মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা
জো বাইডেনের কূটনীতির ব্যর্থতা নাকি প্রতারণা?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ইসরায়েলে গত মঙ্গলবার ১৮০টি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালানোর পর ইরানের প্রচেষ্টাকে ‘অকার্যকর’ বলে আখ্যা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া দেশটিই ইরানকে কঠোর পরিণতির জন্য হুঁশিয়ারি দিয়েছে। কিন্তু ইসরায়েলকে গত এক বছর ধরে গাজা ও লেবাননে অভিযান পরিচালনায় অব্যাহত সহায়তা দিয়ে ইরানকে উল্টো কেবল উসকানি দিয়ে গেছে হোয়াইট হাউস। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা প্রতিনিয়তই বাড়ছে।
মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গেøাবাল অ্যাফেয়ার্সের ফেলো ওমর রহমান বলছেন, এই প্ররোচণার ফলে পুরো অঞ্চলব্যাপী বিধ্বংসী যুদ্ধ শুরু হতে পারে। মিডল ইস্ট আই এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজা ও লেবানন ইস্যুতে বিগত বছরে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে নানা বৈপরীত্য দেখা গেছে। একদিকে, গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি কূটনৈতিকভাবে পূর্ণ সমর্থন বজায় রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি চূড়ান্ত করতেও একের পর এক বৈঠকের আয়োজন করে গেছে। লেবাননেও এই দ্বিমুখী মার্কিন নীতি দেখা গেছে। তারা ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীকে এখানেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। আবার একই সঙ্গে শান্তি চুক্তির কথাও হোয়াইট হাউস বারবার বলেছে।
ইউএস পলিসি ফেলো তারিক কেন্নেই শাওয়া বলেন, শেষ ১২ মাসে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে দুইভাবে দেখা যায়। হয় এটি ছিল চরম ব্যর্থতা অথবা ‘প্রতারণাপূর্ণ’ সাফল্য। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ কিন্তু অনেকটাই কাছাকাছি। মার্কিন প্রশাসন আসলে মানবাধিকার, যুদ্ধবিরতি এসব বাগাড়ম্বর দিয়ে সবার নজর ঘুরিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল। আর এই সময়ে ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালিয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় মার্কিন প্রশাসনের আন্তরিকতা আরো প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে ইসরায়েলের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যর্থতার কারণে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিরসনে যথেষ্ট শক্তি প্রদর্শন করেনি যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিল প্রেসিডেন্ট জামাল আবদি বলেন, ‘আমি মনে করি, শান্তি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে এলে ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আলোচনায় বসাতে পারলে, সেটা হতো মার্কিন সক্ষমতার প্রমাণ।
কিন্তু এক পক্ষকে নিঃশর্তভাবে সহায়তা করতে থাকা ও সেটা থেকে সংকট দূর হবে আশা করলে তাকে কোনোভাবেই সক্ষমতা বলা যায় না।’
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স এক যৌথ বিবৃতিতে লেবাননে ২১ দিনের যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছিল। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সেটা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন। গত এক বছর ধরে গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য বাইডেনের একাধিক প্রস্তাবও বিভিন্নভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি। তবে বাইডেন প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে, সেটাও অনেকে মানতে নারাজ। কেননা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট চেষ্টা পর্যন্ত করেছিল কি না- সেটা নিয়েই অনেকে সন্দিহান।
কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্র্যাফটের ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন, ‘এটা ব্যর্থতাও না। পুরো বিষয়টাই ছিল প্রতারণাপূর্ণ। তারা উত্তেজনা প্রশমন, যুদ্ধবিরতি এসবের কথা বললেও নেতানিয়াহু যখন একের পর এক আলোচনা নস্যাৎ করে দিচ্ছিল, তখন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।’
এদিকে ৩০ সেপ্টেম্বর সাবেক এক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার বরাতে সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করা গেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বাইডেন প্রশাসনের দূত অ্যামোস হোচেস্টেইন, হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালাতে ইসরায়েলকে সবুজ সংকেত দিয়েছিলেন। তিনি ইসরায়েল ত্যাগ করার ২৪ ঘণ্টা পরেই দেশব্যাপী পেজার বিস্ফোরণের ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল।
ইরানের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ পুষে রাখা ব্যক্তিরাও মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দুর্বল মনে করছেন। সাবেক সেনা কর্মকর্তা কার্ক লিপোল্ড বলেন, ইরানকে অন্তত দায়ী করার আগ পর্যন্ত কোনো কিছুই পাল্টাবে না। শাস্তিস্বরূপ ইরানকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত করে ফেলার পাশাপাশি সমুদ্রপথে বিধিনিষেধের বেড়াজালে আটকে ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন লিপোল্ড। এতেও কাজ না হলে, শেষ পদক্ষেপ হতে পারে সামরিক শক্তি প্রয়োগ।
রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচারণা শিবিরের সাবেক উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট কর্নেল অ্যান্থনি শেফার বলেন, বেশি আগ্রাসী না হয়ে ইরানকে চাপে ফেলার চেষ্টা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাইডেন প্রশাসন স্পষ্ট কোনো অবস্থান নিচ্ছে না। বর্তমান বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে তারাই দায়ী।
