×

মুক্তচিন্তা

‘তদন্তাধীন’ বলেই কি দায় শেষ? আধুনিক পুলিশিংয়ের বিপরীতে বাংলাদেশের বাস্তবতা

Icon

মাহফুজ খান, নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫২ পিএম

‘তদন্তাধীন’ বলেই কি দায় শেষ? আধুনিক পুলিশিংয়ের বিপরীতে বাংলাদেশের বাস্তবতা

ফাইল ছবি

একজন মানুষ বিপদের আশঙ্কায় থানায় গেলেন। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে করলেন সাধারণ ডায়েরি (জিডি)। কিন্তু এরপরও যদি একই সমস্যা চলতে থাকে, আবারও অভিযোগ করতে হয়, এমনকি একাধিক থানায় যেতে হয় তাহলে সেই অভিযোগের প্রতিকার কোথায়? পুলিশের দায়িত্ব কি শুধু অভিযোগ লিখে রাখা, নাকি বিপদ ঘটার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া?

আধুনিক পুলিশিংয়ের ধারণা বলছে, অপরাধ ঘটার পর অপরাধীকে গ্রেপ্তার করাই পুলিশের একমাত্র কাজ নয়। বরং অপরাধের সম্ভাবনা আগে থেকে শনাক্ত করা, ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া এবং অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করাই কার্যকর পুলিশিংয়ের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বিশ্বজুড়ে এ ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘প্রো-অ্যাকটিভ পুলিশিং’।

কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় পুলিশের এই আগাম ভূমিকা কতটা কার্যকর? থানায় অভিযোগ জানানোর পর মানুষ কত দ্রুত সাড়া পাচ্ছেন? অভিযোগের তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ হচ্ছে? আর কোনো অভিযোগের বিষয়ে ‘তদন্তাধীন’ বলা হলে, সেটির অগ্রগতি জানার সুযোগই বা কতটা রয়েছে?

অপরাধ ঘটার আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার নাম প্রো-অ্যাকটিভ পুলিশিং

প্রো-অ্যাকটিভ পুলিশিংয়ের মূল ধারণা খুব সহজ। কোনো এলাকায় বারবার ছিনতাই হচ্ছে—অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শুধু মামলা ও গ্রেপ্তারে সীমাবদ্ধ না থেকে আগেই সেই এলাকার ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা, টহল বাড়ানো এবং অপরাধের সম্ভাব্য কারণগুলো চিহ্নিত করা। কোনো ব্যক্তি বা পরিবার হুমকির কথা জানালে সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে ঝুঁকি যাচাই করা। আগাম গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তি ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা কাজে লাগিয়ে অপরাধের সুযোগ কমিয়ে আনা।

অর্থাৎ, অপরাধ হওয়ার পর পুলিশের তৎপরতার পাশাপাশি অপরাধ ঘটতে না দেওয়ার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশেও বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মতো উদ্যোগ রয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের বিট পুলিশিং কার্যক্রমে নির্দিষ্ট এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং অপরাধ প্রতিরোধে কাজ করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু উদ্যোগ থাকলেই তার সুফল নিশ্চিত হয় না। মাঠপর্যায়ে অভিযোগের দ্রুত সাড়া, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং কার্যকর পদক্ষেপ কতটা হচ্ছে, সেটিই আসল বিবেচ্য।

জিডি করলেই কি পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে হয়?

অনেকের ধারণা, থানায় জিডি করলেই পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়।

সাধারণ ডায়েরি বা জিডি হলো থানায় কোনো ঘটনা, আশঙ্কা, হারানো সম্পদ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করার একটি পদ্ধতি। জিডি করা মানেই কোনো ব্যক্তি অপরাধী প্রমাণিত হয়ে যাওয়া নয়। আবার জিডি হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা বা গ্রেপ্তারের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় না।

তবে জিডিতে এমন কোনো তথ্য উঠে এলে, যা আমলযোগ্য অপরাধের ইঙ্গিত দেয়, তখন পুলিশকে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়। অভিযোগের প্রকৃতি, প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া নির্ধারিত হয়।

এখানেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জিডি নথিভুক্ত করেই পুলিশের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। অভিযোগের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় যাচাই, ঝুঁকি থাকলে নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

আইনেই রয়েছে অপরাধ প্রতিরোধের দায়িত্ব

বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৪৯ ধারায় বলা হয়েছে, পুলিশ কর্মকর্তারা আমলযোগ্য অপরাধ প্রতিরোধে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন এবং নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী এমন অপরাধ সংঘটন ঠেকানোর দায়িত্ব তাঁদের রয়েছে।

১৫০ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো পুলিশ কর্মকর্তা আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটনের পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য পেলে তা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং প্রয়োজনীয় অন্য কর্মকর্তাকে জানাবেন।

অন্যদিকে পুলিশ আইন, ১৮৬১-এর ২৩ ধারায় পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে অপরাধ প্রতিরোধ, জনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও আদান-প্রদান এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার বিষয় উল্লেখ রয়েছে।

অর্থাৎ, অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধও পুলিশের আইনি দায়িত্বের অংশ। এটি কেবল ভালো কাজের প্রত্যাশা নয়, আইনে নির্ধারিত দায়িত্বও।

