তাসনিম জারা
কারিনা, তোমার কারণে আমরা একটু বেশি সাহসী হওয়ার চেষ্টা করব
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ১২:১৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সারের মৃত্যুতে গভীর শোক ও বেদনা প্রকাশ করেছেন চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিবিদ ডা. তাসনিম জারা।
শনিবার (১৬ মে) ফেসবুকে দেওয়া একটি আবেগঘন পোস্টে তিনি কারিনার সাহস, মেধা ও অনন্য উপস্থিতির কথা স্মরণ করেন এবং একই সঙ্গে তার অসুস্থতার সময় অনলাইনে যে ঘৃণ্য প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, সেটিকেও কড়া সমালোচনা করেন।
লিভার-সংক্রান্ত তীব্র জটিলতায় শুক্রবার (১৫ মে) ভারতের ভেলোরের খ্রিষ্টান মেডিকেল কলেজ (সিএমসি) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান কারিনা। বেশ কিছুদিন যাবত মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা এই তরুণ প্রতিভার চলে যাওয়া দেশের বিনোদন ও সামাজিক মাধ্যম অঙ্গনে তীব্র শোকের ছায়া নেমেছে।
তাসনিম জারা তার পোস্টে লেখেন, 'কারিনার সঙ্গে তার কখনো সরাসরি পরিচয় হয়নি। কিন্তু তিনি কারিনাকে সেভাবেই দেখেছেন, যেভাবে লাখো মানুষ তাকে দেখেছেন। পাশাপাশি এমন একজন হিসেবেও দেখেছেন, যিনি নিজেও জানেন এ দেশে একজন নারী হয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ছোট না করে টিকে থাকতে কতটা মূল্য দিতে হয়।'
একজন নারীকে এই সমাজে নিজের মুখ, শরীর, কণ্ঠ কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রতিনিয়ত নানা মন্তব্য ও আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়। সেই বাস্তবতার মধ্যেও কারিনা ভিন্নভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন এবং সাহসের সঙ্গে নিজের অবস্থানে ছিলেন বলেও তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেছেন তিনি।
কারিনার রসবোধ ও সমাজ-সচেতনতার কথা উল্লেখ করে তাসনিম জারা লেখেন, ‘তিনি সেই ধরনের মানুষ ছিলেন, যাদের বুদ্ধিমত্তা থেকেই হাস্যরস তৈরি হয়।’ সমাজ নারীদের শরীর, কণ্ঠ ও স্বাধীন অবস্থানকে যেভাবে বিচার করে, কারিনা সেসব বিষয়কে নিজের কনটেন্টে তুলে ধরতেন এবং মানুষকে হাসাতেন। এই ধরনের ব্যঙ্গ ও রসবোধকে তিনি সাহসের প্রকাশ বলেও উল্লেখ করেন।
তাসনিম জারার ভাষায়, ‘২০২৬ সালে বাংলাদেশে যে বিষয়গুলো নিয়ে তিনি (কারিনা) হাস্যরস করতেন, সেগুলো নিয়ে হাসতে মেরুদণ্ড লাগে।’
কারিনার অপূর্ণ সম্ভাবনার কথা বলতে গিয়ে তাসনিম জারা লেখেন, কারিনা ইতোমধ্যে ভালো কাজ করেছেন এবং সামনে আরও ভালো কাজ করার সম্ভাবনা ছিল। প্রকৃত মেধাবীরা সবসময় নিজেদের পরবর্তী কাজের মধ্য দিয়ে আরও বড় হয়ে ওঠেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘আমরা তার জীবনের মধ্যভাগ ও শেষ অধ্যায়—দুটো থেকেই বঞ্চিত হলাম।’
পোস্টে তাসনিম জারা একটি বেদনাদায়ক প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। কারিনার অসুস্থতার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু মানুষের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কথাও উল্লেখ করেন তাসনিম জারা। তিনি বলেন, কারিনা যখন লাইফ সাপোর্টে ছিলেন এবং তার পরিবার কঠিন সময় পার করছিল, তখনও কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমে তার অসুস্থতাকে ‘সৃষ্টিকর্তার শাস্তি’ বলে মন্তব্য করেছেন। এ ধরনের আচরণ দেশের রাজনীতির এক ‘আহত অংশের’ প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে এসব ঘৃণার চেয়ে কারিনা অনেক বড় ছিলেন বলেও উল্লেখ করেন।
পোস্টের শেষ অংশে তাসনিম জারা লেখেন, তার সঙ্গে কখনো দেখা হয়নি—এ আফসোস থেকে যাবে। তিনি যদি দেখা করতে পারতেন, তাহলে হয়তো বলতেন, ‘চালিয়ে যাও, এই দেশের তোমার মতো সাহসী মানুষের প্রয়োজন আছে।’ তবে তার বিশ্বাস, কারিনা নিজেই নিজের পথ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং অল্প জীবনেই অনেকের চেয়ে বেশি কিছু দিয়ে গেছেন।
পোস্টের শেষে তিনি লেখেন, ‘বিশ্রাম নাও, কারিনা। তোমার কারণে আমরা একটু বেশি সাহসী হওয়ার চেষ্টা করব।’
প্রসঙ্গত, প্রথমে সাধারণ জ্বরে আক্রান্ত হলেও পরে কারিনার শরীরে মারাত্মক সংক্রমণ ধরা পড়ে। হেপাটাইটিস এ ও ই-জনিত জটিলতায় তার লিভার ফেইলিউর হয়। ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রাখার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য গত সোমবার রাতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে ভারতের চেন্নাইয়ে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা ফুসফুসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের চিকিৎসা শুরু করেন এবং লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। কারিনার বাবা কায়সার হামিদ জানান, ফুসফুসে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার সময় হঠাৎ রক্তচাপ অনেক নিচে নেমে যায়। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
সামাজিক মাধ্যমে প্রাণবন্ত উপস্থাপনা ও জীবনঘনিষ্ঠ কনটেন্টের মাধ্যমে তরুণ দর্শকদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া কারিনা সাম্প্রতিক সময়ে অভিনেত্রী ও চিত্রনাট্যকার হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে আলোচিত ওয়েব সিরিজ 'ইন্টার্নশিপ' এবং '৩৬-২৪-৩৬'।
