×

মুক্তচিন্তা

পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তনশীল রাজনীতি ও বাংলাদেশের মূল্যায়ন

Icon

সাইফুল ইসলাম শান্ত

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৯:৩৫ পিএম

পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তনশীল রাজনীতি ও বাংলাদেশের মূল্যায়ন

ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক সবসময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে দুই দেশের সম্পর্ক শুধু রাষ্ট্রীয় কূটনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি এটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ও ভবিষ্যতের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। এই বৃহত্তর সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে যে সাংস্কৃতিক, ভাষাগত এবং ঐতিহাসিক সংযোগ রয়েছে তা ভারতের অন্য কোনো রাজ্যের সঙ্গে নেই। ফলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ক্ষমতার সমীকরণে পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা শুভেন্দু অধিকারী। গত ৯ মে তিনি শপথ গ্রহণের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠন করেন। এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘ ১৫ বছর পর রাজ্যে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের অবসান ঘটে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণ, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং জাতীয় রাজনীতির প্রভাব রাজ্যটিকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—পশ্চিমবঙ্গকে কীভাবে মূল্যায়ন করা উচিত এবং দুই বাংলার সম্পর্ককে ভবিষ্যতের জন্য আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ করা সম্ভব?

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সম্পর্কের ভিত্তি মূলত ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে নিহিত। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে অবিভক্ত বাংলার মানুষ একই প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর অংশ ছিল। দেশভাগ রাজনৈতিক সীমারেখা তৈরি করলেও ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, খাদ্যসংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যের বন্ধন পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। আজও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ কিংবা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দুই বাংলার মানুষের যৌথ সাংস্কৃতিক সম্পদ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসেও পশ্চিমবঙ্গের অবদান গভীরভাবে স্মরণীয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পশ্চিমবঙ্গ ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা, শরণার্থী এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। কোটি শরণার্থী পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় পেয়েছিল। সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে প্রশিক্ষণ শিবির গড়ে ওঠে এবং ভারতের জনগণ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ঐতিহাসিক স্মৃতি দুই অঞ্চলের সম্পর্কের একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে আজও বিদ্যমান।

তবে ইতিহাসের আবেগের পাশাপাশি বর্তমান বাস্তবতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ বর্তমানে ভারতের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ১৫ থেকে ১৮ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করেছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থলবাণিজ্যের একটি বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত স্থলবন্দর হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন শত শত ট্রাক এই সীমান্ত দিয়ে দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন করে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্যের জন্য পশ্চিমবঙ্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। অন্যদিকে বাংলাদেশ ভারত থেকে তুলা, সুতা, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক দ্রব্য, ভোগ্যপণ্য এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করে। 

এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তনশীল রাজনীতি বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ ভারতের ফেডারেল কাঠামোয় রাজ্য সরকারগুলোর অনেক ক্ষেত্রে প্রভাব রয়েছে, বিশেষ করে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মতো বিষয়ে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনেক সময় কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির সঙ্গে একমত হয় আবার অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন অবস্থানও গ্রহণ করে। ফলে বাংলাদেশকে শুধু নয়াদিল্লির সঙ্গে নয়, কলকাতার রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও পরিচিত থাকতে হয়। তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি তার একটি বড় উদাহরণ। বহু বছর ধরে আলোচিত এই চুক্তি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এর অন্যতম কারণ পশ্চিমবঙ্গের আপত্তি। ফলে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। ভবিষ্যতে পানি ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত অবকাঠামো বা আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যেতে পারে। বাংলাদেশের জন্য তাই পশ্চিমবঙ্গকে শুধুমাত্র ভারতের একটি রাজ্য হিসেবে দেখলে চলবে না, এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। 

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো ‘পরিচয় রাজনীতির’ ক্রমবর্ধমান প্রভাব। সীমান্ত, অভিবাসন, নাগরিকত্ব এবং ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কিত বিষয়গুলো গত এক দশকে রাজ্যটির রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। এসব ইস্যু কখনো কখনো বাংলাদেশের নামকে সরাসরি রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ করে তোলে। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এগুলো ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রশ্ন, তবুও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের কূটনীতিকে আরও পরিণত ও আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। আবেগ বা প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থানের পরিবর্তে তথ্যভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বৈধ বাণিজ্য, জনসংযোগ এবং সাংস্কৃতিক কূটনীতিকে শক্তিশালী করা গেলে ভুল বোঝাবুঝি কমানো সম্ভব হবে।

