ভারতে গমনেচ্ছুদের স্বস্তি, ভিসাকেন্দ্রে উপচেপড়া ভিড়
হরলাল রায় সাগর
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
পুরোদমে ভারতীয় ভিসা চালু হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে ভিসাপ্রত্যাশী বাংলাদেশিদের মাঝে। দুই বছর ধরে সীমিত মেডিক্যাল ভিসা নিয়ে আক্ষেপ থাকলেও পর্যটন ভিসা চালু করায় সব অসন্তোষ উবে গেছে। ইন্ডিয়ান ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টারে (আইভ্যাক) বাড়ছে ভারতে গমনেচ্ছুদের ভিড়। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনার পাঁচটি ভিসা কেন্দ্রের সামনে আবেদনকারীদের দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে প্রতিদিন। রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কের ভিসা কেন্দ্রের বাইরে গত চার দিন ধরে এক কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। অসহনীয় অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সেবা চালুর মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ১ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি আবেদন জমা পড়ে ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রগুলোতে। ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করায় ভিসা আবেদনকারীদের মাঝে সন্তুষ্টি বিরাজ করছে।
ঢাকায় ভারতের নতুন হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী গত ২৫ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যটন ভিসা কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দেন। তিনি জানান ২৮ জুন থেকে ফের টুরিস্ট ভিসার আবেদন নেয়া শুরু হবে। ওই দিন থেকেই ভিসা আবেদন গ্রহণ করে আইভ্যাক। এতদিন ব্যাপক যাচাই-বাছাইয়ের পর মেডিক্যালসহ কিছু ভিসা কেবল দেয়া হত।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার মধ্যে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর দৈনিক ঘোষণার ভিত্তিতে ভিসা কার্যক্রম বন্ধই রাখা হয়। আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ভিসা আবেদন কেন্দ্রগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের ঘোষণা দেয় ভারত সরকার। ওই মাসের মাঝামাঝি সময়ে সীমিত পরিসরে আবার ভিসা আবেদনকেন্দ্র খুলে দেয়া হয়। ভারতবিরোধী বিক্ষোভ, স্লোগান ও ভারতীয় হাই কমিশন অফিস ঘিরে ও কর্মীদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ভারত ট্যুরিস্ট ভিসা সম্পূর্ণ স্থগিত করে। ওই বছরের ১৬ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কেবল সীমিত পরিসরে জরুরি ও মেডিক্যাল ভিসা দেবে ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশন। তাতে ভারতীয় ভিসাপ্রত্যাশী বাংলাদেশিরা ভোগান্তিতে পড়েন। ব্যবসার কাজেও অনেকে যেতে পারছিলেন না। মেডিকেল ভিসা সীমিত পরিসরে চালু থাকলেও আবেদন জমা দেয়ার অ্যাপয়েন্টমেন্ট মিলছিল না।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং ভারত-বিরোধী মনোভাবের কারণে সম্পর্কের আরো অবনতি হয়। ওই সরকারের দেড় বছরেও সেই অচলাবস্থা আর কাটেনি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির জয়ের পর দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। তবে বর্তমানে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অধীনে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও অবৈধ অনুপ্রবেশ ও তিস্তার পানি বণ্টনের মতো অমীমাংসিত ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে এখনো শীতল ভাব বজায় রয়েছে।
