বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা চালু
ঢাকায় মিশন শুরু দীনেশ ত্রিবেদীর
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকায় নব নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব শুরু করলেন দীনেশ ত্রিবেদী। দুই বছর ধরে ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় টানাপোড়েনের সম্পর্ক মেরামতের নতুন সন্ধিক্ষণে তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন। বাংলাদেশে মিশনের শুরুর দিনেই বাংলাদেশিদের জন্য প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকা পর্যটন ভিসা আবার চালুর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। প্রাথমিকভাবে দেশের ৫টি ভিসা আবেদন কেন্দ্র (আইভ্যাক) থেকে এই সেবা দেয়া হবে। আগামী ২৮ জুন থেকেই এই ট্যুরিস্ট ভিসার আবেদন নেয়া হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের হাতে পরিচয়পত্র পেশ করেন ঝানু রাজনীতিবিদ দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি বঙ্গভবনে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় পরিচয়পত্র পেশ করেন। বঙ্গভবনে পৌঁছলে রেওয়াজ অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের একটি দল তাকে গার্ড অব অনার দেয়।
এদিকে আনুষ্ঠানিক বিভিন্ন আয়োজনে হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সমান মর্যাদা দিয়েছে দেশটি। নতুন দায়িত্ব গ্রহণের জন্য গত ১২ জুন তিনি বাংলাদেশে পৌঁছেন।
ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা চালুর ঘোষণা : রাষ্ট্রপতির হাতে পরিচয়পত্র পেশের মধ্য দিয়ে ঢাকা মিশনের দায়িত্ব শুরুর পরপরই রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে পরিদর্শনে যান দীনেশ ত্রিবেদী। সেখানে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশিদের জন্য আবার ট্যুরিস্ট (পর্যটন বা ভ্রমণ) ভিসা চালুর ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, আমরা ট্যুরিস্ট ভিসার জন্য স্বাভাবিক ভিসা আবেদন কার্যক্রম পুনরায় শুরু করছি, যা আগামী ২৮ জুন, রবিবার থেকে জমা দেয়া যাবে। মানবিক বিবেচনায় জরুরি ক্ষেত্রে মেডিকেল ভিসার সুবিধা আমরা অব্যাহত রাখব।
তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনায় ভারতীয় ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টারের মাধ্যমে ভিসার আবেদন জমা দেয়া যাবে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শহরে ভারতীয় ভিসা সেন্টারগুলোতেও এ কার্যক্রম চালু হবে। আমরা আশা করি, এর ফলে আমাদের দুই সার্বভৌম দেশের জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হবে।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগর সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক তলানীতে ঠেকে। বারিধারায় ভারতীয় দূতাবাস ঘেরাসহ কয়েকটি উপ দূতাবাসে হামলা ও ভাংচুর করা হয়। অনিরাপত্তা ও বৈরী সম্পর্কের কারণে ভারতের পর্যটন ভিসা বন্ধ করে দেয় দেশটি। শুধু মেডিকেল ভিসা চালু ছিল, তাও সীমিত। প্রায় দুই বছর পর এই পর্যটন ভিসা চালু হতে যাচ্ছে।
ভ্রাতৃপ্রতিম দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টার অংশ হিসেবে এই ভিসা চালু করা হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মন্ত্রীর মর্যাদা : এদিকে পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুরের সাবেক এমপি ও বিজেপি নেতা ত্রিবেদী দুইবার ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেছেন। সাবেক এমপি ও বিজেপি নেতা ত্রিবেদীকে মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে বুধবার অফিস আদেশ জারি করেছে ভারত সরকার। এই মর্যাদা শুধু আনুষ্ঠানিক বা প্রটোকল-সংশ্লিষ্ট আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
বৃত্তান্ত : সরকারি চাকরিতে কোটাবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা ঘোচানোর জন্য পোড় খাওয়া রাজনীতিক দীনেশ ত্রিবেদীকে রাষ্ট্রদূত করে বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসের সেরা কর্মকর্তাদের ঢাকা মিশনে পদায়নের যে ধারা, সেখান থেকে সরে এসে সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের প্রভাবশালী এই রাজনীতিককে পাঠানো কূটনীতির সুর ও পদ্ধতির ক্ষেত্রে নতুন বিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়।
দীনেশ ত্রিবেদী বাংলা বলতে পারেন এবং দুই বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কেও ভালো ধারণা রাখেন। সেতারবাদক হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে।
গুজরাটি দম্পতি হীরালাল ত্রিবেদী এবং উর্মিলাবেন ত্রিবেদীর ছোট ছেলে দীনেশ ত্রিবেদী হিমাচল প্রদেশের বোর্ডিং স্কুল থেকে পড়াশোনার পর কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে কমার্সে স্নাতক ডিগ্রি পান। তারপর টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ করেন।
প্রবীণ এই রাজনীতিক দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। আশির দশকে ছিলেন কংগ্রেস নেতা। পরে ১৯৯০ সালে জনতা দলে চলে যান।
১৯৯০-৯৬ পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভায় জনতা দলের সদস্য ছিলেন। ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করলে সেই দলে যোগ দেন দীনেশ ত্রিবেদী। তিনিই দলটির প্রথম সাধারণ সম্পাদক।
২০০২-০৮ পর্যন্ত রাজ্যসভায় তৃণমূলের এমপি ছিলেন দীনেশ। ২০০৯ সালে ব্যারাকপুর থেকে তৃণমূলের হয়ে লোকসভা ভোটে প্রার্থী হন। ওই আসনে জিতে কেন্দ্রের মনমোহন সিংহ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী হন। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে সেই দায়িত্ব সামলান দীনেশ। পরে তাকে সেই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়।
২০১৯ সালের নির্বাচনে ব্যারাকপুর থেকে আবারো তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছিলেন দীনেশ, কিন্তু সেবার বিজেপির অর্জুন সিংয়ের কাছে হেরে যান। তারপর তৃণমূল তাকে আবার রাজ্যসভায় পাঠায়।
কিছুদিন পর তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় দীনেশের। এর ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি তৃণমূল থেকে পদত্যাগ করেন এবং ৬ মার্চ বিজেপিতে যোগ দেন।
