মৃত্যুর ১৭ বছর পরও থামেনি মাইকেল জ্যাকসনের আয়
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৬ পিএম
মাইকেল জ্যাকসন। ফাইল ছবি
পুরো নাম মাইকেল জোসেফ জ্যাকসন। ভক্তদের কাছে তিনি ছিলেন ‘মাইকো’, আর বিশ্বসংগীতে পরিচিত ‘কিং অব পপ’ নামে। গান, নাচ, পোশাক, মিউজিক ভিডিও—সবকিছু মিলিয়ে মাইকেল জ্যাকসন ছিলেন এক অনন্য সাংস্কৃতিক ঘটনা। মৃত্যুর ১৭ বছর পরও সংগীত, নৃত্য ও পপ সংস্কৃতিতে তাঁর প্রভাব এতটুকু ম্লান হয়নি। বরং তাঁর রেখে যাওয়া গান, নাম ও সৃষ্টিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল এক অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য।
১৯৫৮ সালের ২৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গ্যারি শহরে জন্ম মাইকেল জ্যাকসনের। তখন হয়তো কেউ ভাবেননি, এই শিশুই একদিন পপসংগীতের ভাষা বদলে দেবেন। কয়েক দশকের ক্যারিয়ারে তিনি শুধু গান করেননি; তৈরি করেছিলেন নিজস্ব এক সাংস্কৃতিক জগৎ, যার প্রভাব আজও বিশ্বজুড়ে।
২০০৯ সালের ২৫ জুন মাত্র ৫০ বছর বয়সে মারা যান মাইকেল জ্যাকসন। মৃত্যুর সময় তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল নানা বিতর্কে জর্জরিত। ছিল আইনি জটিলতা ও বিপুল ঋণের বোঝাও। কিন্তু মৃত্যুর পরের ১৭ বছরে পরিস্থিতি বদলে যায় নাটকীয়ভাবে। তাঁর নামকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এমন এক ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য, যা অনেক জীবিত তারকার আয়কেও ছাড়িয়ে গেছে।
প্রয়াত এই পপ কিংবদন্তির জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক মৃত্যুর পর তাঁর গড়ে ওঠা সেই ‘দ্বিতীয় ক্যারিয়ার’-এর গল্প।

মৃত্যুর পরও অব্যাহত আয়
মাইকেল জ্যাকসনের গান আজও চলছে। নতুন প্রজন্ম তাঁর নাচ শিখছে, মঞ্চে তাঁর জীবন ও সংগীত নিয়ে বাদ্যনাট্য হচ্ছে। লাস ভেগাসে চলছে তাঁর নামে স্থায়ী শো। সিনেমা, স্ট্রিমিং, সংগীত বিক্রি, রয়্যালটি ও লাইসেন্সিং—বিভিন্ন খাত থেকে এখনও কোটি কোটি ডলার আয় করছে তাঁর নাম।
ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ সালে মৃত্যুর পর থেকে মাইকেল জ্যাকসনের এস্টেট ৩৫০ কোটি ডলারের বেশি আয় করেছে। এই আয়ের পরিমাণ তাঁকে মৃত তারকাদের উপার্জনের তালিকায় অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
আরও পড়ুন: ‘খুন’ নিয়ে গান পোস্ট, দুই ঘণ্টার মধ্যেই গায়ককে গুলি করে হত্যা
২০২৫ সালের ফোর্বসের তালিকাতেও তিনি ছিলেন বিশ্বের সর্বোচ্চ আয়কারী মৃত তারকা। ওই এক বছরে তাঁর এস্টেটের আয় ছিল প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১ হাজার ২৮০ কোটি টাকা।
ঋণের বোঝা থেকে বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য
আজকের এই বিপুল আয়ের সঙ্গে মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যুকালীন আর্থিক অবস্থার ছিল বড় ধরনের বৈপরীত্য।
বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, মৃত্যুর সময় তাঁর ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৫ কোটি ডলার। যদিও তাঁর হাতে ছিল অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ, সংগীতের অধিকার এবং বিপুল ব্যবসায়িক সম্ভাবনা; কিন্তু নগদ অর্থের সংকটও ছিল তীব্র।
