কবে আসছে পে স্কেলের গেজেট
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় ‘জাতীয় পে স্কেল-২০২৬’ অনুমোদনের পর এক সপ্তাহের মধ্যে গেজেট প্রকাশের কথা জানানো হলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ হতে চলেছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং, জুডিশিয়াল সার্ভিসের কিছু সুবিধা সমন্বয় এবং বেতন-পেনশনের হিসাব ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির কারণে গেজেট প্রকাশে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসব কাজ শেষ করে আগামী সপ্তাহের শেষ নাগাদ প্রজ্ঞাপন প্রকাশের চেষ্টা চলছে।
নতুন পে স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে কোন গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারী নতুন কাঠামোয় ঠিক কত টাকা পাবেন, ইনক্রিমেন্ট ও চাকরির মেয়াদ কীভাবে বিবেচনায় নেওয়া হবে এবং বকেয়া বা অ্যারিয়ার কীভাবে পরিশোধ করা হবে -এসবের বিস্তারিত নির্দেশনা মিলবে গেজেট প্রকাশের পর।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদন ৩১ আগস্ট
গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘জাতীয় পে স্কেল-২০২৬’ অনুমোদন করা হয়। একই সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘যৌথবাহিনী নির্দেশাবলি-২০২৬’ অনুমোদন দেওয়া হয়।
অনুমোদিত কাঠামো অনুযায়ী, সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হবে।
নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার কথা থাকলেও বর্ধিত বেতন একবারে পুরোপুরি দেওয়া হবে না। মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতা নতুন হারে পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
সরকারের হিসাবে, নতুন ব্যবস্থার আওতায় আসবেন প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রায় সোয়া ৯ লাখ পেনশনভোগী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী। পুরো বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হতে পারে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
‘কার বেতন কত’ নির্ধারণ করবে গেজেট
মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত কাঠামোতে গ্রেডভিত্তিক নতুন মূল বেতনের অঙ্ক নির্ধারণ করা হলেও বর্তমানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নতুন স্কেলের কোন ধাপে গিয়ে নির্ধারিত হবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপন ও বিস্তারিত নির্দেশনায় বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
বিশেষ করে কোনো কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন সংশ্লিষ্ট গ্রেডের নতুন প্রারম্ভিক বেতনের চেয়ে বেশি হলে তার বেতন কীভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একইভাবে ইনক্রিমেন্ট, চাকরির মেয়াদ এবং বিদ্যমান আর্থিক সুবিধাগুলো নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সেটিও গেজেটে উল্লেখ থাকতে হবে।
সরকারের একজন কর্মকর্তা জানান, আগে বেতন নির্ধারণের হিসাব ম্যানুয়ালি করা হতো। ২০১৫ সালে অষ্টম পে স্কেল ঘোষণার পর প্রযুক্তিনির্ভর হিসাব ব্যবস্থা চালু হয়। বর্তমানে সেই প্রযুক্তির মাধ্যমেই হিসাব করা হচ্ছে। প্রযুক্তিগত কিছু প্রস্তুতির কারণে গেজেট প্রকাশে সামান্য বিলম্ব হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
জুডিশিয়ারির দাবিও পর্যালোচনায়
গেজেট প্রকাশের আগে জুডিশিয়াল সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা নিয়েও প্রশাসনিক পর্যায়ে কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শতভাগ ভাতাসহ কয়েকটি সুবিধার বিষয়ে থাকা দাবি ও প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
জাতীয় পে স্কেলের পাশাপাশি জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য আলাদা বেতনসংক্রান্ত প্রক্রিয়া রয়েছে। ফলে দুই কাঠামোর মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে। এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করা হবে বলে জানা গেছে।
আইবিএএস++-এ বড় প্রস্তুতি
পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় কাজ হচ্ছে প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ইনক্রিমেন্ট, ভাতা, কর্তন, আয়কর ও পেনশনের বড় অংশের হিসাব আইবিএএস++ ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করতে এই ব্যবস্থায় নতুন বেতন ম্যাট্রিক্স যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন, গ্রেড, ইনক্রিমেন্ট ও চাকরির মেয়াদ বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন নির্ধারণের পদ্ধতিও সফটওয়্যারে সংযোজন করতে হবে।
১ জুলাই থেকে নতুন স্কেল কার্যকর হলে গেজেট প্রকাশের আগ পর্যন্ত সময়ের বকেয়া বা অ্যারিয়ার কীভাবে হিসাব করা হবে, সেই ব্যবস্থাও আইবিএএস++-এ যুক্ত করতে হবে। লাখ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য একযোগে হিসাব চালু করতে তথ্য যাচাই ও সফটওয়্যার পরীক্ষা করতে হবে।
পেনশনভোগীদের হিসাবেও আসবে নির্দেশনা
নতুন পে স্কেল নিয়ে কর্মরতদের পাশাপাশি পেনশনভোগীদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার বেশি রাখা হয়েছে।
তবে পুরোনো ও নতুন পেনশনভোগীদের সুবিধা কীভাবে সমন্বয় করা হবে এবং নতুন স্কেল কার্যকর হওয়ার আগে ও পরে অবসরে যাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন কোন পদ্ধতিতে নির্ধারণ করা হবে, তা বিস্তারিত নির্দেশনার মাধ্যমে জানাতে হবে।
ফলে পে স্কেলের গেজেট শুধু নতুন বেতনের অঙ্ক প্রকাশের বিষয় নয়। এর সঙ্গে বেতন নির্ধারণ, পেনশন, ভাতা, ইনক্রিমেন্ট, অ্যারিয়ার এবং হিসাব ব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনাও যুক্ত থাকবে।
দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন পে স্কেলের ঘোষণা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি করেছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গেজেট প্রকাশে দেরি হওয়া মানেই পে স্কেল আটকে গেছে—এমন নয়। আইনগত যাচাই, বিভিন্ন সুবিধার সমন্বয় এবং প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির কাজ শেষ করেই প্রজ্ঞাপন জারি করতে চায় সরকার।
এখন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নজর অর্থ বিভাগের গেজেটের দিকে। কারণ মন্ত্রিসভার অনুমোদন নতুন বেতন কাঠামোর নীতিগত সিদ্ধান্ত দিয়েছে। কিন্তু কে কত টাকা পাবেন, কোন তারিখ থেকে পাবেন এবং বকেয়া কীভাবে পরিশোধ হবে- এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর মিলবে গেজেট প্রকাশের পরই।
