পর্নোগ্রাফিতে আসক্তি, বিশেষজ্ঞদের মতামত
মাহিদুল হোসেন সানি
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৩:১১ পিএম
ছবি: প্রতীকি
স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় নানা ধরনের অনলাইন কনটেন্ট মানুষের হাতের নাগালে এসেছে। এর মধ্যে পর্নোগ্রাফিও রয়েছে। বিশেষ করে কিশোর-তরুণদের ক্ষেত্রে কৌতূহল, একাকিত্ব কিংবা মানসিক চাপ থেকে শুরু হওয়া অভ্যাস কখনো কখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্নোগ্রাফি দেখা আর এতে সম্পূর্ণ 'আসক্ত' হয়ে পড়ার মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। যে কোনো অনলাইন অভ্যাস তখনই উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে, যখন মানুষ নিজের আচরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। ঘুম নষ্ট করা, পড়াশোনায় মনোযোগ হারাওয়া, পারিবারিক যোগাযোগ কমে যাওয়া এবং মানসিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার মধ্য দিয়েই মূলত সমস্যাজনক ব্যবহারের সূচনা হয়।
অনেকে মানসিক চাপ কাটানোর বা সাময়িক বিরক্তি দূর করার বাহানা হিসেবে এই অভ্যাস শুরু করলেও, ধীরে ধীরে এটি মস্তিষ্কে কৃত্রিম স্বস্তি ও আনন্দের এক বিপজ্জনক নির্ভরতা তৈরি করে।
মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব নিয়ে গবেষণায় কী বলে?
সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যালোচনায় সমস্যাজনক পর্নোগ্রাফি ব্যবহারের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য, মস্তিষ্কের কার্যক্রম এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের সম্ভাব্য যোগসূত্র উঠে এসেছে। বিশেষ করে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও সম্পর্কের টানাপোড়েনের মতো বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, এসব সম্পর্ককে সরাসরি কারণ-ফল হিসেবে দেখানোর ক্ষেত্রে এখনো সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মস্তিষ্কের নিউরোলজিক্যাল পরিবর্তন গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কে ডোপামিন ক্ষরণ ও 'রিওয়ার্ড সেন্টার'-এর পরিবর্তনগুলো ড্রাগ বা মাদকে আসক্তদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপের হুবহু অনুরূপ। এর ফলে মস্তিষ্কের গ্রে ম্যাটার বা ধূসর পদার্থের পরিমাণ কমে যেতে পারে, যা মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হ্রাস করে।
জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট-এর মস্তিষ্কের গঠন সংক্রান্ত গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত সময় পর্নোগ্রাফি দেখলে মস্তিষ্কের 'স্ট্রিয়াটাম' অংশটি সংকুচিত হতে শুরু করে। এর ফলে মস্তিষ্ক বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক আনন্দের অনুভূতি গ্রহণে অক্ষম হয়ে পড়ে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় 'ডিসেনসিটাইজেশন' বলা হয়।
আরো পড়ুন: কেন বাড়ছে পরকীয়া? বিশেষজ্ঞ মতামত
'জার্নাল অব বিহেভিয়ারাল অ্যাডিকশনস'-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, নিয়মিত পর্ন দেখার অভ্যাসের সাথে বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সাময়িক মানসিক চাপ কাটানোর উদ্দেশ্যে এটি শুরু হলেও, সময় পরিক্রমায় তা মস্তিষ্কের রসায়ন বদলে দেয়; যা পরবর্তীতে তীব্র হীনমন্যতা, অপরাধবোধ ও স্থায়ী সামাজিক বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয়।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (APA) এবং ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট ড্যালাস (UT Dallas)-এর যৌথ মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, পর্নোগ্রাফির অতিরিক্ত ব্যবহার তরুণ প্রজন্মের পার্টনারের প্রতি আকর্ষণে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়। এর ফলে অবাস্তব শারীরিক প্রত্যাশা, যৌন পারফরম্যান্স সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে বৈবাহিক বা দাম্পত্য সম্পর্কে তীব্র দূরত্ব ও বিচ্ছেদের মতো জটিলতা তৈরি হয়।
