ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলায় বাড়ছে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসংকট
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ১১:২৭ এএম
ছবি : সংগৃহীত
ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা আরো বেড়েছে। দেশটির জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ২৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ১১ হাজারের বেশি মানুষ এবং প্রায় ১৩ হাজার বাসিন্দা গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।
ভূমিকম্পের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও দেশজুড়ে শোক ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, সময় যত গড়াচ্ছে, জীবিত কাউকে উদ্ধারের সম্ভাবনা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন। তার ভাষায়, এই মানবিক বিপর্যয়ে দেশের ‘আত্মা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।’
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানী কারাকাসের উত্তরের শহর লা গুয়ারিয়া। সেখানে ধসে পড়া অধিকাংশ ভবনে ‘ডি’ চিহ্ন দেওয়া হয়েছে, যার অর্থ ভবনগুলোতে অনুসন্ধান চালিয়ে জীবিত কাউকে পাওয়া যায়নি। স্পেনের একটি উদ্ধারকারী দলের সমন্বয়কারী হাভিয়ের রোডস বলেন, যেখানে জীবিত কাউকে উদ্ধারের সম্ভাবনা নেই, সেখানে আর অনুসন্ধান চালানো হয় না।
তবে হতাশার মধ্যেও আশার আলো দেখা গেছে। মঙ্গলবার ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তিন বছর বয়সী এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী এই ভূমিকম্পের ছয় দিন পর শিশুটির জীবিত উদ্ধার হওয়া উদ্ধারকর্মীদের বিস্মিত করেছে। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষের ৭২ ঘণ্টার বেশি বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম।
লা গুয়ারিয়ার কারাবালেদা শহরের এক বাসিন্দা হোসে রাফায়েল এখনো তার নিখোঁজ ছেলেকে খুঁজছেন। তিনি বলেন, ‘এখান থেকে আর কেউ বের হয়ে আসবে না—জীবিতও না, মৃতও না।’
অন্য একটি ধ্বংসস্তূপে অনুসন্ধান শেষে এক মার্কিন উদ্ধারকর্মী স্থানীয়দের জানান, সেখানে ‘জীবনের কোনো চিহ্ন নেই।’ এতে স্বজনদের জীবিত উদ্ধারের আশায় থাকা মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এখনো প্রায় ৫০ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প তেলসমৃদ্ধ দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস করে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটের কারণে আগে থেকেই দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
এদিকে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্যসংকট। লা গুয়ারিয়ার একটি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ১৮ বছর বয়সী দানিয়েল আরমাস বলেন, খাবার বিতরণের সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে মানুষ প্রায় একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
চুরি ও লুটপাটের ঘটনাও বেড়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে মূল্যবান সামগ্রী চুরির অভিযোগে বুধবার চার পুলিশ সদস্যকে স্থানীয়দের সহায়তায় আটক করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার ভেনেজুয়া মিশনপ্রধান লিয়া পোগগিও পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত সংকটাপন্ন’ বলে মন্তব্য করেছেন।
ত্রাণের লাইনে প্রতিদিন মানুষের ভিড় বাড়ছে। অনেকেই স্বেচ্ছাসেবক ও সাধারণ মানুষের সহায়তায় দিন পার করছেন। লা গুয়ারিয়ায় বহুতল ভবন ধসে যাওয়ার পর পরিবার নিয়ে একটি পার্কিং এলাকায় আশ্রয় নেওয়া ৫৬ বছর বয়সী ফাতিমা বেরেতোরান বলেন, ‘গত রাত পর্যন্ত আমরা কিছুই পাইনি। পরে কিছু পানি সরবরাহ করা হয়েছে।’
আশ্রয়কেন্দ্রে ঘরে তৈরি খাবার পৌঁছে দেওয়া স্বেচ্ছাসেবী আইসমার লোপেজ বলেন, ‘আমি যখন খাই, তখন মনে হয় কোথাও কেউ না খেয়ে আছে। তখন অপরাধবোধ হয়।’
আরো পড়ুন : ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় দুই হাজার
এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) আগামী তিন মাস প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের জন্য খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে ৫ কোটি ডলার তহবিলের আবেদন জানিয়েছে।
অন্যদিকে, রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মুখপাত্র ক্রিস্টিনা লিন্ডমেয়ার জানান, ভেনেজুয়েলার স্বাস্থ্যব্যবস্থা বর্তমানে চরম চাপের মুখে রয়েছে। ভূমিকম্পের আগেই দেশটিতে টিকাদানের হার কম ছিল। ফলে হাম, ডিপথেরিয়াসহ টিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে।
এদিকে উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে নাসার প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, ভূমিকম্পে প্রায় ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।