তবে রাজনৈতিক এই টানাপোড়েন সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যকার গভীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতাকে এড়ানো অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাশ্রয়ী চিকিৎসা, বিয়ের কেনাকাটা কিংবা পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় থাকা আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করার জন্য বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে ভারতই একমাত্র ভরসা।
এই পরিস্থিতিতে মে মাসের মাঝামাঝি খবর আসে, ভারত শিগগিরই বাংলাদেশিদের জন্য আবার পর্যটন ভিসা চালু করতে যাচ্ছে। তারও দেড় মাস পর সুখবর দেন নতুন ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
আবেদনকারীরা জানিয়েছেন, সীমিত সেবার সময়ে অনলাইনে মেডিকেল ভিসার আবেদন করে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টসসহ হাই কমিশনে জমা দিতে হত। হাই কমিশন সেগুলো যাচাইবাছাই করে ভিসা আবেদন জমার সময় দিত। এরপর আবেদন গ্রহণ করা হলেও ভিসা দেয়া হত কম।
আগে যেখানে প্রতি বছর ২০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি ভারতে যেতেন, ভিসা স্থগিতের পর ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে মাত্র ৪ লাখ ৭০ হাজারে, যাদের বেশিরভাগই গিয়েছিলেন সীমিত পরিসরে চালু থাকা মেডিক্যাল ভিসায়। আগে ভারতের দেয়া মোট মেডিক্যাল ভিসার ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশই পেতেন বাংলাদেশিরা। সম্পর্ক খারাপ হওয়ায় বিকল্প হিসেবে অনেকে চীন, থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরে গেলেও মধ্যবিত্তের জন্য তা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ফলে ভাষা বা খাবারের কোনো বাধা না থাকা এবং বাংলাভাষী চিকিৎসকদের সহজলভ্যতার কারণে কলকাতা, চেন্নাই, দিল্লি বা ব্যাঙ্গালুরুর হাসপাতালগুলোই বাংলাদেশিদের প্রধান পছন্দ। মেডিকেল ভিসা পাওয়া কঠিন হওয়ায় অনেকেই এখন ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারতে ছুটছেন।
ভিসা কেন্দ্রের লাইনে থাকা শফিকুল নামের এক আবেদনকারী জানান, অসুস্থ স্ত্রী ও মায়ের চিকিৎসার জন্য ট্যুরিস্ট ভিসা চালু হওয়াটা তার জন্য জীবনরক্ষাকারী সুযোগের মতো। অন্যদিকে এক সাধারণ আবেদনকারী বলেন, ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। আমাদের সম্পর্ক সব সময়ই উষ্ণ ছিল, মাঝে কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। কিন্তু বন্ধুত্ব বজায় রেখেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
ট্যুরিস্ট ভিসা পুনরায় চালুর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীরাও। গত দুই বছরে কলকাতার নিউ মার্কেট ও সদর স্ট্রিট সংলগ্ন ‘মিনি বাংলাদেশ’ খ্যাত বাণিজ্যিক এলাকায় বাংলাদেশিদের আগমন কমে যাওয়ায় হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছিল। ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে এই এলাকার ব্যবসায়ীদের প্রায় ১ হাজার কোটি রুপির ক্ষতি হয়েছে। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে আবারও ব্যবসা চাঙ্গা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঢাকার মিরপুরের শিক্ষার্থী সামি আল নাফিস নিলয় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে হৃদরোগে আক্রান্ত বাবাকে নিয়ে ভারতে যেতে চেয়েছিলেন। অনেক সময় নিয়ে আবেদনের পরও সেবার ভিসা মেলেনি, দেশেই করান বাবার চিকিৎসা।
