‘নিষিদ্ধ’ আওয়ামী লীগের সামনে আরও এক ১৫ আগস্ট
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪০ এএম
ছবি : সংগৃহীত
আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই আবারও এসেছে ১৫ আগস্ট। ১৯৭৫ সালের যে দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে দিনটি জাতীয় শোক দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হতো। মাসজুড়ে থাকত নানা কর্মসূচি। তবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এবার তৃতীয়বারের মতো বড় কোনো দলীয় আয়োজন ছাড়াই দিনটি পালিত হচ্ছে।
২০২৪ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৫ আগস্টের জাতীয় শোক দিবসের সরকারি ছুটি বাতিল করে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারও ওই সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে।
বঙ্গবন্ধুর বড় মেয়ে ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বৈরশাসন এবং আন্দোলনকারীদের হত্যার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। দেশের বিভিন্ন আদালতে তার বিরুদ্ধে ছয় শতাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
আরও পড়ুন: খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন আজ
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে দমন-পীড়নে জড়িত থাকার অভিযোগে বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমও নিষিদ্ধ রয়েছে। দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা আত্মগোপনে আছেন, কেউ কেউ কারাগারে। দলীয় কর্মীদের বড় একটি অংশও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু হত্যার ৫১তম বার্ষিকী সামনে রেখে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট দিচ্ছেন। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ও বিদেশে অবস্থান করে বিভিন্ন কর্মসূচির পোস্ট শেয়ার করছেন।
গত বছর ফেব্রুয়ারিতে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ছয় মাস পূর্তিতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ভেকু দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়। ওই ঘটনার আগে সেখানে ‘মুজিববাদের কবর রচনার’ ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
এবার ১৫ আগস্টকে ঘিরে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা ও নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে চেকপোস্ট ও তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে বিশেষ নিরাপত্তার আওতায় আনা হয়েছে। এসব স্থাপনায় সিসিটিভি ক্যামেরা ও ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি থাকবে।
আরও পড়ুন: গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেব না
বঙ্গবন্ধুর জন্মস্থান গোপালগঞ্জেও নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা। টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়াসহ জেলার বিভিন্ন স্পর্শকাতর এলাকায় জেলা পুলিশের পাশাপাশি পাঁচ প্লাটুন বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ওই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দেন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারেও তিনি নেতাকর্মীদের নিয়ে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে সরকার। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে ভারতের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে সেনাবাহিনীর একদল কর্মকর্তা ও সদস্যের হাতে সপরিবারে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছয় বছরের শিশু থেকে অন্তঃসত্ত্বা নারীও সেদিন ঘাতকদের হাত থেকে রক্ষা পাননি।
১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ও ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনে তিনি নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন।
আরও পড়ুন: পশ্চিম জার্মানিতে ভয়াবহ দাবানল, নিরাপদে বাংলাদেশিরা
১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাকে প্রধান আসামি করলে বাঙালির রাজনৈতিক আন্দোলনে শেখ মুজিবের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কারামুক্ত হওয়ার পর ছাত্র-জনতা তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে।
১৯৭১ সালের মার্চে ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে স্বাধীনতার সংগ্রামের ডাক দেন শেখ মুজিব। এরপর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ঘটে বড় পরিবর্তন।
সেদিন শেখ মুজিবুর রহমানের পাশাপাশি তার স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, শেখ জামালের স্ত্রী রোজী জামাল এবং ছোট ভাই শেখ নাসের নিহত হন।
একই রাতে নিহত হন বঙ্গবন্ধুর বোনের স্বামী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ, মেয়ে বেবী ও শিশুপৌত্র সুকান্ত বাবু। নিহতদের তালিকায় ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি এবং স্বজন শহীদ সেরনিয়াবাত ও রিন্টু।
ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে পুলিশের বিশেষ শাখার সাব-ইন্সপেক্টর সিদ্দিকুর রহমান ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিলও গুলিতে নিহত হন।
সে সময় দেশের বাইরে থাকায় বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যান। পরে শেখ মুজিবকে তার জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ায় দাফন করা হয়। পরিবারের অন্য সদস্যদের বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর আত্মস্বীকৃত খুনিদের আইনি সুরক্ষা দিতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১০ সালে পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ২০২০ সালে আরেক আসামি আবদুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকর হয়।
১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডের পর দুই দশকের বেশি সময় শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অনেকটা আড়ালে রাখা হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১৫ আগস্টকে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করা হয় এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে দিনটি পালনের ব্যবস্থা করা হয়।
আরও পড়ুন: হরমুজ প্রণালিকে শিগগিরই মার্কিন ভূখণ্ড ঘোষণার হুমকি ট্রাম্পের
২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৫ আগস্টের জাতীয় শোক দিবসের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বাতিল করা হয়। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে উচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৮ সাল থেকে দিনটি আবার জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন শুরু হয়। একই সঙ্গে সরকারি ছুটিও বহাল হয়।
এরপর আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ১৫ আগস্ট নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালন করে আসছিল।
তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম বৈঠকেই ১৫ আগস্টের জাতীয় শোক দিবসের সরকারি ছুটি বাতিল করা হয়।
বাংলাদেশ জাসদের কর্মসূচি
এবারও ১৫ আগস্ট উপলক্ষে কর্মসূচি রেখেছে বাংলাদেশ জাসদ। দলটির সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া জানিয়েছেন, তোপখানা রোডে দলের কার্যালয়ে অস্থায়ীভাবে স্থাপিত বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। শনিবার বিকেল ৫টায় শ্রদ্ধা নিবেদনের পর আলোচনা সভাও অনুষ্ঠিত হবে।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ জাসদ জানিয়েছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার পরিবারের সদস্য, কর্নেল জামিলসহ কর্তব্যরত ব্যক্তিবর্গ এবং শেখ ফজলুল হক মণি ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতের পরিবারের সদস্যসহ হত্যাকাণ্ডের শিকার সবার প্রতি দলটি গভীর শোক ও ঘৃণা প্রকাশ করছে।
দলটির ভাষ্য, বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড একটি অমোচনীয় কলঙ্ক। আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এই কলঙ্ক দূর করা সম্ভব।
