জুনে ডেঙ্গু রোগী ৩ গুণ, মৃত্যু ৭ গুণ বেড়েছে
ডেঙ্গু ও হামের সংক্রমণ ফের উর্ধ্বমুখী প্রবণতায়
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ডেঙ্গু ও হামে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যার গ্রাফটা কয়েকদিন আগেও কিছুটা নিম্নমুখী ছিল। কিন্তু চলতি সপ্তাহ থেকেই তা উর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে। রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা এমন কী গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু। চলতি বছরে হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর প্রায় ৭৮ শতাংশই ঢাকার বাইরের বাসিন্দা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছর মে মাসের তুলনায় জুনে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৩ গুণের বেশি বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে মৃত্যুর সংখ্যাও। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, এক মাসের ব্যবধানে ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়েছে ৭ গুণ। যা নিয়ে বড় ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে হামে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যাও গত কয়েকদিনে বেড়েছে। সরকারি হিসাবেই মৃতের সংখ্যা পৌঁছে গেছে প্রায় ৭’শ। এছাড়া আক্রান্তের সংখ্যা ৯৬ হাজার ছাড়িয়েছে। বেসরকারি হিসাবে সংখ্যাটি আরো বেশি।
বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগে রোগীর সংখ্যা বেশি
বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৪৮৯ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন বরিশাল বিভাগে। গত বছর বরগুনা অপ্রত্যাশিতভাবে ডেঙ্গুর হটস্পট হয়ে উঠলেও এবার পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ঝালকাঠিতে রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগেও রোগীর সংখ্যা বেশি। গতকাল পর্যন্ত এই বিভাগে ডেঙ্গু রোগী ছিল ১ হাজার ৩৪ জন। রোগীর সংখ্যা বেশি হলেও এই দুই বিভাগে ১ জন করে মোট ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
জুনে রোগী ও মৃত্যু বেড়েছে
চলতি বছরের মধ্যে জুন মাসেই সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত এ মাসে ২ হাজার ৩১৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন। মে মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭১৪ জন। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে রোগীর সংখ্যা ৩ গুণের বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে, ডেঙ্গুতে মৃত্যুও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এ বছর এখন পর্যন্ত মোট ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জুন মাসেই মারা গেছেন ৮ জন। মে মাসে ১ জন, মার্চ-এপ্রিলে ডেঙ্গুতে কারোর মৃত্যু হয়নি। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ২ জন করে ডেঙ্গুতে মারা গেছে।
হামে আরো ৯ শিশুর আর ডেঙ্গুতে ১ জনের মৃত্যু
দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গে আরো ৯ শিশুর আর ওই একই সময়ে ডেঙ্গুতে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার হামের সার্বিক পরিস্থিতি এবং ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের পাঠানো আলাদা বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
হামের সার্বিক বিষয় নিয়ে পাঠানো বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের কেউই নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়নি। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ৯৪৫ জন শিশু। ৫২ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে, আর হামের উপসর্গজনিত রোগীর সংখ্যা ৮৯৩। এই সময়ে ৮৬০ জন শিশু নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, আর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ৯০৬ জন শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে মোট ৬০৫ শিশুর। আর হামে আক্রান্ত হয়ে ৯৩ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। অর্থাৎ হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এই সময়ে মোট ৬৯৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা ৯৬ হাজার ৬৫৩, আর নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১১ হাজার ৪৪২। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মোট ৮০ হাজার ৪৯৭ রোগী, যাদের মধ্যে ৭৬ হাজার ৭৮৮ জন ছাড়পত্র পেয়ে ইতোমধ্যে বাড়ি ফিরেছে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ডেঙ্গুতে আরো ১ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এই সময়ে নতুন শনাক্ত ১৯৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটির হাসপাতালে ২৮ জন ও দক্ষিণ সিটির হাসপাতালে ৩১ জন ভর্তি হয়েছেন। এ দুই সিটির বাইরে ঢাকা বিভাগে ২৬ জন, বরিশাল বিভাগে ৪৯ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৫ জন, খুলনা বিভাগে ৩১ জন, ময়মনসিংহে ১৩, রাজশাহী বিভাগের হাসপাতালে ৫ জন ভর্তি হয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে ১৪৮ জন হাসপাতাল ছেড়েছেন।
চলতি বছর পহেলা জানুয়ারি থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে; হাসপাতালে ভর্তি রোগী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫১৫ জনে।
শ্রীলঙ্কায় বাড়ছে ডেঙ্গু; ভয়ের কারণ নেই
এদিকে শ্রীলঙ্কায়ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। দেশটিতে প্রতিদিন হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশটিতে ডেঙ্গুর বিস্তার মোকাবিলায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে বলে গত মঙ্গলবার শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকের কার্যালয় জানিয়েছে। এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত ও ধ্বংস করতে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা একটি বিশেষ টাস্কফোর্সে যোগ দেবেন। এছাড়া যারা এই মশার প্রজননের কারণ হবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তবে শ্রীলঙ্কার এই পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের খুব বেশি আতঙ্কিত হবার কোন কারণ নেই বলে জানিয়েছেন প্রখ্যাত কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের এই অধ্যাপক ভোরের কাগজকে বলেন, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ খুব বেশি নয়। তাই এনিয়ে আমাদের আতঙ্কিত হবার কোনো কারণ নেই। তবে আমাদের দেশের অভ্যন্তরে যে পরিস্থিতি তা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ আছে। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন জরিপ, তথ্য উপাত্ত ডেঙ্গুর ব্যাপকতা বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকারের উদ্যোগ আছে। তবে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হবারও প্রয়োজন আছে বলে জানান তিনি।
