রংপুরে চার হত্যা মামলার ময়নাতদন্তে মিলল চাঞ্চল্যকর তথ্য
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০১:২৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় ময়নাতদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। নিহত দুই নারীকে ধর্ষণ বা ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছিল এমন কোনো আলামত ময়নাতদন্তে পাওয়া যায়নি। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, চারজনের মৃত্যুর কারণ শ্বাসরোধ।
বুধবার (২৬ আগস্ট) সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান রংপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস।
তিনি জানান, নিহত অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ পরীক্ষার সময় যৌন নির্যাতনের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের সময় সংগ্রহ করা নমুনা মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবে পাঠানো হয়েছিল। পরীক্ষার প্রতিবেদনেও ধর্ষণের পক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি।
এর আগে চার সদস্যের মরদেহের ময়নাতদন্ত নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক ডোমের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দুই নারী মরদেহে শুক্রাণু পাওয়ার দাবি করা হয়েছিল। তবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক এ দাবি নাকচ করে বলেন, পরীক্ষার প্রতিবেদনে এ ধরনের কোনো আলামতের উল্লেখ নেই।
ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেন, ময়নাতদন্ত ও পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ধর্ষণের বিষয়টি বাদ দেওয়া যায়। সোয়াব সংগ্রহের সময় ডোমের মনে হয়ে থাকতে পারে যে পরীক্ষায় কোনো ফল পাওয়া যাবে। সম্ভবত সে কারণেই তিনি এমন মন্তব্য করেছেন।
চারজনের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চিকিৎসক জানান, সবার গলায় দাগের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এসব আলামতের ভিত্তিতে তাদের শ্বাসরোধে মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছেন চিকিৎসকেরা।
মরদেহগুলোতে কোনো কাটা বা ছেঁড়া ক্ষত পাওয়া যায়নি। তবে কয়েকজনের মাথা ও বুকে ফোলা ধরনের আঘাতের চিহ্ন ছিল।
ময়নাতদন্তের সময় মরদেহগুলোর অবস্থা সম্পর্কে ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেন, হাসপাতালে আনার সময় মরদেহগুলো ফুলে গিয়েছিল এবং পোকা ধরেছিল। দীর্ঘ সময় পার হওয়ায় শরীরের স্বাভাবিক চেহারাতেও পরিবর্তন এসেছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চারজনের মুখে পোড়া দাগ থাকার যে দাবি ছড়িয়েছে, সেটিও সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।
তার ব্যাখ্যা, মৃত্যুর পর সময় যত বাড়ে, ততই ত্বকে পরিবর্তন আসে এবং কালচে হয়ে যেতে পারে। ফলে মুখ ও শরীর কালো দেখালেও এর সঙ্গে রাসায়নিক ব্যবহারের সম্পর্ক নেই।
এদিকে, মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরপিএমপি)।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে আরপিএমপি কমিশনারের কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ঘটনার শুরু থেকেই পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। আলামত সংগ্রহ, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই করে ঘটনার নেপথ্যের কারণ উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
পুলিশ কমিশনার আরও জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা শনাক্ত এবং আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত জব্দ করে পরীক্ষার জন্য ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।
তদন্তের স্বার্থে এখনই সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয় জানিয়ে তিনি বলেন, মামলার অগ্রগতি সন্তোষজনক। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত ও সাক্ষীদের বক্তব্য যাচাই করে দ্রুতই ঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচনের আশা করছে পুলিশ।
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যান। নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকায় জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করে প্রায় তিন বছর ধরে পরিবার নিয়ে বসবাস করছিলেন তিনি।
গত শনিবার ওই বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬০), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), স্নাতকোত্তর পড়ুয়া মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
প্রাথমিকভাবে পুলিশ জানিয়েছিল, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। বর্তমানে মামলাটির তদন্তভার কোতোয়ালি থানা পুলিশের কাছ থেকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছেন ডিবির পরিদর্শক জিনাত আলী।
