উপসাগরীয় দেশগুলোই টার্গেট, ইরানকে হুমকি বলছে জিসিসি
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
হরমুজ প্রণালির কাছে বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলার পর যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগে ইরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানকে সতর্ক করে তিনি বলেছেন, ‘চুক্তিভঙ্গ অব্যাহত রাখলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে অভিযান সম্পূর্ণ করতে বাধ্য হবে এবং এমনটা হলে ইরানের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।’ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান উত্তেজনার জেরে এমন মন্তব্য করলেন তিনি।
এমন পরিস্থিতিতে পাল্টা জবাব দিতে উপসাগরীয় দেশগুলোকে ফের টার্গেট করেছে তেহরান। ইতোমধ্যে বাহরাইন ও কুয়েতের মার্কিন স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত হানার ঘটনা ঘটেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোকে কঠোরভাবে সতর্ক করে তেহরান জানিয়েছে, তাদের মাটি বা সামরিক সুবিধা যেন ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হামলায় ব্যবহার করা না হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে তেহরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা চললেও, আকস্মিক এই পাল্টাপাল্টি হামলায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধের বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই হামলার ঘটনাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ উল্লেখ করে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)।
এমন আবহে উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে বাইরের হস্তক্ষেপমুক্ত একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে ইরান। গতকাল রবিবার ইরাকের রাজধানী বাগদাদে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এ অঞ্চলের দেশগুলোরই হওয়া উচিত। বাইরের শক্তির সামরিক উপস্থিতি ও হস্তক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য সহায়ক নয়। তাই আমাদের এমন একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে এই অঞ্চলের সব দেশ থাকবে এবং অঞ্চলের বাইরের কোনো দেশের উপস্থিতি বা হস্তক্ষেপ থাকবে না।’
অপরদিকে ইসরায়েল ও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা লড়াই বন্ধের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে একটি রূপরেখা চুক্তি সই হয়। গত শুক্রবার যৌথভাবে এ চুক্তির ঘোষণা দেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ইসরায়েল ও লেবাননের রাষ্ট্রদূতরা। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার এবং লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদাহ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। তবে চুক্তির বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি ওই কর্মকর্তারা।
চুক্তির বিষয়ে নাদা হামাদাহ বলেন, ‘লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা পুনরুদ্ধার, স্থায়ীভাবে বৈরিতার অবসান, বাস্তুচ্যুত মানুষের নিজভূমিতে ফিরে যাওয়া এবং সব লেবাননির শান্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির সঙ্গে বেঁচে থাকার পথে এ রূপরেখা চুক্তি একটি প্রথম পদক্ষেপ।’ অন্যদিকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার বলেন, ‘এ চুক্তির চূড়ান্ত লক্ষ্য, দুই দেশের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।’
যদিও এই চুক্তিকে মেনে নিতে পারেনি হিজবুল্লাহ। চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে গত শনিবার এক বিবৃতিতে হিজবুল্লাহর প্রধান নাইম কাশেম বলেছেন, ‘লেবাননের পুরো ভূখণ্ডে প্রতিরোধ বাহিনীর (হিজবুল্লাহ) নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারকে যুক্ত করা অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি প্রস্তাব, যা সব বিপৎসীমা অতিক্রম করে। এমন পদক্ষেপ লেবাননকে শত্রু ইসরায়েলের হাতের পুতুলে পরিণত করবে। এ চুক্তি সম্পূর্ণ অবৈধ ও অকার্যকর এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতিগুলো অবশ্যই কার্যকর করতে হবে।’ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারকের আলোকে লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলের সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার করার আহ্বান জানান হিজবুল্লাহর প্রধান। তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর একটি প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
নাইম কাশেম এমন একসময় এমন মন্তব্য করলেন যখন এই রূপরেখা চুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক’ এবং দেশের জন্য সম্ভাব্য ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন লেবাননের আইনপ্রণেতারা। তবে হিজবুল্লাহ সমর্থকরা এটিকে ইসরায়েলের প্রতি একমুখী ছাড় হিসেবে নিন্দা করেছেন। চুক্তির বিরোধিতা করে বৈরুতে বিক্ষোভ করেছেন তারা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া ১৪ দফার সমঝোতা চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ করা। তবে ইসরায়েল এই চুক্তির সরাসরি অংশ না হওয়ায়, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও সম্প্রতি দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে ব্যাপক বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। পাল্টা হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহও। তাই হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধে গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল-লেবানন সরকারের মধ্যে ওই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এদিকে গত শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ইরানকে হুমকি দিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, ‘যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে ইরান। যুদ্ধবিরতি চুক্তি আবারো ভঙ্গ করায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের গুদাম এবং উপকূলীয় রাডার স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান। এমন সময় আসতে পারে, যখন আমরা আর সংযম দেখাতে পারব না। তখন আমরা যে সামরিক অভিযান সফলভাবে শুরু করেছি, তা শেষ করতে বাধ্য হব। যদি এমনটি হয়, তাহলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।’
অন্যদিকে আগামী ৩০ দিন হরমুজ প্রণালির সম্পূর্ণ তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন ইরাক সফররত ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আরাগচি বলেন, ‘৩০ দিন পর সব বাধা দূর হলে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের পূর্ণ সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা হবে। আমরা সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি। এই দায়িত্ব ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের। এ বিষয়ে অন্য কোনো পক্ষ বা রাষ্ট্রের (বহিরাগত) কোনো ভূমিকা নেই। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী বিষয়টি সম্পূর্ণ স্পষ্ট। কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা একতরফা পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলবে এবং প্রণালিটি পুরোপুরি পুনরায় চালু হতে আরো বিলম্ব ঘটাবে।’
আরাগচি আরো বলেন, ‘ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সম্পর্কেও আমি আমার ইরাকি সমকক্ষকেও অবহিত করেছি।’
পাল্টাপাল্টি এমন উত্তেজনার সূত্রপাত গত বৃহস্পতিবার। এদিন ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এভার লাভলি’-তে ড্রোন হামলা চালায় ইরান। এ হামলার প্রতিবাদে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর উপসাগরীয় দেশ বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন স্থাপনায় আঘাত হানে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। গত শনিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক টেলিগ্রাম বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়।
মূলত গত ১৭ জুনের সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি ৬০ দিনের জন্য টোল-মুক্ত রাখার কথা ছিল। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, চুক্তির শর্ত অমান্য করে ওমান উপকূলে বিকল্প নৌপথ ব্যবহারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে ইরান এবং প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের একক নিয়ন্ত্রণের অধিকার দাবি করেছে দেশটি।
এক বিবৃতিতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে ইরানি বাহিনীর আগ্রাসন যুদ্ধবিরতি চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একই সঙ্গে ইরানের এ ধরনের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে সমন্বয় ও সহায়তা অব্যাহত রাখবে তারা।
উল্লেখ্য, এই পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে আন্তর্জাতিক তেল বাজারে নেতিবাচক প্রভাব এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে গত ১৭ জুন ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তি এখন পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়ার মুখে রয়েছে।
