উত্তেজনা তীব্র, এবার দোহায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পরোক্ষ বৈঠক
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সমঝোতা চুক্তির পরবর্তী ধাপে পৌঁছতে তীব্র সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও কাতারের রাজধানী দোহায় পৌঁছেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচক দল। তবে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গতকাল বুধবার মুখোমুখি নয়; বরং পরোক্ষ কারিগরি আলোচনায় অংশ নিয়েছে দেশ দুটি। এই আলোচনার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, পারমাণবিক ইস্যু, কূটনৈতিক বিষয় এবং অর্থায়নসহ জব্দকৃত তহবিল ফেরত দেয়ার মতো বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে এই আলোচনা প্রযুক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। এ কারণে দোহায় অন্তত তিনটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়েছে।
রয়টার্স আরো জানিয়েছে, বুধবারের ওই কারিগরি বৈঠকের জন্য পরিবেশ তৈরি করতে কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মার্কিন দূত স্টিভ হুইটেকার এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। মঙ্গলবার ওই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। তবে বুধবার ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কারিগরি আলোচনায় অংশ নেননি তারা।
সংবেদনশীল এই আলোচনা সম্পর্কে অবগত এক কূটনীতিক এএফপিকে বলেন, ‘আলোচনা শুরু হয়েছে। দোহায় এই আলোচনা সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে সুইজারল্যান্ডের লেক লুসার্ন সম্মেলনে অর্জিত অগ্রগতি এবং জুনে উভয় পক্ষ অনুমোদিত আলোচনার কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে আগোনো হচ্ছে।’
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে কোনো উচ্চপর্যায়ের বৈঠক বা সরাসরি মুখোমুখি আলোচনার পরিকল্পনা নেই; বরং পৃথকভাবে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন তারা। পরোক্ষ আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করে ওয়াশিংটন বলেছে, তেহরানের সঙ্গে কারিগরি আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে দোহায় এই বৈঠক কতো সময় বা কতোদিন চলবে সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।
অপরদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার কোনো পরিকল্পনা তেহরানের নেই।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছতে গত ১৭ জুন একটি সমঝোতা চুক্তি হয়। এর ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে সার্বিক বিষয়ে কিছুটা অগ্রগতিও হয়। এরপর দোহায় আলোচনা শুরুর কিছুদিন আগে ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এভার লাভলি’-তে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। ইরান এই হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করে যুক্তরাষ্ট্র। এ হামলার প্রতিবাদে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায় দেশটি। এর জবাবে উপসাগরীয় দেশ বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন স্থাপনায় পাল্টা আঘাত হানে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। আকস্মিক এই পাল্টাপাল্টি হামলায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধের বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ফলে দোহায় সরাসরি আলোচনার বিপরীতে এখন পরোক্ষ আলোচনা করছে দেশ দুটি।
এদিকে বিশ্বের অতি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জ্বালানি করিডোর ও নৌপথ হরমুজ নিয়ে একটি ঘোষণা দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনে জানান, ‘অবাধ ও শর্তহীন’ চলাচল নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালিকে মাইনমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফ্রান্স ও ওমান। অন্য অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে যৌথভাবে কাজ করবে তারা। প্রথমবারের মতো সরকারি সফরে ফ্রান্সে যান ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিক। সেখানে প্যারিসে তার সঙ্গে আলোচনার পর এই কথাগুলো বলেন মাখোঁ।
যদিও ইরান বারবার জোর দিয়ে বলে আসছে, হরমুজে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ, মাইন নিষ্ক্রিয়করণ এবং সামুদ্রিক অস্থায়ী ব্যবস্থার বিষয়গুলো ইসলামাবাদ স্মারকের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পরিচালিত হবে এবং উপকূলীয় দেশ হিসেবে এগুলো ইরানের সমন্বয়েই সম্পন্ন হবে।