মাইকেলের মৃত্যুর পর তাঁর এস্টেটের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা বুঝতে পারেন, সম্পদগুলো যথাযথভাবে পরিচালনা করা গেলে এই পরিস্থিতি পাল্টানো সম্ভব। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর ‘দ্বিতীয় ক্যারিয়ার’। মঞ্চে দাঁড়িয়ে এই ক্যারিয়ার তিনি নিজে পরিচালনা করেননি; বরং তাঁর রেখে যাওয়া গান, ভিডিও, নাম, ব্র্যান্ড ও কোটি ভক্তের স্মৃতিকে ঘিরেই গড়ে ওঠে সেই ব্যবসা।
‘দিস ইজ ইট’ দিয়ে নতুন যাত্রা
মৃত্যুর আগে মাইকেল জ্যাকসন প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বহুল আলোচিত ‘দিস ইজ ইট’ কনসার্ট সিরিজের জন্য। তাঁর মৃত্যুতে সেই কনসার্ট আর অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে মহড়ার ফুটেজ, পর্দার পেছনের দৃশ্য এবং শেষ সময়ের প্রস্তুতি নিয়ে তৈরি করা হয় ‘মাইকেল জ্যাকসনস দিস ইজ ইট’ চলচ্চিত্র।
২০০৯ সালে মুক্তির পর ছবিটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে। বক্স অফিসে আয় করে ২৬ কোটির বেশি ডলার। পরে ডিভিডি, সংগীত ও বিভিন্ন পণ্য বিক্রি থেকেও আসে উল্লেখযোগ্য অর্থ।

এক অর্থে, মৃত্যুর পর মাইকেল জ্যাকসনের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য পুনর্গঠনের প্রথম বড় ভিত্তি ছিল এই চলচ্চিত্র। ভক্তদের জন্য এটি ছিল প্রিয় শিল্পীকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ। ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে এটি প্রমাণ করে, মাইকেল জ্যাকসনের নাম তখনও বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বিনোদন ব্র্যান্ড।
৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলারের বিনিয়োগ থেকে শত শত কোটি
মাইকেল জ্যাকসনের ব্যবসায়িক দূরদর্শিতার অন্যতম বড় উদাহরণ তাঁর সংগীত কপিরাইটের মালিকানা।
১৯৮৫ সালে প্রায় ৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলারে ‘এটিভি’ নামের একটি সংগীত ক্যাটালগ কিনেছিলেন তিনি। এতে প্রায় চার হাজার গানের অধিকার ছিল। এর মধ্যে জন লেনন ও পল ম্যাককার্টনির লেখা বিটলসের বহু জনপ্রিয় গানও ছিল।
আরও পড়ুন: শরীর-চরিত্র নিয়ে কথা বলছে অনেকে, ভয় পাওয়ার পাত্রী নই
তখন অনেকের কাছে এটি ছিল ব্যয়বহুল বিনিয়োগ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রমাণিত হয়, এটি ছিল সংগীত ব্যবসার ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
পরে সনির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ক্যাটালগটির মূল্য আরও বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ২০১৬ সালে মাইকেল জ্যাকসনের এস্টেট তাদের অংশ সনির কাছে প্রায় ৭৫ কোটি ডলারে বিক্রি করে।
অর্থাৎ ৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলারের একটি বিনিয়োগই পরবর্তী সময়ে শত শত কোটি ডলারের ব্যবসার ভিত্তি হয়ে ওঠে।
সংগীতের অধিকারেই শত কোটি ডলারের সম্পদ
মৃত্যুর বহু বছর পরও মাইকেলের সংগীতের মূল্য কমেনি, বরং বেড়েছে। ২০২৪ সালে তাঁর এস্টেট নিজস্ব সংগীত, মাস্টার রেকর্ডিং ও প্রকাশনা অধিকার-সংক্রান্ত সম্পদের ৫০ শতাংশ অংশীদারত্ব সনির কাছে প্রায় ৬০ কোটি ডলারে বিক্রি করে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, এই চুক্তির ফলে মাইকেল জ্যাকসনের সংগীতসম্পদের মূল্য প্রায় ১২০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।
