ফেসবুকজুড়ে পুলিশের ইউনিফর্ম পরা কনটেন্ট, কী বলছে আইন
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় বিভিন্ন ধরনের ভিডিও কনটেন্ট তৈরি ও প্রকাশের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফেসবুকের পাশাপাশি ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মেও এসব ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে। কিছু পুলিশ সদস্যের দাবি, জনসচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে এসব ভিডিও তৈরি করা হয়; আবার কিছু কনটেন্টে বিনোদনমূলক উপাদানও দেখা যায়।
তবে দায়িত্ব পালনকালে ভিডিও ধারণ ও তা ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে অভিযানের ভিডিও, আটক ব্যক্তির পরিচয় বা কোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা-২০২৫ অনুযায়ী, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো পুলিশ সদস্য তাঁর অপারেশনাল কার্যক্রমের ভিডিও বা স্থিরচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করতে পারবেন না। নির্দেশিকার ৬.৫ অনুচ্ছেদে দায়িত্ব পালনকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকাকে অসদাচরণ ও কর্তব্যে অবহেলা হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। নিয়ম লঙ্ঘন করলে অপেশাদার আচরণ হিসেবে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইটেও সরকারি প্রতিষ্ঠানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নির্দেশিকা তালিকাভুক্ত রয়েছে।
পুলিশ সদস্যদের কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা নিয়ে প্রথম আলোর এক অনুসন্ধানে ১০৭টি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বা পেজের সন্ধান পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এসব অ্যাকাউন্টে পুলিশের ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় বিভিন্ন অভিযান, মানুষের সঙ্গে কথোপকথন এবং সচেতনতামূলক ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। অনেক ভিডিও লাখ লাখবার দেখা হয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে আসা একটি ভিডিওতে ভোলার চরফ্যাশনে কর্মরত সার্জেন্ট এম এইচ নাইমকে সড়কে এক নারী স্কুটিচালকের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। ভিডিওটি জনসচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ভিডিওটি ব্যাপকসংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছায়।
আরেকটি ভিডিওতে দিনাজপুর কোতোয়ালি থানার ওসি নুর নবীর নামে পরিচালিত একটি পেজে এক আটক তরুণকে ক্যামেরার সামনে পরিচয় ও ঘটনার বর্ণনা দিতে দেখা যায়। তবে পেজটি তিনি নিজে পরিচালনা করেন না বলে দাবি করেছেন নুর নবী। স্থানীয় পুলিশ সূত্র অবশ্য ভিন্ন দাবি করেছে।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী থানার এএসআই শহীদুল ইসলামের নামেও একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনার তথ্য এসেছে অনুসন্ধানে। তিনি জানান, ডিউটির সময় চোখে পড়া বিভিন্ন ঘটনা ভিডিও করে প্রকাশ করেন এবং এসব ভিডিও দেখে মানুষ যেন অসহায়দের সহায়তায় এগিয়ে আসে, সে উদ্দেশ্যেই কাজটি করেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ভিডিও তদন্তের প্রয়োজনে ধারণ করা যেতে পারে। তবে তদন্তের বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রকাশ করা নিয়ে গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলে মত দিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী ও গবেষক রেজাউর রহমান লেনিন।
তার মতে, কোনো মামলা তদন্তাধীন থাকা অবস্থায় অভিযানের ভিডিও প্রকাশ করা বা ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
পুলিশ সদস্যদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিভিন্ন দেশেও বিধিনিষেধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো পুলিশ বিভাগের নির্দেশনায় অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউনিফর্ম পরা অবস্থার ছবি বা বিভাগের ব্যাজ, প্রতীক ও লোগো ব্যবহারের বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে।
ফিলিপাইন ও নাইজেরিয়াতেও দায়িত্ব পালনকালে ইউনিফর্ম পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ এবং পুলিশের পদমর্যাদা ব্যক্তিগত প্রচার বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের বিষয়ে বিধিনিষেধের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, পুলিশের পোশাক পরে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে কনটেন্ট তৈরির সুযোগ নেই। এটি নিয়মের ব্যত্যয়। এমন ঘটনায় অতীতে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং আরও কিছু অভিযোগের বিষয়ে প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, পুলিশ সদস্যদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট নির্দেশিকা রয়েছে এবং প্রত্যেক সদস্যকে তা মেনে চলতে হবে। নির্দেশনা অমান্যের অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফলে ইউনিফর্ম পরে জনসচেতনতামূলক বা অন্য ধরনের কনটেন্ট তৈরির বিষয়টি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তার প্রশ্ন নয়; দায়িত্ব পালনের বিধি, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং পুলিশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নিজস্ব নির্দেশিকার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