মাখোঁর ওই ঘোষণার একদিন পর মঙ্গলবার সাংবাদিকদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘অন্য যে কোনো পক্ষের চেয়ে ইরান নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে ভালো বোঝে এবং তা পালনের সক্ষমতা তাদের রয়েছে। তাই এখানে অন্য কারও হস্তক্ষেপের কোনো প্রয়োজন নেই। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সই হওয়া সা¤প্রতিক এক সমঝোতা স্মারকের আওতায় তেহরান নিজ সামর্থ্যরে সর্বোচ্চটুকু দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করবে। এটি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত এবং বিপরীত পথে কেবল ৬০ দিনের জন্য বিনা মূল্যে এই সুবিধা দেবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অবিলম্বে শুরু হবে এবং কারিগরি ও সামরিক বাধা অপসারণ এবং ইরান ইসলামী প্রজাতন্ত্র কর্তৃক মাইন নিষ্ক্রিয়করণের প্রয়োজনীয়তা সাপেক্ষে, ৩০ দিনের মধ্যে এটি চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। সুতরাং এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যা শুরু হয়েছে এবং চলতেই থাকবে। অন্য কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই এই কাজ সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার মতো যথেষ্ট সক্ষমতা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের রয়েছে।’
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম দুই দেশের সামরিক কর্তৃপক্ষের মধ্যে নয়, বরং রাজনৈতিক পর্যায়ে হচ্ছে। ইরানের পক্ষে এটি তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিচালনা করছে বলেও উল্লেখ করেন বাঘাই। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এমন আবহে ইরানের বিরুদ্ধে আবারো পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করা হবে কিনা, তা নিয়ে গত কয়েক দিনে একাধিক উচ্চপর্যায়ের আলোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের সঙ্গে এসব আলোচনায় ইরানে নতুন করে বড় আকারের হামলার সম্ভাবনাও উঠে এসেছে। তবে আপাতত সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু না করে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন ট্রাম্প।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ট্রাম্প মনে করছেন- নতুন করে পূর্ণমাত্রার হামলা শুরু হলে চলমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ভেঙে যেতে পারে। এতে শেষ পর্যন্ত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিষ্ক্রিয় করার দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন লক্ষ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট তার সহযোগীদের জানিয়েছেন, পারমাণবিক সমঝোতার জন্য নির্ধারিত ১৮ আগস্টের সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও তার আপত্তি নেই। এতে আলোচনার জন্য আরো সময় পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্প যখন আলোচনায় বিশ্বাসী, তখন তার উল্টো দিকে অবস্থান নিয়েছে মিত্র ইসরায়েল। ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনিকে ‘হত্যা করার’ হুমকি দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ। তার এ হুমকিতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। গতকাল মাইক্রো ব্লগিং সাইট এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের ধারাগুলো স্বচ্ছ কাঁচের মতো পরিষ্কার। এই চুক্তিতে কী কী শর্ত রয়েছে তা দেখতে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার তেল আবিবের (ইসরায়েলের) পোষা প্রাণীদের মুখ বন্ধ রাখার ব্যাপারে প্রতিশ্রæতি দিয়েছেন। কিন্তু তিনি যদি এতে ব্যর্থ হন এবং ইসরায়েলি নেতারা তাদের মনিব ট্রাম্পের কথা না শোনেন, তাহলে ইসরায়েলকে কঠোর শিক্ষা দেবে ইরান।’
মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া ১৪ দফার সমঝোতা চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ করা। তবে ইসরায়েল এই চুক্তির সরাসরি অংশ না হওয়ায়, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও সম্প্রতি দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে ব্যাপক বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। পাল্টা হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহও। এই দুই পক্ষ ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। তাই এদের কারণেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় যুদ্ধ। গত ১৭ জুন একটি সমঝোতা চুক্তি হয়। এর আওতায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, অবরোধ প্রত্যাহারের পর হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়া এবং যুদ্ধের স্থায়ী অবসান ও ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর সময়সূচি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে এই চুক্তি ও যুদ্ধবিরতি চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
