জুলাই হত্যা মামলা
আসামি হাসিনাসহ ৫০, সত্যতা মেলেনি ৪৯ জনের বিরুদ্ধে
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৩২ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
২০২৪ সালের জুলাই মাসে শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকায় রাকিবুল হোসেন (২৯) নিহতের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৫০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় মামলার ৪৯ আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. মমিনুল ইসলাম গত ১৩ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। তদন্ত শেষে তিনি জানান, সার্বিক তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে ৫০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি কিংবা ঘটনার সময় তারা মিরপুর এলাকায় উপস্থিত ছিলেন না, এমন ৪৯ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া কয়েকজনের নাম অসৎ উদ্দেশে এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।
অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন, সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার বিপ্লব কুমার, সাবেক সংসদ সদস্য মাইনুল হোসেন খান নিখিল, কামাল আহমেদ মজুমদার, ইলিয়াস মোল্লা, মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা এস এম মান্নান কচি, এখলাস উদ্দিন মোল্লা ও সাবেক কাউন্সিলর কাসেম মোল্লাসহ আরো অনেকে।
অন্যদিকে অব্যাহতির সুপারিশ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন খান, কুষ্টিয়া-৩ আসনের সাবেক এমপি কামরুল আরেফিন, পাবনা-৪ আসনের সাবেক এমপি গালিবুর রহমান শরীফ, আলোক হেলথকেয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. লোকমান হোসেন এবং ব্যবসায়ী ইলিয়াস আহমেদ তালুকদার।
অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ২০১৮ সালে সরকারি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারির পর ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট সেই প্রজ্ঞাপন অবৈধ ঘোষণা করলে নতুন করে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন এবং তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
আরো পড়ুন : মেট্রো স্টেশনে বোমাতঙ্ক, ঘিরে রেখেছে পুলিশ
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। অভিযোগপত্রে আরো বলা হয়, শেখ হাসিনাসহ অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আন্দোলন দমনে বিভিন্ন নির্দেশনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন এবং আন্দোলন প্রতিহত করার জন্য সমন্বিতভাবে কাজ করেছেন।
তদন্ত চলাকালে নিহত রাকিবুলের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিবারের আপত্তির কারণে তা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই রাতে মিরপুর-১০ গোলচত্বরে আন্দোলনকারীদের একটি মিছিলে গুলিবর্ষণের সময় অজ্ঞাত ব্যক্তির ছোড়া গুলিতে রাকিবুল হোসেনের গলার বাঁ পাশে গুলি লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে বাদী আবু বক্কর সিদ্দিকী ঝিনাইদহ থেকে ঢাকায় এসে মরদেহ নিজ জেলায় নিয়ে যান। তৎকালীন পরিস্থিতির কারণে সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত ছাড়াই ২০ জুলাই ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। পরে ২০ সেপ্টেম্বর মিরপুর মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন তিনি।
বাদী আবু বক্কর সিদ্দিকী জানান, রাকিবুল তাঁর দুই ছেলের মধ্যে ছোট। তিনি মিরপুর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থিত এমআইএসটি থেকে যন্ত্রকৌশলে স্নাতক সম্পন্ন করে একটি প্রতিষ্ঠানে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং মিরপুর-১১ এলাকায় একটি মেসে থাকতেন। মামলার অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়ে তিনি আগে জানতেন না। তাঁর প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হবে এবং তিনি ন্যায়বিচার পাবেন।
