×

মতামত

শর্ট মেয়েদের বিয়ে করতে অনীহা, বাস্তবতা নাকি সামাজিক ধারণা?

Icon

নাজমুল হাসান

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৬ পিএম

শর্ট মেয়েদের বিয়ে করতে অনীহা, বাস্তবতা নাকি সামাজিক ধারণা?

মো. নাজমুল হাসান। ছবি : ভোরের কাগজ

বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়েদের উচ্চতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ- এই প্রশ্নটি আমাদের সমাজে নতুন নয়। ‘মেয়ে একটু লম্বা হলে ভালো’, ‘ছেলের চেয়ে মেয়ে খাটো হওয়া উচিত’ কিংবা ‘খাটো মেয়েদের চাহিদা কম’—এ ধরনের মন্তব্য পরিবার, আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্ত প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব ধারণা আসলে কতটা বাস্তব এবং কতটা সামাজিক প্রত্যাশা? সত্যিই কি পুরুষেরা খাটো মেয়েদের বিয়ে করতে অনাগ্রহী, নাকি উচ্চতা নিয়ে তৈরি সামাজিক স্টেরিওটাইপই আমাদের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করে?

বিয়ের মতো দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ক্ষেত্রে শারীরিক বৈশিষ্ট্য যে একেবারেই কোনো ভূমিকা রাখে না, তা বলা যাবে না। মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দে উচ্চতা, চেহারা, শারীরিক গঠনসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় আসতে পারে। কেউ লম্বা সঙ্গী পছন্দ করতে পারেন, আবার কেউ খাটো বা মাঝারি উচ্চতার মানুষকেও সমানভাবে আকর্ষণীয় মনে করতে পারেন। অর্থাৎ উচ্চতার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ‘সবার পছন্দ’ তৈরি করা কঠিন।

সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন ব্যক্তিগত পছন্দকে সামাজিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। একজন বা কয়েকজন পুরুষ খাটো নারী পছন্দ করেন না- এটি তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ। কিন্তু সেখান থেকে ‘ছেলেরা শর্ট মেয়েদের বিয়ে করতে চায় না’—এমন সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়।

দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে পুরুষের তুলনায় নারী খাটো হওয়া নিয়ে একটি প্রচলিত সামাজিক প্রত্যাশা রয়েছে। বিয়ের ক্ষেত্রে অনেক পরিবার এখনো পাত্র-পাত্রীর উচ্চতার অনুপাতকে গুরুত্ব দেয়। ফলে কোনো মেয়ের উচ্চতা কম হলে তাকে নিয়ে অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য, তুলনা কিংবা আত্মবিশ্বাসহীনতা তৈরি হতে পারে। অথচ একজন মানুষের উচ্চতা তার চরিত্র, বুদ্ধিমত্তা, শিক্ষা, দায়িত্ববোধ কিংবা ভালো জীবনসঙ্গী হওয়ার সক্ষমতা নির্ধারণ করে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- বিয়ের সিদ্ধান্ত কোনো এক পক্ষের হাতে থাকে না। শুধু পুরুষেরা পাত্রী নির্বাচন করেন- এমন ধারণাটিও অসম্পূর্ণ। একজন নারীও তার পছন্দ, মূল্যবোধ, জীবনযাপন, শিক্ষাগত অবস্থান, ব্যক্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পুরুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেন। তাই ‘মেয়েদের চাহিদা’ বা ‘ছেলেদের চাহিদা’কে একতরফাভাবে দেখার পরিবর্তে দুই পক্ষের পছন্দ ও প্রত্যাশাকেই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়, উচ্চতা নিয়ে নানা ধরনের দাবি ছড়িয়ে পড়ে- ‘লম্বা মেয়েদের বেশি চাহিদা’, ‘শর্ট মেয়েরা বিয়েতে পিছিয়ে’, কিংবা ‘ছেলেরা নির্দিষ্ট উচ্চতার মেয়েকেই পছন্দ করে’। কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, অনলাইন মন্তব্য কিংবা বিয়ের কয়েকটি বিজ্ঞাপন দিয়ে পুরো সমাজের মানুষের পছন্দ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

এখানে আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার- বিয়ের বাজারে পছন্দ শুধু শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে না। পরিবার, শিক্ষা, মূল্যবোধ, ব্যক্তিত্ব, আচরণ, আর্থিক স্থিতি, ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং পারস্পরিক মানসিক সামঞ্জস্য- সবকিছু মিলিয়েই একজন মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারও উচ্চতা কম হলেও অন্য অনেক গুণ তার প্রতি মানুষের আগ্রহ তৈরি করতে পারে।

