অজিত দোভালের গোপন ঢাকা সফরের দাবি, সময় নিয়ে যত প্রশ্ন
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৩ এএম
ছবি : সংগৃহীত
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের ১৭ সেপ্টেম্বর গোপনে ঢাকা সফরের দাবি ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তার কথিত সফরের সময়, উড়োজাহাজ, অবস্থান এবং বাংলাদেশের শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে নানা তথ্য উঠে এসেছে। তবে এসব দাবির সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারি নথিতে থাকা কয়েকটি তথ্যের অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ডেইলি ওয়াদা। এতে বলা হয়, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে দোভালের কথিত সফর নিয়ে একের পর এক তথ্য প্রকাশিত হলেও সেগুলোর পক্ষে এখনো কোনো প্রামাণ্য নথি সামনে আসেনি।
দ্য কাশ্মীর টাইমস ১ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করে, ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে দোভালকে বহনকারী একটি গালফস্ট্রিম উড়োজাহাজ তেজগাঁও বিমানঘাঁটিতে গোপনে অবতরণ করে। উড়োজাহাজটি যেন প্রকাশ্যে শনাক্ত করা না যায়, সে জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনটির দাবি অনুযায়ী, দোভাল প্রায় ১৮ ঘণ্টা ঢাকায় অবস্থান করেন। এ সময় তিনি সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং ডিজিএফআইপ্রধান কায়সার রশীদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এ ছাড়া কায়সার রশীদকে নভেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় একটি আঞ্চলিক গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানোর কথাও বলা হয়েছে।
তবে উড়োজাহাজটির যাত্রার নথি, বৈঠকের ছবি কিংবা অন্য কোনো প্রামাণ্য দলিল প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়নি।
এর আগে ১৯ সেপ্টেম্বর রেডিফ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় এসেছিলেন অজিত দোভাল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে সেখানে তার যাতায়াতের পথ, অবতরণের স্থান কিংবা বাংলাদেশের কোন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
সেনাপ্রধানের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) তথ্য অনুযায়ী, সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে চার দিনের সরকারি সফরে জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন।
বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে তিনি জাপান সফর করেন। সেখানে বিভিন্ন ক্রীড়া আয়োজনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ১৯ সেপ্টেম্বর এশিয়ান গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও অংশ নেন তিনি। এ সময় বাংলাদেশি ক্রীড়াবিদদের প্রতিযোগিতা দেখার পাশাপাশি অলিম্পিক কাউন্সিল অব এশিয়ার সভাপতি শেখ জোয়ান বিন হামাদ আল থানির সঙ্গেও বৈঠক করেন।
আইএসপিআরের তথ্য বলছে, ২০ সেপ্টেম্বর রাতে দেশে ফেরেন সেনাপ্রধান। অর্থাৎ, সরকারি তথ্য অনুযায়ী ১৭ সেপ্টেম্বর তিনি জাপানে অবস্থান করছিলেন। ফলে ওই দিন ঢাকায় এসে দোভালের সঙ্গে তার বৈঠকের যে দাবি ভারতীয় প্রতিবেদনে করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ডিজিএফআইপ্রধান কায়সার রশীদ চৌধুরীর অবস্থান নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ডেইলি ওয়াদা কয়েকটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ১৭ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশের বাইরে একটি উপসাগরীয় দেশে ছিলেন। তবে তার ওই দিনের আনুষ্ঠানিক ভ্রমণ নথি যাচাই করা হয়নি। তাই তিনি সেদিন দেশের বাইরে ছিলেন—এমন দাবিও নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
সফরের তথ্য জানে না ঢাকা
দোভালের কথিত সফর নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
২৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদুর রহমান জানান, অজিত দোভালের বাংলাদেশ সফর সম্পর্কে সরকারের কাছে কোনো তথ্য নেই। তিনি বলেন, দোভাল বাংলাদেশে এলে সরকার অবশ্যই বিষয়টি জানত এবং সেটি সরকারি সফর হিসেবেই হতো।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যকে অনুমান ও গুঞ্জন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ভারতের পক্ষ থেকেও সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি। ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীকে দোভালের কথিত সফর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো নিশ্চিত তথ্য দেননি।
নিরাপত্তা পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত
দোভালের কথিত সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও বাংলাদেশ ও ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবি, সীমান্ত ইস্যু এবং রাজনৈতিক আস্থার সংকট দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে। তবে নিরাপত্তা পর্যায়ে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
ফেব্রুয়ারিতে ডিজিএফআইপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর কায়সার রশীদ চৌধুরী নয়াদিল্লি সফর করেন। সে সময় ভারতীয় গণমাধ্যমে তার সঙ্গে অজিত দোভাল এবং দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধানের বৈঠকের খবর প্রকাশিত হয়। এরপর গত আগস্টে ‘র’-এর প্রধান ঢাকায় সফর করেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফর নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে এ সফরের কোনো তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।
১৭ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মদিনে তাকে শুভেচ্ছা জানান তারেক রহমান। একই দিনে সেই শুভেচ্ছার জবাব দেন মোদি। ভারতীয় কিছু প্রতিবেদনে এই শুভেচ্ছা বিনিময়কে দোভালের কথিত ঢাকা সফরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তবে এটি প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ, কোনো সরকারি তথ্য নয়।
গুপ্তচরবৃত্তির মামলায় নতুন আলোচনা
দোভালের কথিত সফর নিয়ে আলোচনার মধ্যেই ১ অক্টোবর ভারতীয় নাগরিক রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে মামলা করেছে পুলিশ।
পশ্চিমবঙ্গের ৪৪ বছর বয়সী রবিউলের বিরুদ্ধে সরকারি গোপনীয়তা আইনে মামলাটি করেন গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক মেজবা উদ্দিন। পুলিশের অভিযোগ, তিনি বিদেশি একটি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ এবং সংবেদনশীল তথ্য পাচারের চেষ্টা করেছেন। পরে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতউল্লাহ তাকে সাত দিনের রিমান্ডে পাঠান। তদন্তকারীরা ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২২ সেপ্টেম্বর সন্দেহজনক চলাফেরার অভিযোগে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় রবিউলকে প্রথমে আটক করা হয়। এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ১০ থেকে ১২ বছরে বিভিন্ন সময়ে পর্যটক ভিসায় বাংলাদেশে এসে ব্যবসার আড়ালে গুপ্তচরবৃত্তিতে যুক্ত ছিলেন রবিউল। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা ও সংরক্ষিত এলাকার ছবি, সরকারি নথি এবং সংবেদনশীল তথ্য বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পাঠানোর চেষ্টা করেছিলেন বলেও পুলিশের অভিযোগ।
তবে রবিউল ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, ব্যবসার কাজে তিনি নিয়মিত বাংলাদেশে যাতায়াত করতেন।
রবিউলের বিরুদ্ধে করা মামলার সঙ্গে অজিত দোভালের কথিত সফরের কোনো সরাসরি যোগসূত্র এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে একই সময়ের নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহের কারণে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
সব মিলিয়ে ১৭ সেপ্টেম্বর অজিত দোভালের কথিত ঢাকা সফর নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ভারতীয় গণমাধ্যমে গোপনে উড়োজাহাজ অবতরণ, ১৮ ঘণ্টা অবস্থান এবং বাংলাদেশের শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের দাবি করা হলেও এসবের পক্ষে প্রকাশ্যে কোনো প্রামাণ্য নথি পাওয়া যায়নি।
