ডুব দিয়ে পানি খাওয়ার পর যমুনাকে ‘দূষণমুক্ত’ বললেন বিজেপি নেতা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যমুনা নদীর দূষণ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে নদীতে ডুব দিয়ে পানি পরিষ্কার বলে দাবি করেছেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য মনোজ তিওয়ারি। শুধু নদীতে ডুব দেওয়াই নয়, পানি হাতে তুলে পানও করেছেন উত্তর-পূর্ব দিল্লির এই সংসদ সদস্য। তাঁর দাবি, গত দেড় বছরে বিজেপি সরকারের উদ্যোগে যমুনা নদীর দূষণ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
তবে পরিবেশগত তথ্য বলছে, দিল্লির বিভিন্ন অংশে যমুনার পানির দূষণের মাত্রা এক রকম নয়। নদীর কয়েকটি স্থানে দূষণের মাত্রা এখনো নির্ধারিত গ্রহণযোগ্য সীমার অনেক ওপরে রয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার দিল্লির সোনিয়া বিহার ঘাটে যমুনা নদীতে ডুব দেন মনোজ তিওয়ারি। এ সময় তিনি নদীর পানির মানের উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করেন।
মনোজ তিওয়ারির ভাষ্য, নদীতে পরিযায়ী পাখির উপস্থিতি প্রমাণ করে যে পানির মান আগের তুলনায় ভালো হয়েছে। তাঁর দাবি, নদীতে কুমিরও থাকতে পারে, আর কুমির শুধু পরিষ্কার পানিতেই থাকে।
যমুনা পরিষ্কারে বিজেপি সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি আম আদমি পার্টির (এএপি) বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, নদীর পানির মানের উন্নতি হওয়ায় এখন ছটপূজার মতো ধর্মীয় উৎসবেও এই পানি ব্যবহার করা সম্ভব।
কেজরিওয়ালকে ডুব দেওয়ার চ্যালেঞ্জ বিজেপির
যমুনা নদী পরিষ্কারের কৃতিত্ব নিয়ে বিজেপি ও এএপির মধ্যে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। বিজেপির দিল্লি শাখা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছে, তাদের সরকার দুই বছরে যমুনা পরিষ্কারে যে কাজ করেছে, কংগ্রেস ও এএপি ২৭ বছরেও তা করতে পারেনি।
একই সঙ্গে দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও এএপি নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে যমুনা নদীতে ডুব দেওয়ার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে দলটি।
এর জবাবে এএপির দিল্লি সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী সৌরভ ভরদ্বাজ বলেন, যমুনার পাল্লা থেকে ওয়াজিরাবাদ পর্যন্ত প্রায় ২৬ কিলোমিটার অংশ সব সময়ই তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার ছিল। দিল্লি দূষণ নিয়ন্ত্রণ কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এএপি সরকারের আমলে ওই অংশের পানির মান আরও ভালো ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
ভরদ্বাজ পাল্টা চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মনোজ তিওয়ারি ও দিল্লির পানিসম্পদমন্ত্রী প্রবেশ ভার্মাকে কালিন্দী কুঞ্জ ঘাটের পানি পান করার আমন্ত্রণ জানান।
যমুনার পানি কতটা পরিষ্কার, কী বলছে তথ্য?
রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যেই যমুনা নদীর প্রকৃত দূষণ পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এনডিটিভির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় নদীর পানির দূষণের মাত্রায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ফলে একটি নির্দিষ্ট স্থানের পানির অবস্থা দেখে পুরো নদীকে পরিষ্কার বলে দাবি করার সুযোগ নেই।
আরও পড়ুন: ‘শর্ত না মানলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা নয়’
নদীর পানিতে জৈব দূষণের মাত্রা পরিমাপের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো জৈব রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা বা বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (বিওডি)। পানিতে থাকা জৈব বর্জ্য ভাঙতে অণুজীবের যে পরিমাণ অক্সিজেন প্রয়োজন হয়, তার ভিত্তিতে এ সূচক নির্ধারণ করা হয়। সাধারণত বিওডির মাত্রা যত বেশি হয়, পানিতে জৈব দূষণের পরিমাণও তত বেশি থাকে।
গোসলের উপযোগী পানির ক্ষেত্রে বিওডির গ্রহণযোগ্য মাত্রা প্রতি লিটারে ৩ মিলিগ্রাম বা তার কম। কিন্তু দিল্লির কয়েকটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে এই মাত্রা নির্ধারিত সীমার অনেক ওপরে পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, দিল্লিতে প্রবেশের স্থানে পাল্লায় যমুনার পানিতে বিওডির মাত্রা প্রতি লিটারে ২ মিলিগ্রাম, যা গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে রয়েছে।
অর্থাৎ, নদীর কোনো একটি অংশে পানির মান ভালো থাকলেও অন্য অংশগুলো সমানভাবে দূষণমুক্ত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে, যমুনা নদী পরিষ্কারের কৃতিত্ব নিয়ে বিজেপি ও এএপির রাজনৈতিক বিতর্ক চললেও নদীর প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও বিভিন্ন পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের পরিমাপই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী পানির গুণগত মান যাচাই না করে শুধু ডুব দেওয়া, পানি পান করা কিংবা পাখি ও কুমিরের উপস্থিতিকে পরিচ্ছন্নতার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