তবে চুক্তিটি নিয়ে পারিবারিক ও আইনি বিতর্কও হয়েছিল। মাইকেলের মা ক্যাথরিন জ্যাকসন এর বিরোধিতা করেছিলেন। পরে আদালত এস্টেট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।
এ ঘটনা আবারও দেখিয়ে দেয়, মৃত্যুর দেড় দশক পরও মাইকেল জ্যাকসনের সংগীতের অধিকার বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান বিনোদন সম্পদগুলোর একটি।
মঞ্চেও চলছে ‘মাইকেল’ ব্র্যান্ড
মাইকেল জ্যাকসনের আয় শুধু গান শোনা বা রেকর্ড বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর জীবন ও সংগীতকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বড় লাইভ বিনোদন ব্যবসাও।
‘এমজে: দ্য মিউজিক্যাল’ ব্রডওয়েতে মাইকেলের জীবন ও সংগীত নিয়ে তৈরি একটি সফল প্রযোজনা। ২০২২ সালে শুরু হওয়ার পর এটি যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন প্রযোজনার পথ খুলে দিয়েছে।

অন্যদিকে লাস ভেগাসে দীর্ঘদিন ধরে চলছে ‘মাইকেল জ্যাকসন ওয়ান’। সার্ক দ্যু সোলেইলের এই শোতে মাইকেলের গান, নাচ ও দৃশ্যভাষাকে নতুন প্রজন্মের দর্শকের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। শোটি ইতোমধ্যে পাঁচ হাজারের বেশি প্রদর্শনী করেছে এবং এর মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
ডিজিটাল যুগে নতুন আয়ের পথ
মাইকেল জ্যাকসনের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁর গান। ডিজিটাল যুগ সেই সম্পদের মূল্য আরও বাড়িয়েছে।
একসময় গান বিক্রি হতো ক্যাসেট, সিডি কিংবা রেকর্ডে। এখন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে একটি গান যতবার শোনা হয়, ততবারই তৈরি হয় রয়্যালটির নতুন সম্ভাবনা।
ফলে ১৯৮০ বা ১৯৯০-এর দশকে প্রকাশিত মাইকেল জ্যাকসনের গান ২০২৬ সালের কিশোর-তরুণরাও শুনছে। পুরোনো গান পাচ্ছে নতুন শ্রোতা, আর তৈরি হচ্ছে নতুন আয়ের উৎস।
মৃত্যুর পরও তাঁর দীর্ঘস্থায়ী আয়ের অন্যতম বড় রহস্য এখানেই—মাইকেল জ্যাকসনের এস্টেট শুধু পুরোনো ভক্তদের ওপর নির্ভর করছে না; বরং নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর গান ও ব্র্যান্ডকে পৌঁছে দিচ্ছে।
‘মাইকেল’ সিনেমায় নতুন প্রজন্মের কাছে ফেরা
২০২৬ সালে মুক্তি পেয়েছে মাইকেল জ্যাকসনকে নিয়ে বহুল প্রতীক্ষিত জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘মাইকেল’। ছবিটি পরিচালনা করেছেন অঁতোয়ান ফুকুয়া এবং মাইকেলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তাঁর ভাতিজা জাফর জ্যাকসন।
ছবিটি শুধু একটি জীবনীচিত্র নয়; ব্যবসায়িক দৃষ্টিতেও এটি মাইকেল জ্যাকসন ব্র্যান্ডকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বড় মাধ্যম।
ফোর্বসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একটি সফল জীবনীচিত্র শুধু বক্স অফিস থেকেই আয় করে না। এর প্রভাব পড়ে সংগীত স্ট্রিমিং, পুরোনো অ্যালবাম বিক্রি, মার্চেন্ডাইজ, মঞ্চনাট্য ও অন্যান্য বিনোদন ব্যবসাতেও।
অর্থাৎ একটি সিনেমা মুক্তির পর দর্শক আবার ‘থ্রিলার’ শুনতে শুরু করতে পারে, ‘ব্যাড’ অ্যালবাম কিনতে পারে কিংবা মাইকেলকে নিয়ে তৈরি মিউজিক্যালে যেতে পারে।
এ কারণেই মাইকেল জ্যাকসন শুধু ইতিহাসের একজন কিংবদন্তি নন; মৃত্যুর ১৭ বছর পরও তাঁর নাম একটি চলমান বৈশ্বিক বিনোদন ব্যবসা।
