শোকের প্রতীক পবিত্র আশুরা আজ
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কাগজ প্রতিবেদক
পবিত্র আশুরা আজ শুক্রবার। আশুরা শব্দের অর্থ দশম। সৃষ্টির শুরু থেকে নানা ঘটনার কারণে হিজরি মহররম মাসের ১০ম দিনটি তাৎপর্যপূর্ণ। সর্বশেষ ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্মম শাহাদত বরণকে স্মরণ করে প্রতি বছর মুসলিম বিশ্বে এই দিনটি ত্যাগ ও শোকের প্রতীক হিসেবে পালিত হয়। এ দিনটিতে বিশ্বের
মুসলমানদের মতো বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরাও যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও মর্যাদার মধ্য দিয়ে রোজা, বিশেষ ইবাদত ও বিভিন্ন নেক আমলের মাধ্যমে অতিবাহিত করবেন। শিয়া সম্প্রদায় তাজিয়া মিছিল বের করবেন। দিনটি উপলক্ষ্যে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজন করেছে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল। আজ সরকারি ছুটির দিন। দিনটি উপলক্ষ্যে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ইতোমধ্যে রাজধানীর শিয়া সম্প্রদায় তাজিয়া মিছিলের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। অন্যদিকে, পবিত্র আশুরাকে ঘিরে নিñিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ।
ইতিহাস অনুযায়ী, ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে ইরাকের কারবালার প্রান্তরে ফোরাত নদীর তীরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শাহাদতবরণ করেন হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তার পরিবারের সদস্যরা। এর মধ্য দিয়ে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে এক অনন্য ও মহান আদর্শ স্থাপন করে গেছেন তারা। হযরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর অনুসারীদের মতে, কারবালার এই ঘটনা মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার চিরন্তন প্রেরণা জোগায়।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী
রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, পবিত্র আশুরার শাশ্বত বাণী মানুষকে অন্যায়-অবিচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে শেখায় এবং সত্য, সুন্দর ও আলোর পথ দেখায়। সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য পবিত্র আশুরা একটি তাৎপর্যময় ও শোকের দিন। ইসলামের ইতিহাসে আশুরা বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মারক হলেও কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসাইন (রা.) ও তার সঙ্গীদের আত্মত্যাগ এ দিনটিকে দিয়েছে অনন্য মর্যাদা ও গভীর মানবিক আবেদন। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামের সুমহান আদর্শ সমুন্নত রাখতে তাদের আত্মদান মানবজাতির ইতিহাসে চিরজাগরুক হয়ে থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, পবিত্র আশুরা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ইসলামের মূল শিক্ষা শান্তি, ন্যায়, সহমর্মিতা ও মানবকল্যাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইসলামে বিভেদ, হানাহানি, বিদ্বেষ কিংবা সামাজিক বৈরিতার কোনো স্থান নেই। তাই আশুরার মহান শিক্ষা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আসুন আমরা সমাজে সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ আরো সুদৃঢ় করি। একটি ন্যায়ভিত্তিক, শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণমুখী সমাজ গঠনে নিজেদের আরো নিবেদিত করি। পবিত্র আশুরা- ইসলামের ইতিহাসে এটি এক অনন্য তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এটি শুধু শোক ও স্মরণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সত্য, ন্যায়, ধৈর্য, ত্যাগ ও নৈতিক দৃঢ়তার চিরন্তন শিক্ষা ধারণ করে। কারবালার ঘটনা মানব ইতিহাসের এমন এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়, যা যুগে যুগে মানুষকে সত্যের পক্ষে এবং অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে অনুপ্রাণিত করে আসছে। মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং আদর্শের প্রতি অবিচল থাকার যে শিক্ষা কারবালা আমাদের দিয়েছে, তা আজো সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরণার উৎস।
তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি সম্পন্ন
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশেও প্রতি বছরের মতো এবারো যথাযথ মর্যাদায় দিনটি পালন করা হবে। শুক্রবার সকাল থেকেই শুরু হবে মূল তাজিয়া মিছিল। তবে তার আগেই পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী হোসাইনী দালান ইমামবাড়ায় আসতে শুরু করেছেন শিয়া সম্প্রদায়ের অনুসারী ও দর্শনার্থীরা। সেখানে নামাজ, জিয়ারত ও ইবাদত-বন্দেগিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।
হোসাইনী দালান ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ ফিরোজ হোসেন সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়ে জানান, সত্যের পথে অবিচল থাকার শিক্ষা দেয় কারবালা। এ বছর সব ধরনের প্রস্তুতি সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বড় ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, নিñিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে অত্যন্ত ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে সব কর্মসূচি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
পবিত্র আশুরা উপলক্ষে ঢাকায় শিয়া সম্প্রদায়ের তাজিয়া মিছিলসহ অন্যান্য কর্মসূচির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে থাকবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু জরুরি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। তিনি জানান, মিছিলে কোনো প্রকার ধারালো অস্ত্র, ধাতব বস্তু, তরবারি, দাহ্য পদার্থ, ছুরি, চাকু, লাঠি, বল্লম কিংবা ব্যাগ ও সুটকেস নিয়ে অংশ নেয়া যাবে না।
ডিএমপি কমিশনার আরো বলেন, আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছি। যেকোনো ধরনের নাশকতা বা অপ্রীতিকর পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেয়ার জন্য আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। এ ছাড়া মিছিলে ব্যবহৃত নিশানের উচ্চতা কোনোভাবেই ১২ ফুটের বেশি হওয়া যাবে না।
আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা গেছে, এবার পুরান ঢাকাসহ রাজধানীর বিভিন্ন ইমামবাড়া থেকে মোট ৬৩টি তাজিয়া মিছিল বিভিন্ন সময়ে বের হবে। মূল মিছিলটি সকাল ১০টায় শুরু হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে গিয়ে শেষ হবে।
