শিক্ষকতা থেকে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথে মির্জা ফখরুল
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৫:১১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ছাত্ররাজনীতি দিয়ে যার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা, সেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পথচলায় এসেছে নানা বাঁক। শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, পৌরসভার চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী এবং দলের মহাসচিব- দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার পর এবার দেশের রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হয়েছেন তিনি। সবকিছু ঠিক থাকলে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিতে পারেন বিএনপির এই প্রবীণ নেতা।
বর্তমানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার আগে বিএনপির মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে বিএনপির শীর্ষ নেতারা নির্বাচন কার্যালয়ে গিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দেন। রাষ্ট্রপতি পদে তার প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পর নতুন করে সামনে এসেছে প্রায় ছয় দশকের বর্ণিল রাজনৈতিক জীবন।
ঠাকুরগাঁও থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী, সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী। মা মির্জা ফাতেমা আমিন।
আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন মির্জা ফখরুল? ‘কিছুই জানেন না’ বললেন নিজেই
ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার পর ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন তিনি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই রাজনীতিতে সক্রিয় হন মির্জা ফখরুল। তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এবং এসএম হল শাখার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
রাজনীতির শুরুতে বামপন্থী ধারার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরবর্তী সময়ে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাপের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন।
শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবনের শুরু
রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষকতাকেও পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন মির্জা ফখরুল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়াশোনা শেষ করে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজেও শিক্ষকতা করেন।
১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সরাসরি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন।
আরও পড়ুন: দেশে গণিতচর্চা বাড়াতে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর
রাজনীতিতে ফিরে ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়।
সংসদ ও মন্ত্রিসভায়
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। একই মেয়াদে বিএনপি সরকারের কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। পরের বছর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তাকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব করা হয়।
বিএনপির মহাসচিব
দলের মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ২০১১ সালের ২০ মার্চ ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। প্রায় পাঁচ বছর পর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ তিনি বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরের সময়ে দলের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের সারিতে ছিলেন তিনি। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিদেশে অবস্থানের সময় দেশে থেকে দলীয় কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মির্জা ফখরুল।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা ধাপ পেরিয়ে এবার রাষ্ট্রপতি পদে তার মনোনয়ন নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করা এই রাজনীতিকের সামনে এখন দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার সম্ভাবনা।
