লোডশেডিং কমাতে গিয়েই বাড়ছে লোডশেডিং!
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০০ এএম
ছবি : সংগৃহীত
লোডশেডিং কমাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রণোদনা এবং সৌরযন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক ছাড় দিয়েছে সরকার। তবে সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে লোডশেডিং নিজেই। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে গেলে গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার উৎপাদনও ব্যাহত হয়। ফলে যে লোডশেডিং কমাতে সৌরবিদ্যুতের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, সেই লোডশেডিংই হয়ে উঠছে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তরায়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও ছাদভিত্তিক সৌর প্যানেল স্থাপনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের কথা বলছেন। এর মধ্যে লোডশেডিং অন্যতম।
জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্রে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বড় অংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে আসার কথা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছাদভিত্তিক সৌর প্যানেল থেকে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট এবং মাটিতে স্থাপিত সৌর প্যানেল থেকে সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
এর আগে ২০২১ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তা অর্জিত হয়নি। পরে ২০২৫ সালে নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে বাস্তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ এখনো ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ইতোমধ্যে বেশ কিছু বড় শিল্পকারখানা তাদের চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ করছে। শিল্প খাতে গ্রিডের বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটে যেখানে ১২ টাকার বেশি খরচ হচ্ছে, সেখানে ঋণ নিয়ে নিজস্ব ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ছে প্রায় ৬ থেকে ৮ টাকা।
এ ছাড়া ওপেক্স মডেলে কোনো প্রাথমিক বিনিয়োগ ছাড়াই গ্রিডের তুলনায় কম দামে সৌরবিদ্যুৎ কেনার সুযোগ থাকায় একের পর এক কারখানা এ ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে।
ছাদে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহে উৎসাহ বাড়াতে সরকার প্রতি ইউনিট সাড়ে ১০ টাকা দরে বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সুবিধা পেতে গ্রাহকদের ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে উৎপাদন শুরু করতে হবে। প্রণোদনা কার্যকর থাকবে তিন বছর।
বিদ্যমান নেট এনার্জি মিটারিং ব্যবস্থায় বিতরণ সংস্থাগুলো হিসাব সংরক্ষণ করবে এবং প্রতি তিন মাস পরপর গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধ করবে। পাশাপাশি সৌরযন্ত্রাংশ আমদানিতে ছয় মাসের জন্য শুল্ক ছাড় দিয়ে পরিপত্র জারি করেছে সরকার।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেদারল্যান্ডসের প্রতিষ্ঠান নিও বিভির করা এক সমীক্ষা অনুযায়ী, শুধু ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের ভবনগুলোর ছাদ ব্যবহার করেই ১০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এসব ভবনের অর্ধেক সক্ষমতা কাজে লাগানো গেলেও ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যেতে পারে।
শিল্প মালিকদের সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কারখানার ছাদ থেকেই ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এ ছাড়া দেশের দুই শতাধিক সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদ ব্যবহার করা গেলে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের বিদ্যুৎ চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে পারবে।
তবে এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে খাতসংশ্লিষ্টরা কয়েকটি বড় বাধার কথা বলছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো লোডশেডিং।
গ্রীষ্মকালে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে অনগ্রিড সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়। গ্রিডের সঙ্গে সমন্বিত থাকার কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ইনভার্টারও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সৌর প্যানেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেমে যায়।
এতে নিজস্ব অর্থায়নে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ব্যবহারকারীদের পাশাপাশি ওপেক্স মডেলে বিনিয়োগকারীরাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। ব্যাটারি যুক্ত করে সমস্যার কিছুটা সমাধান করা সম্ভব হলেও এতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির (বিএসআরইএ) সভাপতি মো. মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, সৌরবিদ্যুৎবান্ধব নীতি গ্রহণ ইতিবাচক হলেও এর বাস্তবায়নে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি এবং ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি।
তার মতে, ওপেক্স মডেলে বিনিয়োগকারীরা যাতে নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পান, সে নিশ্চয়তাও প্রয়োজন। পাশাপাশি সাধারণ গ্রাহকদের জন্য নগদ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। মানসম্মত যন্ত্রাংশ নিশ্চিত করা এবং দক্ষ জনবল তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, মানুষের আগ্রহ বাড়ায় দ্রুত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনবল তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারের ঘোষিত ছয় মাসের করছাড়ের মেয়াদ আরও বাড়ানো দরকার।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে ভারত, ভিয়েতনাম ও পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ভারতে ২০০৬ সালে পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের পর সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা দ্রুত বেড়েছে। ২০১৪ সালে দেশটির সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ছিল ২ দশমিক ৮২ গিগাওয়াট। ২০২৩ সালে তা ৬৬ গিগাওয়াট এবং ২০২৬ সালের মার্চে ১৫০ দশমিক ২৬ গিগাওয়াটে পৌঁছায়।
ভিয়েতনামে ২০১৮ সালে সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ছিল মাত্র ৮৬ মেগাওয়াট। ২০২৫ সালে তা ১৯ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে ৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি এসেছে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে।
অন্যদিকে পাকিস্তানে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি ও করছাড়ের কারণে গ্রিড-সংযুক্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। তবে সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে গ্রিডের চাহিদা কমে বিদ্যুৎ খাতে নতুন ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয় কমাতে প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও অন্যান্য অবকাঠামো আমদানিতে করসুবিধা দেওয়া হচ্ছে। বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্য ছয় মাসের বিশেষ শুল্ক ছাড়ও দেওয়া হয়েছে।
বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে জমির ব্যয় কমাতে সরকারি অব্যবহৃত জমি ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে প্রায় ৬০ হাজার একর জমির তথ্য সংগ্রহের পর যাচাই-বাছাই করে প্রায় ৩০ হাজার একর জমি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকার এসব জমি বরাদ্দ দেবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা অর্থ ও প্রযুক্তি নিয়ে আসবেন। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
ফলে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নীতিগত সহায়তার পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন গ্রিড, সহজ অর্থায়ন, মানসম্মত যন্ত্রাংশ এবং দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