প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি চিকিৎসা, শিক্ষা এবং পর্যটনের উদ্দেশ্যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সফর করেন। একইভাবে পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকদের জন্য কক্সবাজার, সুন্দরবন, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে। যৌথ পর্যটন প্যাকেজ, সহজ ভিসা ব্যবস্থা এবং উন্নত যোগাযোগ এই খাতকে আরও এগিয়ে নিতে পারে।

ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও দুই বাংলার সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। বাংলা ভাষা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভাষা। কিন্তু বৈশ্বিক পরিসরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে আরও শক্তিশালীভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে দুই বাংলার যৌথ উদ্যোগ এখনো সীমিত। সাহিত্য উৎসব, চলচ্চিত্র, গবেষণা, অনুবাদ প্রকল্প এবং ডিজিটাল কনটেন্টে সহযোগিতা বাড়ানো গেলে বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। তবে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পারস্পরিক সম্মান। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কখনোই পুরোপুরি একমুখী হতে পারে না। উভয় দেশকেই একে অপরের স্বার্থ, উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সম্মান করতে হবে। বাংলাদেশ যেমন ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব দেয়, তেমনি ভারতেরও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত স্বার্থের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন।

বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটেও এই সম্পর্ক নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কৌশলগত প্রতিযোগিতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাস এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ যদি সংযোগ, বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতাকে আরও এগিয়ে নিতে পারে তাহলে উভয় পক্ষই লাভবান হবে। ইতিহাস আমাদের সংযুক্ত করেছে, ভাষা আমাদের কাছাকাছি এনেছে, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সম্পর্ককে গভীর করেছে কিন্তু ভবিষ্যতের সম্পর্ক নির্ধারিত হবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, পারস্পরিক আস্থা এবং যৌথ স্বার্থের ভিত্তিতে।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ হলেও কিছু অমীমাংসিত সমস্যা এখনও দুই দেশের জনগণের মধ্যে প্রশ্ন ও অসন্তোষের জন্ম দেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, বিশেষ করে তিস্তা চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা। এছাড়া সীমান্তে হতাহতের ঘটনা এবং মাঝে মাঝে রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কও সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। এসব সমস্যার সমাধানে প্রথমত, দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত ও কার্যকর রাজনৈতিক সংলাপ জোরদার করতে হবে। তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টনে ন্যায্য ও টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, সীমান্তে প্রাণহানি শূন্যে নামিয়ে আনতে যৌথ টহল, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, বাণিজ্যে ভারসাম্য আনার জন্য বাংলাদেশি পণ্যের বাজারপ্রবেশ আরও সহজ করতে হবে এবং অশুল্ক বাধা কমাতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি, পর্যটন ও গণমাধ্যম পর্যায়ে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি করলে পারস্পরিক আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলাতে পারে, দলীয় সমীকরণ পরিবর্তিত হতে পারে কিন্তু দুই বাংলার মানুষের মধ্যে যে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে তা অটুট থাকবে। সেই বন্ধনকে আধুনিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তিতে নতুন রূপ দিতে পারলে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উভয়ের জন্যই আরও স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ এবং সহযোগিতামূলক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

মালয়েশিয়ার কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের মুক্ত করতে চেষ্টা চালাবো

প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের মুক্ত করতে চেষ্টা চালাবো

হান্নান মাসুদের বক্তব্য ঘিরে সংসদে পাল্টাপাল্টি উত্তেজনা

হান্নান মাসুদের বক্তব্য ঘিরে সংসদে পাল্টাপাল্টি উত্তেজনা

নরসিংদীতে বজ্রপাতে তিন মাদ্রাসাছাত্রের মৃত্যু

নরসিংদীতে বজ্রপাতে তিন মাদ্রাসাছাত্রের মৃত্যু

এমপিপুত্র যুবদল নেতা আটক

এমপিপুত্র যুবদল নেতা আটক

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App