হামে প্রাণ গেল আরো চার শিশুর
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
এখনো খুব একটা নিয়ন্ত্রণে আসেনি হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি। দৈনিকই হাম এবং অতি সংক্রামক এই রোগের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর পাশাপাশি মৃতের সংখ্যাটিও এখনো উদ্বেগজন অবস্থায় রয়েছে। পাশাপাশি ডেঙ্গু পরিস্থিতিও খুব একটা আশাব্যাঞ্জক নয়। ২৫ তারিখের পর গত ৩ দিন ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যাটি শূন্য থাকলেও এডিস মশাবাহিত এই জ¦রে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়েছে।
দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় (গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গে আরো ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে একই সময়ে ডেঙ্গুতে কারোর মৃত্যু হয়নি।
গতকাল রবিবার হামের সার্বিক পরিস্থিতি এবং ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের পাঠানো আলাদা বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান হয়।
হামের সার্বিক বিষয় নিয়ে পাঠানো বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে গত ২৪ ঘণ্টায় যে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে তারা কেউই নিশ্চিত হামে মারা যায়নি। তারা হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। মৃতদের মধ্য ঢাকা বিভাগে ২ জন এবং ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে একজন করে। দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৫৭ জন। ১১৬ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে, আর হামের উপসর্গজনিত রোগীর সংখ্যা ৯৪১। এই সময়ে ৮৮৯ শিশু নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, আর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ৮৬৫ শিশু।
চলতি বছর হামে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২ এপ্রিল থেকে হামের তথ্য গণমাধ্যমে পাঠাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম-বিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত সারাদেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে মোট ৬১৯ জনের। আর হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৯৩ শিশু। হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট মারা গেছে ৭১২ জন। হামের উপসর্গে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৯৯ হাজার ২০৭, আর নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১১ হাজার ৭১০। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মোট ৮২ হাজার ৮৪৪ রোগী, যাদের মধ্যে ৭৯ হাজার ১৫২ জন ছাড়পত্র পেয়ে ইতোমধ্যে বাড়ি ফিরেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হামের উপসর্গ নিয়ে বা নিশ্চিত হামে আক্রান্ত ও মৃতের তথ্য প্রকাশ করছে। তবে কোন বয়সের, কোন আর্থসামাজিক শ্রেণির মানুষ তারা, হামে আক্রান্ত হওয়ার কতদিন পর তাদের মৃত্যু হচ্ছে, মৃত্যুর আগে তাদের কোন ধরনের চিকিৎসা হয়েছিল- তার কোনো তথ্য প্রকাশ করছে না।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে কারোর মৃত্যু হয়নি। তবে একই সময়ে ১৭২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মধ্যে বরিশাল বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩৩ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ২৪ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ২৭ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২৪ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২৩ জন, খুলনা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩১ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৫ জন, রাজশাহী বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৫ জন। ২৪ ঘণ্টায় ১৩০ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু বিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর পহেলা জানুয়ারি থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫ হাজার ৮০০ জন। এর মধ্যে ৬২ দশমিক ২ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ নারী রয়েছেন। ভর্তি রোগীদের মধ্যে ৫ হাজার ৩৫৬ জন রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। আর চলতি বছরে ডেঙ্গুতে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট এক লাখ দুই হাজার ৮৬১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হন এবং এ রোগে ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে মোট ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হন এবং ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ছিল আরো ভয়াবহ। ওই বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয় এবং ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন।
শ্রীলঙ্কায় বাড়ছে ডেঙ্গু; ভয়ের কারণ নেই
এদিকে শ্রীলঙ্কায়ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। দেশটিতে প্রতিদিন হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশটিতে ডেঙ্গুর বিস্তার মোকাবিলায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে বলে গত মঙ্গলবার শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকের কার্যালয় জানিয়েছে। এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত ও ধ্বংস করতে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা একটি বিশেষ টাস্কফোর্সে যোগ দেবেন। এছাড়া যারা এই মশার প্রজননের কারণ হবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তবে শ্রীলঙ্কার এই পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের খুব বেশি আতঙ্কিত হবার কোনো কারণ নেই বলে জানিয়েছেন প্রখ্যাত কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এই অধ্যাপক ভোরের কাগজকে বলেন, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ খুব বেশি নয়। তাই এনিয়ে আমাদের আতঙ্কিত হবার কোনো কারণ নেই। তবে আমাদের দেশের অভ্যন্তরে যে পরিস্থিতি তা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ আছে। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন জরিপ, তথ্য উপাত্ত ডেঙ্গুর ব্যাপকতা বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকারের উদ্যোগ আছে। তবে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হবারো প্রয়োজন আছে বলে জানান তিনি।
