গরম বাড়তেই তীব্র হচ্ছে লোডশেডিং
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪০ এএম
ছবি : সংগৃহীত
গরমের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে আবারও বেড়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। রাজধানী ঢাকায় পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় হলেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীরা। বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়ছে শিল্পকারখানা, খামার, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও পরিবহন খাতেও।
রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা মুসলিমা জাহানের অভিজ্ঞতাই এর একটি উদাহরণ। গত রোববার অফিস শেষে রাত ৯টার দিকে বাসায় ফেরেন তিনি। ফ্রিজে রাখা খাবার ওভেনে গরম করে খেতে বসার সময়ই বিদ্যুৎ চলে যায়। চার্জার লাইটের আলোয় কোনোভাবে রাতের খাবার শেষ করেন পরিবারের সদস্যরা।
এরপর সাড়ে চার বছর বয়সী মেয়ের খাবার গরম করতে গিয়ে নতুন সমস্যায় পড়েন মুসলিমা। চুলায় গ্যাসও ছিল না। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও বিদ্যুৎ ও গ্যাস—কোনোটিই না আসায় শেষ পর্যন্ত মেয়েকে শুকনো খাবার খাওয়াতে হয়।
মুসলিমা জানান, আগে মেয়ের স্কুলের টিফিন বাসায় তৈরি করে দিতেন। কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে এখন অনেক সময় বাইরে থেকে খাবার কিনে দিতে হচ্ছে। তার মতো আরও অনেক পরিবার একই ধরনের সমস্যায় পড়ছে।
গত দেড় মাস ধরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে দেশের বিভিন্ন খাতে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা তুলনামূলক বেশি। বিদ্যুতের অভাবে খামারিরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। আয় কমেছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালকদেরও।
গরম বাড়তেই বেড়েছে লোডশেডিং
চলতি মাসের শুরুতে তাপমাত্রা কিছুটা কমায় বিদ্যুতের চাহিদাও নেমে আসে। তখন জাতীয় পর্যায়ে চাহিদা ছিল প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিংও কিছুটা কমে আসে। তবে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবারও বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে।
সোমবার বেলা ৩টার দিকে দেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২১৬ মেগাওয়াট। ওই সময় বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়।
দেশীয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মেগাওয়াট। তবে কয়লা সংকট ও বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এসব কেন্দ্র থেকে বর্তমানে ৪ হাজার ৬০০ থেকে ৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।
ভারতের আদানি পাওয়ার থেকে সাধারণত প্রায় ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে দৈনিক গড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।
গ্যাস সংকটে কমছে বিদ্যুৎ উৎপাদন
দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে দৈনিক প্রায় ২৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ৮৫ কোটি ঘনফুট। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও ৫ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে গেছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা সংকট চলতি সপ্তাহের মধ্যে সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আদানি পাওয়ারের কাছ থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর জন্য নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, অতিবৃষ্টি এবং কয়লা পরিবহনের রেলপথে সমস্যার কারণে আদানি পাওয়ার চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে পারছে না বলে জানিয়েছে।
কমছে দেশীয় গ্যাস, এলএনজিতেও অনিশ্চয়তা
বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়াকে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে দৈনিক প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা থাকলেও সময়মতো কার্গো না আসায় কয়েক দিন ধরে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ৭০ থেকে ৭১ কোটি ঘনফুট।
দেশীয় গ্যাস ও এলএনজি মিলিয়ে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ২৩২ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকারি হিসাবে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। তবে বাস্তবে এ চাহিদা প্রায় ৫৫০ কোটি ঘনফুট বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
পেট্রোবাংলার পরিচালক প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, চলতি মাসে এলএনজি কার্গো নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো জটিলতা হয়নি। অক্টোবরের কার্গোগুলোও যাতে সময়মতো দেশে আসে, সে বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে।
অযৌক্তিক ব্যয় কমানোর পরামর্শ
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলমের মতে, জ্বালানি খাত আমদানিনির্ভর হওয়ায় ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। এই বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়ার মতো অর্থের সংকট রয়েছে।
তার দাবি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অযৌক্তিক ব্যয় কমানো গেলে ছয় মাসের মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।
তিনি বলেন, আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের বদলে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দ্রুত উৎপাদন শুরুর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
