×

মুক্তচিন্তা

রাষ্ট্রের প্রান্তে নির্বাসিত নাগরিকেরা

Icon

রাসেল আহমদ

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩০ পিএম

রাষ্ট্রের প্রান্তে নির্বাসিত নাগরিকেরা

রাসেল আহমদ। ফাইল ছবি

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে এমন কিছু ট্র্যাজেডি আছে, যেগুলো নিয়ে আনুষ্ঠানিক স্মরণ হয়, বক্তৃতা হয়, দিবসও সরকার ভেদে পালিত হয়; কিন্তু সেই ইতিহাসের ভেতরে থাকা অসংখ্য মানুষের ছোট-বড় গল্পটা থেকে যায় প্রায় অদৃশ্য। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পরবর্তী সময় তেমনই এক অন্ধকার অধ্যায়। এই হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক অভিঘাত নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে; কিন্তু সীমান্তবর্তী হাওরাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর নেমে আসা মানবিক বিপর্যয়ের ইতিহাস আলোচনায় এসেছে, এমনটা কেউ বলছেন না।

সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওর ও ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়ের সন্ধিস্থলে অবস্থিত বাঙ্গালভিটাসহ আশপাশের প্রায় ১৬টি গ্রামের ইতিহাস তাই কেবল একটি আদিবাসী পল্লীর ইতিহাস নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রান্তে বসবাসকারী নাগরিকদের বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়া, ভূমি হারানো এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় স্মৃতি থেকেই যেন নির্বাসিত হয়ে পড়ার ইতিহাস।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙ্গালভিটার ৬২টি গারো পরিবার মুক্তিযোদ্ধা এবং হিন্দু-মুসলিম শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিল -স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিতে এমন বর্ণনা পাওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধের সেই মানবিক ভূমিকার ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সশস্ত্র প্রতিবাদকারীদেরও এই সীমান্তের এই জনপদে আশ্রয় ও যাতায়াত ছিল বলে স্থানীয়দের দাবি।

পরবর্তী সময়ে তৎকালীন সরকারের প্রতিরোধ ও দমন-পীড়নের মুখে সেই সশস্ত্র প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে থেমে যায় প্রতিবাদী তৎপরতা। এরপরই বাঙ্গালভিটা ও আশপাশের গ্রামগুলোর ওপর নেমে আসে প্রশাসনিক চাপ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং ভূমি দখলের নানা ঘটনা। বহু পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় দেশত্যাগে বাধ্য হয়। কেউ আশ্রয় নেয় ভারতের আসামে, কেউ মেঘালয়ের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে- এমন অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিচারণে।

বাঙ্গালভিটার প্রাণেশ রেমা সেই সময়ে দেশছাড়া হয়েছিলেন, ফিরে এসেছেন কোনমতে প্রাণেবেঁচে। তাঁর ভাষ্য, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর যারা আনন্দ মিছিল করেছে ও মিষ্টি বিতরণ করেছে বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত ছিল, তাদেরই কেউ কেউ পরে গারোদের ভিটেমাটি দখল করেছে।

এটি একটি স্থানীয় অভিযোগমূলক স্মৃতিচারণ -এর পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক যাচাই প্রয়োজন। কিন্তু এই স্মৃতির গুরুত্ব এখানেই যে, কয়েক দশক পরও একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সেই সময়ের ভয় ও বেদনা জীবন্ত রয়েছে।

কবি ও সাংস্কৃতিক সংগঠক হাজং শ্রী দশরথ চন্দ্র অধিকারী তাঁর লেখা "বাংলাদেশ তোমার বুকে" কবিতার পঙক্তি -"মাতৃভূমি , তোমার বুক থেকে আমরা কি বিলীন হবো?" - এতে হাওরপারের গারো, হাজং ও বানাইদের বাস্তুভিটা হারানোর-দেশ হারানোর সেই কথাই উচ্চারিত হয়েছে। তার কবিতার আলাপে বারবার উঠে আসে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১, ১৯৭৫ ও তৎপরবর্তী বিভিন্ন অভিঘাতে বহুমাত্রিক বঞ্চনার কথা। তার ভাষ্য, '৭৫-এ ভিটেমাটি হারানো অনেক পরিবার প্রাণভয়ে রাতারাতি গ্রাম ছেড়ে মেঘালয়ের পাহাড়ি জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। পরবর্তী সময়ে কয়েকটি পরিবার ফিরে এলেও এখনো কাইটাকোনার এলিন সাংমা, বাঙ্গালভিটার সুদন হাজং ও সুবোধ হাজংদের ৪০ থেকে ৪৫টি পরিবার মাতৃভূমিতে ফিরতে পারেনি। সীমান্তের ওপারে অনিশ্চিত ও মানবেতর জীবনযাপন করতে গিয়ে এসব পরিবারের অনেকেই খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপদ জীবনের অভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন বলে তাঁদের স্বজনরা জানতে পেরেছেন। 