গত মঙ্গলবার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর এক জনসভায় প্রায় একই সুরে কথা বলেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘অযোগ্য দুজন ব্যক্তি দেশ পরিচালনা করছে। অবশ্য তারা পরিচালনা করছে বলে আমার মনে হয় না। আমাদের তারা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে।’ ট্রাম্প বরাবরই ইরানের বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার পক্ষপাতী।
এদিকে গত বুধবার বাইডেন বলেছেন, তিনি কোনোভাবেই ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় সম্ভাব্য ইসরায়েলি হামলা সমর্থন করবেন না। তিনি ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারে সবসময় সোচ্চার হলেও, সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। ইহুদি রাষ্ট্রটির বিরুদ্ধে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটির ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য একটি বিস্তৃত আন্তর্জাতিক ঐকমত্য গড়ে তোলার পক্ষে তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য নির্ধারিত বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠার আগে গত বুধবার সাংবাদিকদের বাইডেন বলেন, ‘ইসরায়েলিরা কী করতে যাচ্ছে তা নিয়ে আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনা করব, তবে আমাদের সাতজনের (জি৭ দেশগুলোর প্রধানরা) সবাই একমত যে তাদের প্রতিক্রিয়া জানানোর অধিকার আছে, কিন্তু তাদের সমানুপাতিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো উচিত। বাইডেন জোর দিয়ে বলেন, ইরান বড় ভুল করেছে। ইরানের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোয় ইসরায়েলের হামলায় সমর্থন দেবেন কি না- এমন প্রশ্নে বাইডেন বলেন, ‘না।’
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে পারসি বলেছেন, ‘সর্বাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধ হলে তার জন্য দায়ী থাকবে বাইডেন প্রশাসন। কারণ, বাস্তবতা হলো ইসরায়েলের পক্ষে গাজায় গণহত্যা বা আঞ্চলিক আগ্রাসন চালিয়ে যাওয়া মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা ছাড়া সম্ভব নয়।’
বৈরুতের কেন্দ্রস্থলে ইসরায়েলের হামলায় নিহত ৯ :
লেবাননের রাজধানী বৈরুতের কেন্দ্রস্থলে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর রাতে ইসরায়েলে হামলায় অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। লেবাননে স্থল অভিযানরত ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের সমর্থনপুষ্ট হিজবুল্লাহর সঙ্গে লড়াইয়ে এক বছরের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিন দেখার পরদিন এ হামলা চালাল দেশটি। ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা লেবাননের রাজধানীতে একটি সুনির্দিষ্ট বিমান হামলা চালিয়েছে।
রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকরা ব্যাপক একটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন। বৈরুতের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, পার্লামেন্টের কাছে বাশুরা এলাকার একটি ভবনকে লক্ষ্যস্থল করা হয়। এই ভবনটি হিজবুল্লাহর ইসলামিক স্বাস্থ্য সংস্থার মালিকানাধীন।
সিএনএন জানিয়েছে, ২০০৬ সালের পর থেকে বৈরুতের কেন্দ্রস্থলে এটিই ইসরায়েলের প্রথম হামলা। লেবাননের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ হামলায় অন্তত ৯ জন নিহত ও ১৪ জন আহত হয়েছেন। লেবাননের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবন ও এর প্রথম তলায় আগুন জ¦লতে দেখা গেছে। রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে ছবিটির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
লেবাননে জাতিসংঘের বিশেষ সমন্বয়ক জেনিন হেনিস-প্লাশকার্ট গতকাল বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, ‘বৈরুতে আরেকটি নির্ঘুম রাত। শহরকে কাঁপিয়ে দেয়া বিস্ফোরণগুলো গুনছি। কোনো সতর্কতামূলক সাইরেন নেই। এরপর কী হবে জানি না। সামনে শুধু অনিশ্চয়তা। সর্বব্যাপী ভয় আর উদ্বেগ।’
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দক্ষিণ লেবাননের যেসব গ্রামের বাসিন্দারা তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন তাদের পরবর্তী ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত ফিরতে নিষেধ করেছে। আইডিএফের মুখপাত্র অভিচয় আদ্রে গতকাল বৃহস্পতিবার সামাজিকমাধ্যম এক্স-এ ওই এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক করে বলেছেন, ‘ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান অব্যাহত আছে।’ গত বুধবার দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের চোরাগোপ্তা হামলায় তাদের আট সেনা নিহত হয়েছে বলে ইসরায়েল জানিয়েছে। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, মূলত সীমান্ত এলাকায় হিজবুল্লাহর টানেল ও অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংসের জন্য তারা লেবাননে অনুপ্রবেশ করেছে, বৈরুত বা উত্তর বা দক্ষিণের কোনো গুরুত্বপূর্ণ শহরে বড় ধরনের অভিযান চালানো কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
‘ইসরায়েলি হামলায় গাজায় হামাস সরকারের প্রধান নিহত’ : ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি হামলায় এ উপত্যকার শাসক গোষ্ঠী হামাস সরকারের প্রধান রাভি মুশতাহা নিহত হয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তিন মাস আগে চালানো ওই হামলায় রাভি মুশতাহাসহ হামাসের আরো দুজন জ্যেষ্ঠ নেতা নিহত হন।
নিহত অপর দুজন হলেন সামেহ আল-সিরাজ ও সামি উদেহ। তাদের মধ্যে সামেহ আল-সিরাজ হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর নিরাপত্তা দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন। আর সামি উদেহ হামাসের একজন কমান্ডার ছিলেন। ইসরায়েলি বাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মুশতাহা হামাসের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ নেতাদের একজন ছিলেন। হামাসের যোদ্ধাদের কোথায় কীভাবে মোতায়েন করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রণয়নে সরাসরি প্রভাব রাখতেন তিনি।’