বুধবার সকালে যমুনা ফিউচার পার্কে বিশ্বে ভারতের সবচেয়ে বড় ভিসা আবেদনকেন্দ্রে ঘুরে ভিসা কার্যক্রম শুরু হওয়া মানুষের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেছে। সকাল ৯টায় কার্যক্রম শুরু আগে ভিসা আবেদন কেন্দ্রের সামনে বড় ধরনের লাইন থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ছোট হয়ে আসে। তবে, কিছু সময় পরপর ছোটো ছোটো লাইন ছিল দুপুর পর্যন্ত।
প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর স্বাভাবিক ভিসা কার্যক্রম চালু হওয়ায় এবার ভারতে বেড়াতে যেতে চান নিলয়। অনলাইনে আবেদন করে আবেদনপত্র জমার সময়ও পেয়ে গেছেন সহজে। বুধবার যমুনা ফিউচার পার্কে আইভ্যাকে আবেদন জমা দেন। তিনি জানান, তিনি নিজেই আবেদন করেছেন, খুব সহজে ভিসার আবেদন জমার সময় পেয়েছেন। ফিঙ্গার প্রিন্ট আগে দেয়া থাকায় সময়ও কম লেগেছে। ৩০-৩৫ মিনিটের মধ্যে কাজ শেষ গেছে। ভিসা কার্যক্রম সীমিত থাকায় আগেরবার মেডিকেল ভিসা না পাওয়ায় আক্ষেপ থাকলেও এবার ট্যুরিস্ট ভিসা পাবেন বলে আশাবাদী তিনি।
নিলয় বলেন, আমরা তো কখনো চাই না ভিসা বন্ধ থাকুক। চিকিৎসা-ঘোরাঘুরিসহ কত কাজেইতো মানুষ ভারতে যায়। সে কারণে ভিসা প্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকুক এটা আমরা চাই।
চারদিন আগে স্ত্রীর জন্য মেডিকেল ভিসার আবেদন জমা দিয়েছিলেন নীলফামারীর আরমান হোসেন। বুধবার ভিসা কেন্দ্রে এসে আবেদন ও কাগজপত্র জমার সময় পেয়েছেন তিনি। নিঃসন্তান আরমান স্ত্রীকে ভারতে ফার্টিলিটির চিকিৎসক দেখানোর ইচ্ছায় ভিসা আবেদন নিয়ে এসেছেন আইভ্যাকে।
স্বামীর চিকিৎসার জন্য ভারত যেতে চুয়াডাঙ্গা থেকে ভিসার আবেদন নিয়ে এসেছেন গৃহিণী সামিরা। রোগী ও অ্যাটেনডেন্ট মিলে তারা ভিসার আবেদন করেছেন তিনটি। ভিসা আবেদন জমার সময় পেতে ট্রাভেল এজেন্টের দ্বারস্থ হলেও নিজেরা খুব সহজে ভিসা আবেদন জমা দিতে পারার কথা বলেন তিনি।
ট্যুরিস্ট ভিসা চালু হওয়ায় কল্যাণপুর থেকে ভিসা আবেদন নিয়ে এসেছেন মোহাম্মদ প্রান্ত। আইভ্যাকের বাইরে লাইনে দাঁড়ানো থাকাবস্থায় কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাাকার ট্যুরিস্ট ভিসা চালু হওয়ায় আমরা খুবই খুশি। কারণ, আমরা খুব কম খরচে আমাদের পাশের দেশ ভারতে ঘুরতে যেতে পারি। এজন্য আমরা খুশি।
অনলাইনে ভিসা আবেদন করতে পারলেও আবেদন জমা দেয়ার টাইম-স্লট না পাওয়ায় ভোগান্তির কথা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছিলেন ভিসা প্রত্যাশীরা। ভিসা আবেদন জমার সময় পেতে মানুষের ভোগান্তি লাঘবে ১ জুলাই থেকে টাইম-স্লট ব্যবস্থাপনা নতুন নিয়ম চালুর কথা বলেছে ভারতীয় হাই কমিশন। এখন থেকে অনলাইনে আবেদনের পর আইভ্যাকের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে সময় বরাদ্দ দেয়া হবে।
আগে নিজে নিজে টাইম-স্লট বেছে নেয়ার সুযোগ থাকলেও অনেকক্ষেত্রে পাওয়া যেত না। টাইম-স্লট পেতে এজেন্ট বা দালাল ধরার কথা বলে আসছিলেন আবেদনকারীরা।
ভিসা আবেদনকারীরা বলছেন, স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবেদন জমার সময় বরাদ্দ দিলে মানুষের ভোগান্তি কমতে পারে। আগে টাইম-স্লট পেতে গিয়ে অনেক সময় জটিলতা মোকাবেলা করতে হতো।
