চেনা রূপে ফিরছে ব্রাজিল
মুহাম্মদ রুহুল আমিন
প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বকাপের শুরুটা ব্রাজিলের জন্য ছিল কিছুটা অস্বস্তিকর। ১৩ জুন বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় নিজেদের প্রথম ম্যাচে মরক্কোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে কার্লো আনচেলত্তির দল। ম্যাচের ফলের চেয়ে বেশি হতাশ করেছিল খেলার ধরন। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের আক্রমণে ছিল না চেনা ধার, মাঝমাঠে ছিল সমন্বয়ের ঘাটতি, আর প্রতিপক্ষকে ভীত করার মতো সেই পরিচিত ব্রাজিলিয়ান ছন্দও দেখা যায়নি। স্বাভাবিকভাবেই সমালোচনা শুরু হয়েছিল। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন এই দল আদৌ শিরোপার দাবিদার কি না। মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে সেই আলোচনার চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে।
প্রথম ম্যাচের হতাশা কাটিয়ে ১৯ জুন হাইতিকে ৩-০ গোলে হারায় ব্রাজিল। এরপর বৃহস্পতিবার ভোরে স্কটল্যান্ডকেও একই ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব শেষ করেছে দুর্দান্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে। তিন ম্যাচে ২ জয় ও ১ ড্রয়ে ৭ পয়েন্ট নিয়ে গোল ব্যবধানে মরক্কোকে পেছনে ফেলে গ্রুপ ‘সি’র চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সেলেসাওরা। তবে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জয়টিকে শুধু আরেকটি তিন পয়েন্ট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এই ম্যাচে দেখা গেছে একটি দলের ক্রমবর্ধমান পরিণতি, আত্মবিশ্বাস এবং নিজেদের প্রকৃত শক্তি ফিরে পাওয়ার গল্প।
মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্রাজিলের হাতে। মাত্র ষষ্ঠ মিনিটে স্কটিশ রক্ষণভাগের ভুল কাজে লাগিয়ে দলকে এগিয়ে দেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। গোলটি যেমন তার ক্ষিপ্রতা ও উপস্থিত বুদ্ধির প্রমাণ, তেমনি পুরো ম্যাচজুড়ে তার পারফরম্যান্সও ছিল অসাধারণ। ২৪ মিনিটে আবারো বল জালে পাঠিয়েছিলেন ভিনিসিয়ুস। তবে ভিএআরের সহায়তায় গোল বাতিল করেন রেফারি। তবু থামেননি তিনি। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে ব্রুনো গিমারাইসের নিখুঁত ক্রসে হেড করে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা। সেই গোলেই কার্যত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ার্ধে ব্যবধান আরো বাড়ান মাতেউস কুনিয়া। ৬০ মিনিটে ব্রুনো গিমারাইসের চমৎকার পাস থেকে গোল করে চলতি বিশ্বকাপে নিজের তৃতীয় গোলের দেখা পান এই ফরোয়ার্ড। হাইতির বিপক্ষে জোড়া গোলের পর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষেও স্কোরশিটে নাম তুলে নিজের ধারাবাহিকতার প্রমাণ দেন তিনি। স্কোরলাইন ৩-০ হলেও ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত নাম সম্ভবত গোলদাতাদের কেউ নন। পুরো স্টেডিয়ামের চোখ ছিল একজন মানুষকে ঘিরে- নেইমার জুনিয়র।
২০২৩ সালের অক্টোবরে উরুগুয়ের বিপক্ষে হাঁটুর গুরুতর চোটে আক্রান্ত হওয়ার পর জাতীয় দলের বাইরে চলে যান ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। দীর্ঘ পুনর্বাসন, অস্ত্রোপচার ও অনিশ্চয়তার সময় পার করে অবশেষে স্কটল্যান্ড ম্যাচে ৭৬ মিনিটে কুনিয়ার বদলি হিসেবে মাঠে নামেন তিনি। দিনের হিসাবে ৯৮১ দিন পর আবারো ব্রাজিলের জার্সিতে দেখা যায় নেইমারকে।