তিন থানায় তিন জিডি, তবু অভিযোগকারীর অপেক্ষা

এই বাস্তবতার একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে তিনটি থানায় করা তিনটি জিডির ঘটনা।অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৮ জুন রূপগঞ্জ থানায় ৪৬৩ নম্বর জিডি করা হয়। এরপর ১৩ জুন ডেমরা থানায় ৯৮৭ নম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর লালবাগ থানায় ১৪৪৬ নম্বর জিডি করা হয়। এর মধ্যে ডেমরা থানার জিডিতে এক নারীকে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, একাধিক থানায় জিডি করার পরও তিনি কার্যকর প্রতিকার পাননি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে জানানোর চেষ্টাও করেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৫ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সচিব ফয়সাল হাসানকে হোয়াটসঅ্যাপে বিষয়টি জানানোর পর সংশ্লিষ্ট থানায় অবহিত করা হয়।

কিন্তু পুলিশের বক্তব্য, অভিযোগগুলো এখনো তদন্তাধীন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে অভিযোগকারীর আশঙ্কা, অদৃশ্য কোনো চাপের কারণে অভিযোগগুলো এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। যদিও এমন চাপের বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এখানে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, অভিযোগকারীর বক্তব্যের সত্যতা তদন্তে যাচাই করতে হবে। দ্বিতীয়ত, তদন্তের নামে অভিযোগ অনির্দিষ্টকাল ঝুলে আছে কি না, সেটিও নজরদারির বাইরে থাকতে পারে না। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তিনি অপরাধী হয়ে যান না; একইভাবে অভিযোগ তদন্তাধীন থাকলেই অভিযোগকারীর নিরাপত্তা ও প্রতিকারের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না।

তদন্তের সময়সীমা নিয়ে আইন কী বলছে?

তদন্ত দীর্ঘায়িত হওয়া নিয়েও রয়েছে আইনি বিধান। ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল প্রণীত ফৌজদারি কার্যবিধির সংশোধনীতে ১৭৩বি ধারা যুক্ত হয়েছে। এই বিধান অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ের অধীনে তদন্ত সাধারণত অপরাধের তথ্য পাওয়ার পর ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করার কথা বলা হয়েছে।

নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ করা সম্ভব না হলে তদন্ত কর্মকর্তাকে বিলম্বের কারণ লিখিতভাবে উল্লেখ করে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন করতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োজন বিবেচনায় সময় বাড়াতে পারেন।

তবে এই ৬০ কার্যদিবসকে সব জিডি নিষ্পত্তির সময়সীমা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিধানটি সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার তদন্তের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তাই কোনো জিডি করলেই ৬০ দিনের মধ্যে সেটির নিষ্পত্তি বাধ্যতামূলক এমন ধারণা সঠিক নয়।

পুলিশের জবাবদিহি ও পুরস্কারের মাপকাঠি কী?

পুলিশ সদস্যদের ভালো কাজের জন্য পুরস্কার ও স্বীকৃতির ব্যবস্থা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে অপরাধ দমন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় অবদানের জন্য পুলিশ সদস্যদের পুরস্কৃতও করা হয়েছে। তবে অপরাধ ঘটার আগেই তা প্রতিরোধের সাফল্য কীভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।

একই সঙ্গে পুলিশের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অনৈতিক আচরণের অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করাও জরুরি। কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ মানেই পুরো বাহিনী দায়ী নয়। কিন্তু অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জবাবদিহি নিশ্চিত না করাও আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।

আধুনিক পুলিশিং শুধু প্রযুক্তি, টহল কিংবা গোয়েন্দা তথ্যের ব্যবহার নয়। এর সঙ্গে জড়িত মানুষের অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া, প্রভাবমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন, দ্রুত সাড়া, স্বচ্ছ তদন্ত এবং জবাবদিহি।

শেষ পর্যন্ত পুলিশের সাফল্য শুধু কতজন অপরাধী গ্রেপ্তার হলো, সেই পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। কতটি সম্ভাব্য অপরাধ আগেই ঠেকানো গেল, বিপদে থাকা কতজন মানুষ সময়মতো সহায়তা পেলেন এবং অভিযোগকারীরা কতটা ন্যায়বিচার পেলেন এসবও হতে হবে কার্যকর পুলিশিংয়ের মাপকাঠি।

কারণ, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপরাধের পর ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, অপরাধ ঘটার আগেই তা ঠেকানোও তেমনই জরুরি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

‘বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা’

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর ‘বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা’

ট্রাইব্যুনালের বিচারকের বাসার সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, গ্রেপ্তার ৪

ট্রাইব্যুনালের বিচারকের বাসার সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, গ্রেপ্তার ৪

‘তদন্তাধীন’ বলেই কি দায় শেষ? আধুনিক পুলিশিংয়ের বিপরীতে বাংলাদেশের বাস্তবতা

‘তদন্তাধীন’ বলেই কি দায় শেষ? আধুনিক পুলিশিংয়ের বিপরীতে বাংলাদেশের বাস্তবতা

সাজেকে ১৩ ঘণ্টার জন্য অবরোধ শিথিল

সাজেকে ১৩ ঘণ্টার জন্য অবরোধ শিথিল

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App