তবে উচ্চতা নিয়ে সামাজিক পছন্দের অস্তিত্ব পুরোপুরি অস্বীকার করাও ঠিক হবে না। কিছু পুরুষ বা পরিবার সত্যিই নির্দিষ্ট উচ্চতার পাত্রী চান। এটি বাস্তবতা। কিন্তু সেই বাস্তবতাকে ‘সব পুরুষের পছন্দ’ হিসেবে উপস্থাপন করাই সমস্যাজনক। ব্যক্তিগত পছন্দ এবং সামাজিক প্রবণতার মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি।

একইভাবে খাটো মেয়েদের নিয়েও একটি ইতিবাচক স্টেরিওটাইপ তৈরি করা উচিত নয়। যেমন- ‘খাটো মেয়েরা বেশি ভালো স্ত্রী হয়’, ‘তারা বেশি সংসারী’ কিংবা ‘তাদের স্বভাব ভালো’—এসব ধারণারও নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। একজন মানুষের উচ্চতা দিয়ে তার ব্যক্তিত্ব বা দাম্পত্যসঙ্গী হিসেবে যোগ্যতা বিচার করা যেমন বৈষম্যমূলক, তেমনি উচ্চতার সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট চরিত্রগত গুণ জুড়ে দেওয়াও একই ধরনের ভুল।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, উচ্চতা যেন কোনো মেয়ের আত্মসম্মান বা আত্মমূল্যের মাপকাঠি হয়ে না দাঁড়ায়। সমাজের কোনো একটি প্রচলিত সৌন্দর্য-মানদণ্ডে কেউ নিজেকে ‘কম’ মনে করতে শুরু করলে তার প্রভাব শুধু বিয়ের ক্ষেত্রেই নয়, ব্যক্তিত্ব ও মানসিক সুস্থতার ওপরও পড়তে পারে।

বিয়ের ক্ষেত্রে তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত- ‘মেয়েটি কত লম্বা?’-এর পাশাপাশি ‘মানুষ হিসেবে সে কেমন?’, ‘তার মূল্যবোধ কী?’, ‘দুজনের জীবনদর্শনের মধ্যে কতটা মিল?’, ‘তারা কি পরস্পরকে সম্মান করে?’ এবং ‘একসঙ্গে দায়িত্ব নিয়ে জীবন কাটানোর মানসিক প্রস্তুতি আছে কি না?’

বাস্তবতা হলো, কেউ খাটো হওয়ার কারণে কোনো নির্দিষ্ট পুরুষ তাকে পছন্দ নাও করতে পারেন। আবার অন্য কোনো পুরুষের কাছে সেটি একেবারেই গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে। মানুষের রুচি ও পছন্দের এই বৈচিত্র্যকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করাই বেশি যুক্তিসঙ্গত।

তাই ‘শর্ট মেয়েদের বিয়ে করতে ছেলেরা অনীহা’—এই বক্তব্যকে সার্বজনীন সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কিছু মানুষের পছন্দে উচ্চতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সেটিকে সব পুরুষের মানসিকতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা বাস্তবতার চেয়ে সামাজিক ধারণাকেই বেশি শক্তিশালী করে।

শেষ পর্যন্ত একটি সফল দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত্তি শুধু উচ্চতা বা বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়। পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ, মানসিক সামঞ্জস্য এবং একে অপরের প্রতি গ্রহণযোগ্যতাই সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে। তাই কোনো মেয়ের উচ্চতাকে তার বিয়ের সম্ভাবনা বা যোগ্যতার চূড়ান্ত মাপকাঠি না বানিয়ে মানুষ হিসেবে তার গুণাবলি ও পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়াই বেশি মানবিক এবং বাস্তবসম্মত।

লেখক: মো.নাজমুল হাসান, সাংবাদিক

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ কেন চাইছেন আন্দোলনকারীরা?

নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ কেন চাইছেন আন্দোলনকারীরা?

বিএসএফের গুলি আহত কৃষক, পাল্টা গুলি বিজিবির

বিএসএফের গুলি আহত কৃষক, পাল্টা গুলি বিজিবির

যেসব কারণে বাতিল হতে পারে ভিসা, জানাল দূতাবাস

যেসব কারণে বাতিল হতে পারে ভিসা, জানাল দূতাবাস

প্রবাসীদের জন্য নতুন ব্যাংকিং সুবিধা চালু

প্রবাসীদের জন্য নতুন ব্যাংকিং সুবিধা চালু

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App