গারো পাহাড়ে মাদক কারবারিদের ‘নিষিদ্ধ এলাকা’, সাংবাদিকদের হত্যার হুমকি
শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এলাকায় মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, মাদক পাচারের তথ্য সংগ্রহে সাংবাদিকদের প্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তের কয়েকটি এলাকাকে কার্যত ‘নিষিদ্ধ এলাকা’ বানিয়ে ফেলেছে একটি চক্র। গোমড়া, সন্ধ্যাকুড়া, হলদীগ্রাম ও রাংটিয়া এলাকায় সাংবাদিক প্রবেশ করলে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
মাদক পাচার নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে দৈনিক ভোরের কাগজের শেরপুর প্রতিনিধি খোরশেদ আলমের। ২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে নলকুড়া ইউনিয়নের সন্ধ্যাকুড়া বাজারে তার ওপর হামলা হয় বলে অভিযোগ। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। এ সময় তার মোটরসাইকেল, মোবাইল ফোন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে যাওয়া হয়। পরে পুলিশ মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করলেও প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও মোবাইল ফোনটি উদ্ধার হয়নি বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভারত সীমান্তবর্তী এসব এলাকা দিয়ে দিন-রাত বিপুল পরিমাণ মাদক পাচার হচ্ছে। মাদক পরিবহনে বিভিন্ন যানবাহন ব্যবহার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কয়েকটি যানবাহন আটক হলেও পাচার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে দাবি তাদের।
এমনকি মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার পরও কয়েকজন মাদক কারবারি প্রকাশ্যে তৎপর রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
তাদের আরও অভিযোগ, মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িতদের একটি অংশ স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তারা বিভিন্ন ধরনের সুরক্ষা ও আইনি সহায়তা পেয়ে থাকে। কোনো কারবারি গ্রেপ্তার হলেও দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে আবার একই কাজে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করছেন, কয়েকটি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
২০২৫ সালে নলকুড়া ইউনিয়নের গোমড়া গ্রামের অনাহারি ও গৃহহীন বিধবা সখিনা বেগমকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেন সাংবাদিক খোরশেদ আলম। সংবাদটি প্রকাশের পর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা আসে। সেই অর্থে সখিনা বেগমের জন্য একটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করা হয়।
খোরশেদ আলমের দাবি, ঘর নির্মাণের সময় ওই এলাকায় গেলে স্থানীয়ভাবে মাদক পাচারসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য তার কাছে আসে। এ সময় স্থানীয় এক ইউপি সদস্য তাকে ওই এলাকায় যেতে নিষেধ করেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
পরে মাদক পাচার নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পরই সন্ধ্যাকুড়া বাজারে তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেন ওই সাংবাদিক।
এলাকাবাসীর দাবি, মাদক পরিবহনে আটটি কভার্ড ভ্যান ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে চারটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছে বলে তারা জানান। তবে বাকি চারটি এখনও মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করছেন, মাদক পাচার ওই এলাকার কয়েকটি পরিবারের দীর্ঘদিনের পেশায় পরিণত হয়েছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম এতে যুক্ত হচ্ছে। তবে ‘এলাকার ৯০ শতাংশ মানুষ মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত’—স্থানীয়দের এমন দাবির পক্ষে সরকারি বা নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
গ্রামবাসীদের ভাষ্য, ২০২৫ সালে ওই এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি পিকআপভ্যানে করে মাদক নিয়ে ময়মনসিংহের ফুলপুরে যান। সেখানে একটি গোয়েন্দা সংস্থা তাদের অনুসরণ করলে তারা পিকআপভ্যান নিয়ে নকলা উপজেলার একটি পল্লি এলাকায় চলে আসেন।
পরে গরুচোর সন্দেহে স্থানীয়দের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয় এবং গণপিটুনিতে মসলেউদ্দিন ও নুর ইসলাম নামে দুই ব্যক্তি নিহত হন বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। তাদের মৃত্যুর পর পরিবারের অন্য সদস্যরা আবারও মাদক কারবারে জড়িয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব তথ্যের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচার নিয়ে চলতি মাসে অনুষ্ঠিত ঝিনাইগাতী উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেলসহ কমিটির সদস্যরা। সভায় মাদক পাচার বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নলকুড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রুকুনুজ্জামান বলেন, এলাকায় মাদক পাচার রোধে স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
ঝিনাইগাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম নুর মোহাম্মদ বলেন, তিনি সম্প্রতি থানায় যোগ দিয়েছেন। যোগদানের পর কয়েকটি অভিযানে তিন লাখ টাকার বেশি মূল্যের মাদক উদ্ধার করা হয়েছে এবং মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। মাদক পাচার রোধে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার পরও সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচার কীভাবে অব্যাহত রয়েছে? পাশাপাশি মাদক পাচারের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা যদি হামলা ও হত্যার হুমকির মুখে পড়েন, তাহলে সীমান্তের এসব এলাকায় কারা প্রভাব বিস্তার করছে—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