নেত্রকোনা শহরের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা সুকুমার রায়ের বক্তব্যে এই প্রশ্ন আরও বিস্তৃত হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের আগস্টে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘৭৫-এর প্রতিরোধযোদ্ধা বীর কমান্ডো’ সংগঠনের একটি মানববন্ধনে দাবি করা হয়েছিল, সীমান্তবর্তী অঞ্চলের আট শতাধিক প্রতিরোধযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্য এখনো কার্যত স্বেচ্ছানির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। সংখ্যাটি ও দাবিটির স্বাধীন সরকারি যাচাই প্রয়োজন; তবে এটি যদি সত্যের কাছাকাছি হয়, তাহলে বিষয়টি নিছক অতীতের একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয় -এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।

বাঙ্গালভিটাসহ এই অঞ্চলের ১৬টি গ্রামে গারো, হাজং ও বানাই জনগোষ্ঠীর কয়েক হাজার মানুষের বসবাস। তাঁদের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, নানকার বিদ্রোহ, টংক আন্দোলন, ১৯৪৭-এর দেশভাগ, বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক সংঘাত, মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭৫- ও পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা -প্রতিটি বড় রাজনৈতিক অভিঘাত কোনো না কোনোভাবে এই জনগোষ্ঠীর জীবনকে নাড়া দিয়েছে। বারবার তাদের ঘর বদলাতে হয়েছে, ভূমি হারাতে হয়েছে, নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক শিক্ষা হলো -বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের অভিঘাত সমাজের সবচেয়ে দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপরই বেশি পড়ে। হাওর ও পাহাড়ের সন্ধিস্থলে বসবাসকারী এই জনগোষ্ঠীর ইতিহাস যেন সেই বাস্তবতারই জীবন্ত দলিল।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ধীরে ধীরে এ অঞ্চলে বহিরাগত বাঙালি বসতি বাড়তে থাকে এবং ক্রমশঃ বহু আদিবাসী পরিবার নিজেদের ভূমিতেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে। জমি দখল, প্রতারণামূলক দলিল, ভয়ভীতি এবং প্রশাসনিক অবহেলার অভিযোগে অনেক পরিবার ভূমি হারাতে থাকে। 

গহীন গিরি হাজংয়ের ঘটনা এই দীর্ঘ বাস্তবতার একটি মর্মস্পর্শী উদাহরণ। মাত্র ৪৮ শতাংশ জমি বিক্রি করতে গিয়ে তিনি দলিলসংক্রান্ত প্রতারণার শিকার হন। অভিযোগ রয়েছে, দলিলে কারসাজি করে তাঁর বিপুল পরিমাণ জমি অন্যের নামে চলে যায়। জীবনের শেষ পর্যায়ে একসময়ের সচ্ছল এই মানুষকে ভিক্ষাবৃত্তি করে সংসার চালাতে হয়েছে বলে তাঁর পরিবারের সদস্যরা জানান।

তাঁর নাতি বিমল হাজংয়ের প্রশ্ন আরও গভীর -দেশত্যাগ না করেও কীভাবে তাঁর নানার প্রায় ৫৭ একর জমি একসময় ‘শত্রু সম্পত্তি’ হিসেবে চিহ্নিত হলো? এই প্রশ্নটি শুধু একটি পরিবারের নয়। এটি বাংলাদেশের ভূমি প্রশাসন, সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি-অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচারের বৃহত্তর সংকটের দিকে ইঙ্গিত করে।

আদিবাসী ট্রাইব্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যনগর উপজেলা চেয়ারম্যান অজিত কুমার হাজংয়ের সাথে আলাপে উঠে এসেছে একই অভিযোগ। তাঁর দাবি , ভূমি দখল ও নানা ধরনের নির্যাতনের মধ্য দিয়ে এই জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে অর্থনৈতিকভাবে সর্বহারা করে ফেলা হয়েছে। বসতভিটা, কৃষি জমি এমনকি মৃত সৎকারের এক টুকরো জমিও বাদ দেয়নি দখলদারেরা। আর ভূমি হারানোর সঙ্গে সঙ্গে অনেক পরিবার দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে। যারা টিকে আছে, তারাও আজ নানান বঞ্চনার শিকার হন।

