বাঙ্গরায় আর্সি নদীতে সেতু, পূরণ হচ্ছে শত বছরের স্বপ্ন
রায়হান চৌধুরী, মুরাদনগর (কুমিল্লা)
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:২৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
কখনো বাঁশের সাঁকো, কখনো জীবনের ঝুঁকি এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম কেটে গেছে কুমিল্লার বাঙ্গরা উপজেলার বাঙ্গরা পশ্চিম ইউনিয়নের ধনপতিখোলা ও কালারাইয়া গ্রামের মানুষের। একটি পাকা সেতুর অপেক্ষায় থাকা এসব মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে। আর্সি নদীর ওপর নির্মাণাধীন গার্ডার সেতুর ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শেষ হওয়ায় দৃশ্যমান হয়েছে এলাকাবাসীর শত বছরের লালিত স্বপ্ন।
রোববার (৩০ আগস্ট) বিকেলে সেতুটির ছাদ ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়। এতে নদীপাড়ের গ্রামগুলোতে দেখা দিয়েছে আনন্দ ও স্বস্তি। প্রায় ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের অক্টোবরে।
৪২ মিটার দীর্ঘ এই গার্ডার সেতুটির দুই পাশে রয়েছে মোট ২০০ মিটার সংযোগ সড়ক। সংশ্লিষ্টদের আশা, চলতি বছরের শেষ নাগাদ সেতুটির নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হবে। এরপর সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হলে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকট অনেকটাই কেটে যাবে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বোয়িং বিমান কিনবে বাংলাদেশ
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধনপতিখোলা থেকে কালারাইয়া ও রোয়াচালা হয়ে সড়কটি দৌলতপুরের প্রধান সড়কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু আর্সি নদীর ওপর সেতু না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে এ পথে চলাচলকারী মানুষকে একটি নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভর করতে হতো। বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ আরও বাড়ত। শিক্ষার্থী, কৃষক, নারী, শিশু ও বয়স্কদের নদী পারাপারে পোহাতে হতো চরম ভোগান্তি।
সেতু নির্মাণের দৃশ্য দেখে আবেগাপ্লুত ৮৫ বছর বয়সী প্রবীণ বাসিন্দা হাজী তৈয়ব আলী বলেন, আমার জীবনের বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল এই সেতুটি দেখে যাওয়া। এতদিনে আমাদের দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে।
প্রবীণ বাসিন্দা হাসু রানী বলেন, জীবনে কত মেম্বার-চেয়ারম্যান দেখলাম, কিন্তু কেউ এই সেতুটি করতে পারেনি। আমার এই বয়সে সেতুটি দেখে যেতে পারব, তা কখনো ভাবিনি। কৃষক মজিবুর রহমান বলেন, কোনো দিন ভাবিনি এখানে পাকা সেতু হবে। সেতুটি হলে আমাদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমবে। কৃষিপণ্য পরিবহনেও সুবিধা হবে।
গৃহবধূ সুভা রানী ঘোষ বলেন, শত বছরের সাধনার মতো ছিল আমাদের এই সেতু। এখন এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এতে এলাকার মানুষের অনেক উপকার হবে। স্থানীয় বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, সেতু না থাকায় শিক্ষার্থীদেরও দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। যোগাযোগ সমস্যার কারণে অনেক শিক্ষার্থী সময়মতো স্কুলে যেতে পারত না। সেতুটি চালু হলে এ সমস্যা অনেকটাই দূর হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বাঁশের সাঁকোই ১০ গ্রামের মানুষের একমাত্র ভরসা এমন দীর্ঘদিনের জনদুর্ভোগ নিয়ে ‘ভোরের কাগজ’-এ সংবাদ প্রকাশের পর কাঙ্ক্ষিত সেতুর নির্মাণ এগিয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। গণমাধ্যম শুধু মানুষের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে না, কখনো কখনো সেই সংবাদই সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সমাধানের পথ তৈরি করে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সেতুটির নির্মাণকাজ দ্রুত সম্পন্ন করে জনসাধারণের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হোক এটাই এখন এলাকাবাসীর প্রত্যাশা।
বাঙ্গরা পশ্চিম ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রুহুল আমিন বলেন, এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল আর্সি নদীর ওপর সেতু নির্মাণ। এর আগে অনেকে চেষ্টা করলেও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার পর প্রায় ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতুটি নির্মাণ হচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে এলাকার মানুষের যোগাযোগ, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হয়ে সেতুটি চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হলে ধনপতিখোলা, কালারাইয়া, রোয়াচালাসহ আশপাশের প্রায় ১০ গ্রামের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। সহজ হবে কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও জরুরি রোগীদের চলাচল। দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে এসব গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রায়ও গতি ফিরবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