গোল করতে পারেননি, কোনো অ্যাসিস্টও নেই। কিন্তু তাতে গুরুত্ব কমেনি একটুও। মাঠে নামার মুহূর্তে দর্শকদের করতালি, সতীর্থদের উচ্ছ¡াস এবং ম্যাচ-পরবর্তী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনিই। ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লæত নেইমার জানান, ড্রেসিংরুমে একা বসে কেঁদেছেন তিনি। দীর্ঘদিন পর প্রিয় জার্সিতে ফেরার অনুভূতি তাকে ভীষণ আবেগপ্রবণ করে তুলেছিল। তবে ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে বড় ইতিবাচক খবর শুধু নেইমারের ফেরা নয়, বরং পুরো দলের ক্রমোন্নত পারফরম্যান্স।
মরক্কোর বিপক্ষে ড্র করা দলটিই পরের দুই ম্যাচে ৬ গোল করেছে, হজম করেনি একটিও। আক্রমণে ভিনিসিয়ুস, কুনিয়া ও রায়ানের সমন্বয় যেমন চোখে পড়েছে, তেমনি মাঝমাঠে ব্রুনো গিমারাইস ও লুকাস পাকেতার নিয়ন্ত্রণও ছিল প্রশংসনীয়। রক্ষণভাগও আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত ও আত্মবিশ্বাসী মনে হয়েছে। স্কটল্যান্ড কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও গোলরক্ষক আলিসনের দৃঢ়তায় ক্লিন শিট ধরে রাখতে সক্ষম হয় ব্রাজিল।
বিশেষভাবে আলোচনায় ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। মরক্কো, হাইতি ও স্কটল্যান্ড- গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই গোল করেছেন তিনি। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই গোল করা ব্রাজিলের ইতিহাসে মাত্র পঞ্চম ফুটবলার এখন তিনি। এর আগে এই তালিকায় ছিলেন জাইরজিনিয়ো, রোমারিও, রোনালদো নাজারিও এবং রিভালদোর মতো কিংবদন্তিরা। আরো মজার বিষয় হলো, ওই চারজনের প্রত্যেকের বিশ্বকাপেই শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিতেছিল ব্রাজিল। ইতিহাস কখনো ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এমন একটি পরিসংখ্যান স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে ব্রাজিল সমর্থকদের।
একইসঙ্গে প্রশংসা প্রাপ্য কুনিয়ারও। প্রথম ম্যাচে গোল না পেলেও পরের দুই ম্যাচে ৩ গোল করে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, ব্রাজিলের আক্রমণভাগ এখন আর কোনো একক তারকার ওপর নির্ভরশীল নয়। ভিনিসিয়ুসের গতি, কুনিয়ার ফিনিশিং, রায়ানের উদ্যম এবং গিমারাইসের সৃজনশীলতা মিলিয়ে আক্রমণে নতুন মাত্রা পেয়েছে সেলেসাওরা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিশ্বকাপ যত এগোচ্ছে ব্রাজিলও তত নিজেদের চেনা রূপে ফিরছে। প্রথম ম্যাচের পর যে দলকে নিয়ে সংশয় ছিল, মাত্র দুই ম্যাচ পর সেই দলই আবার শিরোপা আলোচনার কেন্দ্রে। আনচেলত্তির ডায়মন্ড ফরমেশন এখন কার্যকর, খেলোয়াড়দের বোঝাপড়াও ক্রমশ উন্নত হচ্ছে। আর এরসঙ্গে যোগ হয়েছে নেইমারের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব।
প্রথম ম্যাচের হতাশা এখন অতীত। তিন ম্যাচ শেষে ব্রাজিল শুধু নকআউটে ওঠেনি, নিজেদের অন্যতম শিরোপা দাবিদার হিসেবেও আবার প্রতিষ্ঠিত করেছে। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জয় তাই শুধু গ্রুপসেরা হওয়ার গল্প নয়- এটি ছিল একটি বার্তা। একটি বার্তা যে, ব্রাজিল ধীরে ধীরে নিজেদের আসল রূপে ফিরছে। একটি বার্তা যে, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এখনো তারা অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার। আর একটি বার্তা যে, ফুটবলপ্রেমীরা যে সৌন্দর্য, গতি, আত্মবিশ্বাস ও আনন্দের জন্য ব্রাজিলকে দেখতে চায়- সেই ব্রাজিলের দেখা মিলতে শুরু করেছে আবারো।
