বিশ্বনাথে সংকটে মুচি সম্প্রদায়
জুতা সেলাই করেই পার হচ্ছে জীবন
বদরুল ইসলাম মহসিন, বিশ্বনাথ, সিলেট
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৭:২৬ পিএম
ছবি: ভোরের কাগজ
বাসিয়া ব্রিজের চার রাস্তার মুখ, গাড়ীর শব্দদূষন আর রাস্তায় মানুষের ভিড়, হেটে যাওয়া মানুষের হইচই। রোদ বৃষ্টি আর ধুলোবালি এর মাজেও চুই আর সুতা নিয়ে কাজ করা কিছু মানুষকে জুতার কাজ করতে দেখা যায়, যাদেরকে বলা হয় মুচি! কথা কম বলা এসব মুছিদের রাগ নেই বরং সবসময় হাসিখুশি থেকে জুতায় পলিশ আর মালিশর কাজ করে যাচ্ছে সারাদিন। তারা সবসময় হাসিখশি থেকেও ছেড়া ও নষ্ট জুতা রঙ্গিন করেই যেন প্রতিদিনের গল্পের খাতা। তাদের সকলের গল্প যেন লম্বা সুই আর সুতার আঠার রঙ্গে রঙ্গিন।
প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটের বিশ্বনাথে হাতে গোনা কয়েকজন তাদের পৈতিক পেশাকে রুটিন করেই কাজ করছেন। তাদের দুকানে নেই কোন ব্যানার বা বিজ্ঞাপন। খোলা আকাশের নিছেই তাদের এ ব্যবসা! তারপরও তারা দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের মতই জুতার উপর নির্ভশীল। তারা আছে বলেই উচ্চ শিক্ষিতরা নিশ্চিন্তে জুতা পায়ে বের হন বাসা থেকে।
সরজমিনে তাদের জীবনের এত লম্বা পথ পেরিয়ে এসেও তাদের চোখে আফসোস কম, সন্তুষ্টি বেশি। সদর বিশ্বনাথ ইউনিয়নের রাজনগর এলাকার রাজু রবি দাশ নামের ১৭ বছরের এক কিশোরকে এ কাজে লজ্জা পাও কিনা বা লেখাপড়া কেন করছো না জানতে চাইলে সে জানায়, বাবা মারা গেছেন অনেক আগে, সংসার চালানোর জন্য লেখাপড়া হচ্ছে না, বাবার পেশাকে ধরে রেখে সংসার চালাচ্ছি, এতে লজ্জা কেন পাবো, চুরিতো করছি না। সে আরো বলে, আমি সৎ পথে উপার্জন করছি, এতে আমার পরিবার চলে- এটাই আমার শক্রি।
রাস্তার পাশে জুতার কারিগর বা মুচি আমাদের দৈনন্দিক জীবনের খুব পরিচিত ও অপরিহার্য। তারা সাধারণত ফুটপাত বা রাস্তার মুড়ে বা বাজারের প্রবেশ মুখে ছোট্র একটা বক্স বা ছাতার নিচে বসে কাজ করে থাকেন। আধুনিক চায়না জুতা বাজারে আসার প্রভাবে বিশ্বনাথে মুচি সম্প্রদায়ের লোকজনের দিনাতিপাত হচ্ছে। অভাব-অনটনের মধ্যে সংসার চালানো অনেক কষ্ট তাদের।
বিশ্বনাথ উপজেলা সদরের বাসিয়া ব্রিজের নতুনবাজার মুখে প্রায় ৪০ বছর আগে খোলা জায়গায় বসে জুতা সেলাই আর পলিশের কাজ করতেন সদরের বাসিন্দা মন্তু রবি দাশ মুচি। তিনি মারা যাওয়ায় তার ভাই ও ছেলে প্রায় বেশ কয়েক বছর ধরে এ কাজ করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি বিশ্বনাথ পুরানবাজারস্থ বাস এষ্টেন্ডে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার এবদালপুর গ্রামের বাসিন্দা মিন্টুর রবি দাশ (৪৫) প্রায় ২৫ থেকে ২৬ বছর ধরে বিশ্বনাথে জুতার কাজ করছেন। তার পাশে লালাবাজার এলাকার বুদুল রবি দাশও (৫০) প্রায় ২০ বছর ধরে এ এলাকায় কাজ করছেন।
তারা জানান আমাদের এ পেশায় আগের মত আর কাজ নেই, শীত কালে কিছুটা কাজ হলেও এখন আমরা খুবই অসহায়। প্রতিদিন কেমন কাজকাম হয় জানতে চাইল তারা বলেন, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারাদিন কাজ করলে ২শত ৫০ টাকা থেকে ৩শত শত টাকা হয়। শীতকালে ৫শত থেকে ৭শত টাকা রোজি করা যায়। এ টাকা দিয়ে সংসার চালানো খুই কষ্ট। তারা বলেন, সারাদিন বসে থাকায় নানান নানান রোগে বাসা বাদছে শরীরে। প্রায় ২ যোগ আগেও ছেড়াঁ ও পুরাতন জুতা মেরামত অনেক বেশি ছিল। সেলাই আর পলিশ করার কাজ অনেক পাওয়া যেত কিন্তু এখন আগের মত কাজকাম নাই।
বর্তমানে মানুষ জুতা ছেঁড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে না, সামান্য পুরোনো বা একটু নষ্ট হলেই তা ফেলে দিয়ে নতুন জুতা কিনে নেয়। ফলে মুচিদের সেলাই বা পিন মারার কাজ কমে গেছে। বাপ-দাদার এই ঐতিহ্যবাহী পেশায় কাজ করে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। অনেকেই ইতোমধ্যে এই পেশা ছেড়ে বিকল্প কর্মসংস্থান খুঁজে পাওয়াও তাদের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। বঞ্চনার শিকার এই জনগোষ্ঠী সমাজে এখনো পিছিয়ে থাকা একটি অংশ। বাসিয়া পুলেরমুখে থাকা টেংরা গ্রামের পংখি রবি দাশ (৬২) বলেন, এ কাজে জীবনটা শেষ কওে দিছি। সরকারিভাবে আমরা কিছুই পাই না। আমরা মাত্র কয়েকটি পরিবার এ পেশায় কাজ কওে সমাজের শিক্ষিত মানুষদেও সহযোগীতা করছি। আমাদের বিশ্বনাথ উপজেলায় মুচি সম্প্রদায়ের পরিবারের এই করুন অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের সু-দৃষ্টি কামনা করছি।
জানতে চাইলে ইউরো বাংলা পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশ্বনাথ প্রেসক্লাব’ (বর্তমান মডেল প্রেসক্লাবের) সাবেক সভাপতি আব্দুল আহাদ মনে করেন, উনারা আছে বলেই আমরা জুতা পড়ছি, তাদেরকে বাচিঁয়ে রাখতে- সরকারিভাবে আরো দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান কওে, অত্র এলাকায় নতুন জুতার কারকানা তৈরির মাধ্যমে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করা সম্ভব বলে, সরকারের প্রতি এমটা আশা প্রকাশ করেন তিনি।
