ছোট্ট কফিনের পাশে খামেনি, কান্নায় ভেঙে পড়ল তেহরান
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
তেহরানে লাখো শোকাহত মানুষের উপস্থিতিতে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের আরো চার সদস্যের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল রবিবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টায় (বাংলাদেশ সময় সাড়ে ১০টা) এই জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা উপলক্ষে ইরানে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়।
জানাজায় ইমামতি করেছেন দেশটির অন্যতম জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি। এসময় উপস্থিত ছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি ইজেই। আরো উপস্থিত ছিলেন খামেনির তিন ছেলে- মাসুদ, মাইসাম ও মোস্তফা। তবে অসুস্থতা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে বাবার জানাজায় অংশ নিতে পারেননি ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি। এছাড়া জানাজায় অংশ নেন ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের কমান্ডার ইসমাইল কানি। ইরানের সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
নিহত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সাত দিনের রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি ঘোষণা করে ইরান। গতকাল ছিল দ্বিতীয় দিন। এদিন সকালে প্রিয় নেতার প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানাতে তেহরানের রাস্তায় অশ্রæসিক্ত মানুষের ঢল নামে। শোকাহত এই জনতা বুকে আঘাত করে মাতম করেন এবং খামেনির স্মরণে তারা ব্যানার ও সাদা ফুল নিয়ে এসেছিলেন। কর্তৃপক্ষের ধারণা, এই শেষকৃত্য আয়োজনে লাখ লাখ মানুষের সমাগম ঘটে। তারা সবাই জানাজায় অংশ নেন।
এদিকে জানাজাস্থলে শোকাহতদের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী স্লোগান দিতে দেখা গেছে। ‘যুক্তরাষ্ট্র ধ্বংস হোক’ ও ‘ইসরায়েল ধ্বংস হোক’- এমন স্লোগানের পাশাপাশি খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন অনেকেই। মূলত তেহরানে জানাজাস্থলে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ তার পরিবারের আরো চার সদস্যের কফিনও সেখানে সাজানো ছিল। শোকাবহ এই আয়োজনে সেখানে রাখা ছিল তার মাত্র ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়েগানির একটি ছোট কফিনও।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ তার মেয়ে সাইয়েদা বুশরা হোসেইনি খামেনি, মেয়ের জামাই মেসবাহ-ওল-হোদা বাঘেরি, পুত্রবধূ জাহরা হাদ্দাদ আদেল ও নাতনি জাহরা। ঘটনার আকস্মিকতায় ও শিশু জাহরার ছোট কফিনটি শোকসভায় এক অত্যন্ত মর্মস্পর্শী দৃশ্যের অবতারণা করে। তখন জানাজায় উপস্থিত লাখো শোকার্ত জনতা অশ্রæসিক্ত নয়নে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি ন্যায়বিচার ও প্রতিশোধের ওই স্লোগান দেন।
তাসনিম নিউজ এজেন্সি প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, জানাজার সময় ওই ছোট কফিনটি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কফিনের পাশেই রাখা ছিল। সংস্থাটি জানিয়েছে, জাহরার বাবা মোহাম্মদ জাওয়াদ মোহাম্মাদি গোলপায়েগানিও জানাজায় অংশ নেন।
জানাজা শেষে সন্ধ্যায় প্রয়াত নেতার (আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি) মরদেহ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা থেকে স্থানান্তর করা হয়। রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি অনুযায়ী আজ সোমবার রাজধানীজুড়ে শোকমিছিল হবে। আগামীকাল মঙ্গলবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কফিন নিয়ে যাওয়া হবে কোম নগরীতে। বুধবার কফিন নেয়া হবে প্রতিবেশী দেশ ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখান থেকে শোকযাত্রা হবে নাজাফ ও কারবালা শহরে। সেখানেও শোকাহত মানুষ তার প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানাবেন এবং জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে ৯ জুলাই জন্মস্থান ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে তাকে দাফন করার কথা রয়েছে।
অপরদিকে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় মানুষের কান্না দেখে ‘হতবাক’ হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে এমনটি জানিয়েছেন তিনি। ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ‘ভেবেছিলেন মানুষ তাকে ঘৃণা করে।’
অ্যাক্সিওসের সাংবাদিক বারাক রাভিদকে টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি চাইলে খামেনির জানাজায় উপস্থিত সবাইকে নির্মূল করতে পারতাম। কিন্তু আমি তা করিনি। কারণ, এমনটি করলে আলোচনার জন্য আর কেউ অবশিষ্ট থাকত না।’
ট্রাম্প আরো বলেন, ‘খামেনির জানাজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আলোচনা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। জানাজা কার্যক্রম চলাকালে কোনো পক্ষই অপর পক্ষের ওপর হামলা চালাবে না।’
গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন উপলক্ষে সাউথ ডাকোটার মাউন্ট রাশমোরে আয়োজিত এক সমাবেশে ইরানকে কটাক্ষ করে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমরা ইরানের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছি। ওরা এখন একটি সমঝোতায় আসার জন্য ভীষণ মরিয়া হয়ে উঠেছে। আমরা জানাজার জন্য ওদের এক সপ্তাহের ছুটি দিয়েছি।’ তবে ‘এক সপ্তাহের ছুটি’ দেয়ার বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে হরমুজ নিয়ে নতুন বার্তা দিয়েছে ইরান। গত শনিবার বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড পিস ফোরামে বক্তব্য দিতে গিয়ে চীনে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আবদোলরেজা রহমানি ফাজলি বলেছেন, ‘হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন ব্যবস্থা প্রণয়নে ওমানের সঙ্গে সমন্বয় ও সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করছে ইরান। হরমুজ আমাদের আঞ্চলিক জলসীমার অংশ হওয়ায় আমরা অবশ্যই সেবা ফি আদায় করব। তবে এই ফি কোনোভাবেই টোল হবে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘নতুন এই ব্যবস্থাগুলো হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করা, জাহাজ চলাচলের তদারকি করা এবং বিপুল সংখ্যক জাহাজ চলাচলের ফলে সৃষ্ট পরিবেশগত প্রভাব মোকাবিলা ও তার নিশ্চয়তা দেয়ার বিষয়গুলোকে ঘিরেই হবে।’ তবে চীন এবং অন্যান্য ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ দেশকে এ ক্ষেত্রে ‘বিশেষ বিবেচনা’ দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। আল-জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
গত মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত বন্ধে হওয়া প্রাথমিক চুক্তিতে বলা হয়েছিল, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ৬০ দিন পর্যন্ত কোনো ধরনের ফি ছাড়াই চলাচল করতে পারবে। তবে ওই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর কী নীতি কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। স্থায়ী সমাধান নিয়ে আলোচনা চলমান থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, চূড়ান্ত কোনো চুক্তির অধীনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে টোল বা কোনো ধরনের ফি আদায়ের অনুমতি ইরানকে দেয়া হবে না।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধের প্রথম দিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় পরিবারের কয়েকজন সদস্যসহ নিহত হন ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। গুরুতর আহত হন মোজতবা খামেনি। ১৯৮৯ সাল থেকে ইরান শাসন করে আসছিলেন আয়াতুল্লাহ খামেনি। যুদ্ধরত পরিস্থিতির মধ্যে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশের প্রতিনিধিরা ইরানে যান। খামেনি নিহত হওয়ার পর তার ছেলে মোজতবাকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয়েছে। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
