হট্টগোল-বাকবিতণ্ডায় উত্তপ্ত সংসদ, ক্ষুব্ধ স্পিকার
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২৫ পিএম
ফাইল ছবি
সংসদে হট্টগোল, অসৌজন্যমূলক আচরণ ও কার্যপ্রণালী বিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের সময় সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা ও বাকবিতণ্ডার পর তিনি সতর্ক করে বলেন, সংসদে অসহিষ্ণুতা ও একে অপরকে কথা বলতে না দেওয়ার প্রবণতা চলতে থাকলে এর ভবিষ্যৎ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
জাতীয় সংসদ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর জন্য একটি সর্ব্বোচ্চ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও সংসদীয় রীতিনীতি বজায় না থাকায় তিনি সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কার কথা জানান। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে সংসদ সদস্যরা হট্টগোল শুরু করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি সম্মান রেখে বক্তব্য দেওয়ার সময় শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথম থেকেই বিরোধীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে অসংসদীয় মনোভাব প্রদর্শন করে আসছেন। সংসদকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজের শ্রেণিকক্ষ মনে করছেন এবং নিজেকে শিক্ষকের ভূমিকায় বসিয়ে বাকিদের ছাত্রের মতো শাসন করার দুঃসাহস দেখাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: মক্কা চুক্তিতে কী আছে, বাংলাদেশের আগ্রহের কারণ কী?
শফিকুর রহমান বলেন, শিক্ষকতা করতে হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় খোলা উচিত যেখানে পছন্দসই শিক্ষার্থীরা গিয়ে ভর্তি হবে। সরকারের এই ধরনের আচরণকে সংসদীয় ফ্যাসিবাদের রূপ হিসেবে অভিহিত করে শফিকুর রহমান জোর দাবি জানান, সংসদের সৌন্দর্য রক্ষা ও মর্যাদার তাগিদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অবিলম্বে তার অসংসদীয় মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে হবে এবং কার্যপ্রণালী থেকে সেই বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করতে হবে। তা না হলে বিরোধী দলের সদস্যরা অপমান সহ্য করে সংসদে অবস্থান করবেন না বলে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদের নিরপেক্ষতা রক্ষা এবং কার্যপ্রণালী বিধি বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে বক্তব্য রাখেন স্পিকার। তিনি বলেন, বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত গণতন্ত্রকে সচল এবং জনগণের এই প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর রাখতে হলে রুলস অব প্রসিডিউর কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। তিনি বিরোধীদলীয় নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাকবিতণ্ডা এবং বিরোধী দলের সদস্যদের হট্টগোলের কড়া সমালোচনা করে বলেন, সরকারি দলের ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরার পূর্ণ স্বাধীনতা বিরোধী দলের রয়েছে, কিন্তু একজন মন্ত্রীকে বক্তব্য শেষ করতে না দিয়ে সমস্বরে চেঁচামেচি করে বিচার বাণী স্তব্ধ করে দেওয়া কোনো সুস্থ সংসদীয় রীতি হতে পারে না।
নিজের ৪০ বছরের দীর্ঘ সংসদীয় অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে স্পিকার অতীতের তিক্ত ইতিহাস ও অতীতে স্পিকারকে হত্যার মতো নির্মম ঘটনার কথা তুলে ধরেন এবং অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি ভালো সংসদ উপহার দেওয়ার আহ্বান জানান। বিরোধীদলীয় নেতার উদ্দেশ্যে স্পিকার স্পষ্ট করেন যে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে কোনো অসংসদীয় শব্দ থাকলে তা পরীক্ষা করে দেখে এক্সপাঞ্জ করা হবে, তবে সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে কোনো পক্ষকে চাপ দেওয়া তার উদ্দেশ্য ছিল না। বক্তব্য দেওয়া এবং শোনার মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতা না থাকলে দেশে গণতন্ত্র ব্যর্থ হবে বলে স্পিকার সতর্ক করে দেন।
স্পিকারের বক্তব্যের পর পুনরায় আলোচনায় অংশ নেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি কার্যপ্রণালী থেকে বক্তব্য বাদ দেওয়া বা পরীক্ষা করে দেখার অতীতের বিভিন্ন দৃষ্টান্ত তুলে ধরে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অসংসদীয় বক্তব্য স্পষ্ট এবং তা বারবার ঘটে চলেছে। স্পিকার সংসদকে সঠিকভাবে পরিচালনার দায়িত্ব পালন করলেও ট্রেজারি বেঞ্চে সদস্য বেশি থাকা সংক্রান্ত স্পিকারের মন্তব্যের কড়া প্রতিবাদ জানান বিরোধীদলীয় নেতা। সংসদকে সংখ্যা বা গুণে বিভক্ত করার পক্ষপাতী নন উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ভালো কাজে বিরোধী দল সবসময় সরকারের সঙ্গে একাত্ম থাকবে এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যেন স্পিকার সংসদ সদস্যদের কোনো ধারায় বিভক্ত না করে সমান মর্যাদায় সংসদ পরিচালনা করেন।
এদিকে অধিবেশনে নিজের ক্ষোভ তুলে ধরে পয়েন্ট অব অর্ডারে কথা বলেন প্রবীণ সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। বাজেট বক্তৃতায় একটি রূপক গল্প বলার কারণে তার বক্তব্যের কিছু অংশ এক্সপাঞ্জ করায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং স্পিকারের কাছে জানতে চান কোন শব্দটি অসংসদীয় ছিল। সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী আক্ষেপ করে বলেন, তার দাড়ি ও ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে কটাক্ষ করে তার ব্যক্তিগত ইজ্জত ও সংসদের মর্যাদায় আঘাত হানা হয়েছে। তিনি প্রবীণ সদস্য হিসেবে তার সম্মান রক্ষার দাবি জানান এবং বিষয়টির সুরাহা ও বিচার চেয়ে স্পিকারের কাছে আনুষ্ঠানিক নোটিশের জবাব প্রার্থনা করেন।
সবশেষে সার্বিক পরিস্থিতির পর্যালোচনা করে স্পিকার সমাপনী বক্তব্য দেন। মনিরুল হক চৌধুরীর বিষয়ে স্পিকার জানান, ঘটনার সময় তিনি না থাকায় বিষয়টি কার্যপ্রণালী দেখে পরীক্ষা করবেন এবং অসংসদীয় কিছু থাকলে ব্যবস্থা নেবেন।
একই সঙ্গে সব সংসদ সদস্যের উদ্দেশ্যে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা জারি করে স্পিকার বলেন, যেভাবে একে অপরকে বাধা দেওয়া হচ্ছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। স্পিকার যখন কোনো সদস্যকে বসতে বলেন, সেই আইন বা রীতি না মানলে সংসদ বেশিদিন সচল রাখা সম্ভব নয়। সংসদ পরিচালনায় চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেওয়ায় গভীর হতাশা ব্যক্ত করে এবং সব পক্ষকে ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়ে স্পিকার আসরের নামাজের জন্য অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন।