গবেষকদের মতে, পর্নোগ্রাফি কেবল একটি সাময়িক বিনোদন নয়, বরং এটি মানব মস্তিষ্ক ও সুস্থ জীবনযাত্রার ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক ছাপ ফেলে। তাই মানসিক ও শারীরিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি।
মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব
সমস্যাজনক ব্যবহারের সঙ্গে মানসিক অস্বস্তি, উদ্বেগ, আত্মসম্মানবোধের সমস্যা এবং দৈনন্দিন জীবনে মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধার মতো বিষয় সম্পর্কিত হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, এসব সমস্যার সঙ্গে পর্নোগ্রাফি ব্যবহারের সম্পর্ক থাকলেও সব ক্ষেত্রে কোনটি কারণ আর কোনটি ফল—তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি সিস্টামেটিক রিভিউতে কিশোরদের অনলাইন পর্নোগ্রাফি ব্যবহার এবং বিভিন্ন মানসিক সমস্যার উপসর্গের মধ্যে মাঝারি মাত্রার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
গবেষকদের মতে, সমস্যাজনক ব্যবহারের ক্ষেত্রে কেউ কেউ অন্তর্নিহিত মানসিক চাপ মোকাবিলার একটি অস্বাস্থ্যকর পদ্ধতি হিসেবে এ ধরনের কনটেন্ট ব্যবহার করতে পারে।
পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবনে ব্যাঘাত
যে কোনো অনলাইন অভ্যাস তখনই উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে, যখন সেটি দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। অতিরিক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার ঘুমের সময়সূচি, পড়াশোনায় মনোযোগ, পারিবারিক যোগাযোগ এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তবে গবেষণায় সব ক্ষেত্রে একই ধরনের ফল পাওয়া যায়নি। কিশোরদের নিয়ে ২০২৫ সালের একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পর্যালোচনায় পর্নোগ্রাফি ব্যবহার, মানসিক সুস্থতা, একাডেমিক পারফরম্যান্স ও বিভিন্ন আচরণের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে ফলাফলকে ‘মিশ্র’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকেরা আরও দীর্ঘমেয়াদি ও মানসম্মত গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
সম্পর্ক ও বাস্তবতা সম্পর্কে ভুল ধারণার ঝুঁকি
অনলাইন পর্নোগ্রাফি বাস্তব সম্পর্ক বা মানুষের স্বাভাবিক আচরণের নির্ভরযোগ্য চিত্র নয়। কিন্তু নিয়মিত ও সমস্যাজনক ব্যবহারের ক্ষেত্রে কেউ যদি অনলাইন কনটেন্টকে বাস্তব জীবনের সম্পর্কের মানদণ্ড হিসেবে নিতে শুরু করেন, তাহলে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হতে পারে।
কিশোরদের ওপর করা বিভিন্ন গবেষণায় পর্নোগ্রাফি ব্যবহারের সঙ্গে যৌনতা সম্পর্কে কিছু মনোভাব ও আচরণের সম্পর্ক পাওয়া গেলেও গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন—এসব সম্পর্ককে সরাসরি কারণ-ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা সবসময় সম্ভব নয়। ২০২৫ সালের একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পর্যালোচনাতেও ফলাফলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভিন্নতা পাওয়া গেছে।
কিশোরদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি কেন?
কৈশোর এমন একটি সময়, যখন ব্যক্তিত্ব, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সম্পর্ক সম্পর্কে ধারণা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। এ সময়ে অনলাইনে যৌন কনটেন্টের অনিয়ন্ত্রিত সংস্পর্শ ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে এবং মানসিক অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
২০২৪ সালের একটি সিস্টামেটিক রিভিউ-তে কিশোরদের যৌন কনটেন্ট ব্যবহারের সঙ্গে বয়স, বয়ঃসন্ধিকাল, সহপাঠীদের চাপ, ইন্টারনেট ব্যবহারের ধরন এবং কিছু সামাজিক ও ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষকেরা কিশোরদের জন্য বয়স-উপযোগী ও তথ্যভিত্তিক ডিজিটাল শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