সীমান্তের জল-জংলায় বঞ্চনার দীর্ঘসূত্রতা আরও পুরোনো। তবে মধ্যনগরের গারো, হাজং, বানাইদের ভূমি দখলকে শুধু একটি দেওয়ানি বিরোধ হিসেবে দেখলে তাঁদের সমস্যার গভীরতা ধরা পড়ে না।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ঘটনাকে এখনো বিচ্ছিন্ন কিছু পারিবারিক বা স্থানীয় সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। অথচ ভূমি হারানো, রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, নিরাপত্তাহীনতা ও সাংস্কৃতিক অবমূল্যায়ন -সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক বঞ্চনার ধারাবাহিকতা।

আমরা রাষ্ট্রের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির কথা বলছি। কিন্তু উন্নয়নের এই খতিয়ানে কাইটাকোনা বা বাঙ্গালভিটার নির্বাসিত পরিবারগুলোর জায়গা কোথায়? মেঘালয়ের পাহাড়ে কিংবা সীমান্তের ওপারে অনিশ্চিত জীবনে থাকা সেই মানুষগুলোর কথা আমাদের কিংবা রাষ্ট্রের স্মৃতিতে কতটা আছে? গহীন গিরি হাজংয়ের হারানো জমির ন্যায়সংগত অধিকার কি তাঁর উত্তরাধিকারীরা কোনোদিন পাবেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা একই জনপদের বাসিন্দা হিসাবে যেমন আমার দ্বায়িত্ব, তেমনি এটি নাগরিক অধিকার ও আইনের শাসনের প্রশ্ন।

আমাদের রাষ্ট্র চাইলে অন্তত কয়েকটি কাজ এখনই করতে পারে। ১৯৭১ ও ১৯৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক অভিঘাতে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা যেতে পারে। সীমান্তের ওপারে থাকা পরিবারগুলোর বিষয়ে কূটনৈতিক ও মানবিক অনুসন্ধান চালানো যেতে পারে। ভূমি হারানোর অভিযোগগুলো নথি ও খতিয়ানভিত্তিকভাবে পুনঃপরীক্ষার জন্য স্বাধীন কমিশন গঠন করা যেতে পারে। প্রকৃত মালিকানা প্রমাণিত হলে দ্রুত ভূমি পুনরুদ্ধারের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

এমন উদ্যোগ কোনো অতীতকে পুনরুজ্জীবিত করার রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; বরং রাষ্ট্রের নথি থেকে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের পুনরায় দৃশ্যমান করার একটি ন্যায়বিচারমূলক প্রক্রিয়া।

মেঘালয়ের পাহাড়ি পথ কিংবা সীমান্তের ওপারের অচেনা জনপদে এখনো হয়তো ছড়িয়ে আছে সেইসব মানুষের দীর্ঘশ্বাস, যারা একদিন এই ভূখণ্ডেই নিজেদের ঘর, উঠান ও ভবিষ্যৎ দেখেছিল। তাদের কেউ হয়তো আর ফিরতে পারেননি। কেউ ফিরেছেন, কিন্তু হারানো ভিটা ফিরে পাননি। কেউ আবার ফিরে আসার অপেক্ষাতেই জীবন শেষ করেছেন। তাঁদের ইতিহাস বাংলাদেশের ইতিহাসের বাইরের কোনো ইতিহাস নয়।

রাষ্ট্রের প্রান্তে নির্বাসিত এই মানুষদের স্মৃতিকে রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে ফিরিয়ে আনা তাই শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি ন্যায়বিচার, নাগরিক সমতা এবং আইনের শাসনেরও অপরিহার্য পরীক্ষা।

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

কেন রজনীকান্তের সঙ্গে কাজ করতে চাননি অমরীশ পুরী?

কেন রজনীকান্তের সঙ্গে কাজ করতে চাননি অমরীশ পুরী?

রাষ্ট্রের প্রান্তে নির্বাসিত নাগরিকেরা

রাষ্ট্রের প্রান্তে নির্বাসিত নাগরিকেরা

নতুন পে-স্কেলে সম্ভাব্য বেতন তালিকা, প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষা

নতুন পে-স্কেলে সম্ভাব্য বেতন তালিকা, প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষা

গত ছয় মাসে দেশে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

গত ছয় মাসে দেশে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App