দিয়াশলাই কাঠিতে দেবী দুর্গা, ঢল নামছে দর্শনার্থীদের
মসিউর ফিরোজ, সাতক্ষীরা
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৩৯ পিএম
ছবি: ভোরের কাগজ
মাটি, খড় ও বাঁশের চেনা কাঠামোর বাইরে এবার দেড় লাখের বেশি দিয়াশলাই কাঠি ও ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতা দিয়ে তৈরি হচ্ছে দেবী দুর্গার প্রতিমা। ব্যতিক্রমী এই আয়োজন ঘিরে সাতক্ষীরার সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা মন্দিরে এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল।
পূজা শুরু হতে এখনো কয়েক দিন বাকি। এরই মধ্যে ব্যতিক্রমী প্রতিমাটি দেখতে মন্দির প্রাঙ্গণে ভিড় করছেন স্থানীয়রা। নির্মাণকাজের বিভিন্ন ধাপ মোবাইল ফোনে ধারণ করছেন অনেকে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, পূজার পাঁচ দিন সাতক্ষীরার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও দর্শনার্থীরা ব্রহ্মরাজপুরে আসবেন।
মন্দিরে এখন মৃৎশিল্পীদের ব্যস্ততা তুঙ্গে। মাটির তৈরি প্রতিমার অবয়বের ওপর একটির পর একটি দিয়াশলাই কাঠি বসিয়ে তার সঙ্গে রেশমি সুতার সূক্ষ্ম কারুকাজ করা হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে অলংকারের নকশা ও পোশাকের নকশা। একটি দিয়াশলাই কাঠি বা সুতার অবস্থান সামান্য এদিক-সেদিক হলেই নষ্ট হতে পারে পুরো নকশা। তাই প্রতিটি ধাপেই অত্যন্ত সতর্কতা ও ধৈর্যের সঙ্গে কাজ করছেন শিল্পীরা।
মৃৎশিল্পী নবদ্বীপ সরকার বলেন, ২০২৩ সালে ভারতে গিয়ে তারা এ ধরনের কাজ দেখেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার সাতক্ষীরায় দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা দিয়ে প্রতিমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে দিন-রাত পরিশ্রম করতে হচ্ছে। পূজার আগেই কাজ শেষ হবে বলে আশা করছেন তিনি।
আরো পড়ুন: নারীর সঙ্গে বিএনপি নেতার হোটেলে ‘রাতযাপন’, ছবি ভাইরাল
ব্রহ্মরাজপুর পূজা উদযাপন কমিটির সহ-ক্যাশিয়ার অমিত ঘোষ বলেন, গত বছর ধানের প্রতিমাসহ পূজা আয়োজনে প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল। এবার দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা ব্যবহারের কারণে খরচ বেড়েছে। প্রতিমা তৈরিতে দেড় লাখের বেশি দিয়াশলাই কাঠি ও ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতা ব্যবহার করা হচ্ছে। শিল্পীদের পারিশ্রমিকসহ সব মিলিয়ে এবার পূজায় প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে।
আগুনের ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রতিমার দাহ্যতা কমাতে বিশেষ কেমিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা। ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে ওই কেমিক্যাল প্রয়োগ করে এর কার্যকারিতাও যাচাই করা হয়েছে।
তবে ব্রহ্মরাজপুরে নতুনত্বের এমন আয়োজন এবারই প্রথম নয়। গত বছর ১০০ কেজি চিনিগুঁড়া ধান দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল দুর্গাপ্রতিমা। সেই প্রতিমা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী এসেছিলেন। ব্যাপক সাড়া পাওয়ার পর এবার আরও আকর্ষণীয় কিছু করার পরিকল্পনা নেয় পূজা কমিটি।
কমিটির উপদেষ্টা কানাইলাল শাকানু বলেন, গত বছরের আয়োজনের পর থেকেই পরের বছর আরও আকর্ষণীয় কিছু করার পরিকল্পনা ছিল। সেই ভাবনা থেকেই এবার দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা দিয়ে প্রতিমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, প্রতিমার দাহ্যতার বিষয়টি তাঁরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। বিশেষ কেমিক্যাল ব্যবহারের পাশাপাশি ভাস্কর ও কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে এর পরীক্ষাও করা হয়েছে।
আরো পড়ুন: মোটরসাইকেল কিনে বাড়ি ফেরার পথে দুই বন্ধুর মৃত্যু
কৌশলী সরকার বলেন, “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। আমরা চাই সবাই এখানে আসুক, প্রতিমা দেখুক এবং আনন্দ করুক।” প্রতিবছরই এই মন্দিরে নতুন কিছু করার চেষ্টা থাকে। গত বছর ধানের প্রতিমা দর্শনার্থীদের মধ্যে আকর্ষণ তৈরি করেছিল। এবার দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতার প্রতিমা আরও বেশি আকর্ষণ তৈরি করবে বলে আশা করছেন তিনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এই এলাকায় দুর্গাপূজা হয়ে আসছে। এবারও পূজা কমিটি, গ্রামবাসী ও প্রশাসনের সমন্বয়ে নিরাপদ পরিবেশে উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
মৃৎশিল্পী নবদ্বীপ সরকারের কাছে এবারের কাজটি বিশেষ গুরুত্বের। ২০২৬ সালে তিনি চারটি দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। এর মধ্যে ব্রহ্মরাজপুরের প্রতিমাটিই সবচেয়ে ব্যতিক্রমী বলে জানান তিনি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে দিন-রাত পরিশ্রম করতে হচ্ছে তাকে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘোষ বলেন, ২০২৫ সালে জেলায় ৫৮৭টি পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবারও কাছাকাছি বা তার চেয়ে বেশি মণ্ডপে পূজা হতে পারে। গত বছর ব্রহ্মরাজপুরের ধানের প্রতিমা দেখতে ব্যাপক দর্শনার্থী এসেছিলেন। এবার দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতায় প্রতিমা তৈরি হচ্ছে। কাজ যত এগোচ্ছে, প্রতিমাটিও ততই দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠছে। এবারও জেলার বাইরে থেকে দর্শনার্থীরা আসবেন বলে প্রত্যাশা করছেন তিনি।
সাতক্ষীরার ব্রহ্মরাজপুরের এই আয়োজন শুধু ব্যতিক্রমী প্রতিমা তৈরির গল্প নয়, এটি স্থানীয় শিল্পীদের সৃজনশীলতা, দক্ষতা এবং দুর্গাপূজাকে ঘিরে মানুষের উৎসাহেরও অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
