ছিলেন।

আরও পড়ুন: ছবি ছাড়া এনআইডি দেওয়ার সুযোগ নেই, রুল খারিজ

১৯৯১ সালে দেশে গণতান্ত্রিক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর একনেকের নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসে। ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে অর্থমন্ত্রী একনেকের সভাপতি হন। পরের মাস অক্টোবর থেকে সরকারপ্রধান একনেকের সভাপতির দায়িত্ব নেন।

পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কমিটির গঠন ও কার্যপরিধিতে পরিবর্তন আনা হয়।

কোন কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় একনেক?

একনেকের কার্যপরিধি বেশ বিস্তৃত। এর প্রধান কাজগুলো হলো-

প্রথমত, সরকারের বিনিয়োগ প্রকল্পের প্রস্তাব বা ডিপিপি বিবেচনা ও অনুমোদন করা।

দ্বিতীয়ত, সরকারি খাতে ৫০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ ব্যয়সংবলিত প্রকল্পে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সুপারিশ বিবেচনা ও অনুমোদন দেওয়া।

তৃতীয়ত, অনুমোদিত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা।

চতুর্থত, বেসরকারি উদ্যোগ, যৌথ উদ্যোগ কিংবা অংশীদারত্বমূলক বিনিয়োগের প্রস্তাব বিবেচনা করা।

পঞ্চমত, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারণী বিষয় পর্যালোচনা করা।

ষষ্ঠত, বৈদেশিক সহায়তার বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনা ও অনুমোদন এবং সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা।

একটি প্রকল্প কীভাবে একনেকে আসে?

একটি বড় উন্নয়ন প্রকল্পের যাত্রা সাধারণত একনেকের টেবিল থেকেই শুরু হয় না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সরকারি সংস্থা প্রথমে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করে। এরপর প্রকল্পের বিস্তারিত প্রস্তাব বা ডিপিপি তৈরি করা হয়।

প্রকল্পের সম্ভাব্যতা, ব্যয়, বাস্তবায়নকাল, অর্থায়নের উৎস এবং প্রত্যাশিত সুফলসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই করা হয়। সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা শেষে প্রকল্পটি একনেকের সভায় উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হয়।

সভায় প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

একনেক অনুমোদন মানেই কাজ শেষ নয়

একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদিত হওয়ার পরই প্রকৃত অর্থে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করার পথ তৈরি হয়। এরপর আসে বাস্তবায়নের পালা।

কাজ ঠিকমতো এগোচ্ছে কি না, নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ হচ্ছে কি না কিংবা প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বাড়ছে কি না—এসব বিষয়ও নজরদারির আওতায় থাকে।

তাই একনেকের ভূমিকা শুধু ‘অনুমোদন দেওয়া’ নয়; উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতির ওপরও এর নজর থাকে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ একনেক?

একনেকের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে দেশের উন্নয়ন বাজেটের বড় একটি অংশ। সড়ক-মহাসড়ক, সেতু, রেলপথ, বিদ্যুৎ, পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ ও অবকাঠামোসহ নানা খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প একনেকের মাধ্যমে অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় যায়।

একটি প্রকল্পে কত টাকা খরচ হবে, কত সময়ে শেষ হবে এবং এর মাধ্যমে জনগণ কী সুবিধা পাবে—এসব বিষয় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে কিংবা ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে সেটির প্রভাব পড়ে সরকারি অর্থের ওপর। ফলে একনেকের আলোচনায় শুধু প্রকল্পটি প্রয়োজনীয় কি না, সেটিই নয়; এর ব্যয় ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

একনেকের টেবিলে যে প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ

একটি প্রকল্প একনেকে উঠলে স্বাভাবিকভাবেই কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে-

  • প্রকল্পটি কেন প্রয়োজন?
  • এতে কত টাকা ব্যয় হবে?
  • প্রকল্পটি কত সময়ে শেষ হবে?
  • অর্থের উৎস কী?
  • প্রকল্প বাস্তবায়নের পর জনগণ কী সুফল পাবে?
  • ব্যয় ও সময় নির্ধারণ কতটা বাস্তবসম্মত?

এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর নিশ্চিত করাই প্রকল্প মূল্যায়নের অন্যতম উদ্দেশ্য।

উন্নয়ন পরিকল্পনার ‘গেটওয়ে’

বাংলাদেশের উন্নয়ন অর্থনীতিতে একনেক তাই কেবল একটি সরকারি সভা নয়। এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনা, সরকারি বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র।

একদিকে নতুন প্রকল্পের অনুমোদন, অন্যদিকে চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা—দুই ক্ষেত্রেই একনেকের ভূমিকা রয়েছে। ফলে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কোন পথে এগোবে, কোথায় বিনিয়োগের অগ্রাধিকার থাকবে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ কীভাবে ব্যবহৃত হবে—এসবের সঙ্গে একনেকের সিদ্ধান্তের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ইবির হলে অবৈধ বসবাস ছাত্রদল কর্মীর, ছাত্রশিবির নেতাকে চড়

ইবির হলে অবৈধ বসবাস ছাত্রদল কর্মীর, ছাত্রশিবির নেতাকে চড়

কিডনি রোগে ভুগছেন ১৫ বছর, অর্থাভাবে বন্ধ চিকিৎসা

কিডনি রোগে ভুগছেন ১৫ বছর, অর্থাভাবে বন্ধ চিকিৎসা

হুইলচেয়ারে ভর করে ঢাবিতে আসা আলী নুরের পাশে ডাকসু নেতা

হুইলচেয়ারে ভর করে ঢাবিতে আসা আলী নুরের পাশে ডাকসু নেতা

সাংবাদিক সজল আহম্মদ খান আর নেই

সাংবাদিক সজল আহম্মদ খান আর নেই

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App