×

প্রথম পাতা

হাম-ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে বিভ্রান্তি, বাড়ছে জটিলতা

Icon

সেবিকা দেবনাথ

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

হাম-ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে বিভ্রান্তি, বাড়ছে জটিলতা

ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখনো প্রকোপ আকার ধারণ করেনি। তবে হামের গ্রাফ এখনো ঊর্ধ্বমুখীই। হাম ও ডেঙ্গুর উপসর্গ কাছাকাছি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। এতে করে রোগ শনাক্তে দেরি হয়ে বাড়ছে জটিলতা। শিশু হাসপাতালের হাম ও ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি শিশুদেরও লক্ষণ প্রায়ই একই। জ্বর, শরীরে র‌্যাশ, ব্যথা, দুর্বলতা এমন সব উপসর্গ নিয়ে আসছে রোগীরা। কারো জ্বর থেকে র‌্যাশ আবার কারো তীব্র জ্বরের সঙ্গে আছে নিউমোনিয়া।

চিকিৎসকরা বলছেন, দুটিই ভাইরাসবাহিত রোগ হওয়ায় উপসর্গও কাছাকাছি। তবে সেক্ষেত্রে লক্ষ্য করতে হবে র‌্যাশের ধরন, চোখের সংক্রমণসহ বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষণে। তাই ৩ দিনের বেশি তীব্র জ্বর হলেই দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। চিকিৎসকরা জানান, জ্বর নিয়ে আসা প্রতি ১০টি শিশুর অন্তত ২ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে আক্রান্তের সংখ্যা আরো বাড়ার শঙ্কা চিকিৎসকদের।

হাম ও ডেঙ্গুর লক্ষণ কী? : হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার ৭ থেকে ১৪ দিন পর প্রকাশ পায়। হামের প্রধান লক্ষণ হলো তীব্র জ্বর (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত), সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং এরপর সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়া। সাধারণত ভাইরাস সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিন পর লক্ষণগুলো দেখা দেয়। এর আগে মুখে, বিশেষ করে গালে, ছোট সাদা দাগ দেখা যেতে পারে।

চিকিৎসকেরা পর্যবেক্ষণ করে বলছেন, ডেঙ্গুর চিরাচরিত রূপ এখন আর তেমন দেখা যাচ্ছে না। আগে ডেঙ্গু হলে তীব্র জ্বর, চোখে ব্যথা, পিঠ ও অস্থিসন্ধিতে প্রচণ্ড ব্যথা হতো এবং শরীরে লালচে র?্যাশ ওঠার মতো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যেত। অনেক সময় রোগী বুঝতেই পারেন না যে তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। সামান্য একটু জ্বর বা গা ম্যাজম্যাজ করার দু-এক দিনের মধ্যেই হঠাৎ করে রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটছে। আগে মনে করা হতো যে, জ্বর কমে যাওয়া মানে রোগী সুস্থতার দিকে যাচ্ছেন। কিন্তু বর্তমান ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, জ্বর কমে যাওয়ার পর বা ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’ শুরু হলেই আসল জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এ সময় রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং প্লাটিলেট দ্রুত ড্রপ করার প্রবণতা বেশি। জ্বর যেদিন কমা শুরু করে, সেদিন থেকে ৩ দিন পর্যন্ত সময়টা ক্রিটিক্যাল ফেজ। তাই এ সময় একটু সচেতন থাকা জরুরি। এ সময় নিয়মিত প্ল্যাটিলেট কাউন্ট করতে হবে। নতুন চরিত্রের ডেঙ্গুতে লিভার, কিডনি বা মস্তিষ্ক দ্রুত আক্রান্ত হচ্ছে। জ্বরের চেয়ে বমি, তীব্র পেটব্যথা, পাতলা পায়খানা কিংবা অতিরিক্ত ক্লান্তির মতো উপসর্গগুলো এখন বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।

উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ‘হেমোরেজিক ডেঙ্গু’ ও ‘শক সিনড্রোম’ : সাধারণ ডেঙ্গুর চেয়ে এখন বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘হেমোরেজিক ডেঙ্গু’। চিকিৎসকরা বলছেন, যারা আগে একবার আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের দ্বিতীয়বার ভিন্ন ভেরিয়েন্টে সংক্রমণ হলে, সেই সংক্রমণ হতে পারে প্রাণঘাতী।

রোগতত্ত্ববিদেরা জানান, ডেঙ্গুর চারটি ধরন- ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ এবং ডেন-৪। ডেঙ্গুর একটি ধরনে আক্রান্ত হলে সেই নির্দিষ্ট ধরনের প্রতিরোধক্ষমতা শরীরে গড়ে ওঠে, পরবর্তী সময়ে সেই ধরনটিতে মানুষ আর আক্রান্ত হয় না। তবে অন্য ধরনে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। এভাবে মোট ৪ বার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। প্রথমবার আক্রান্ত হওয়ার চেয়ে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলে রোগের তীব্রতা ও জটিলতা দুটিই বাড়ে।

ঢাকা শহরে বা দেশের অন্য জেলাগুলোতে কত মানুষ একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন বা হচ্ছেন, তার তথ্য সঠিকভাবে কারো জানা নেই। অন্যদিকে কোনো রোগীর পক্ষেও জানা সম্ভব হয় না যে, অতীতে তিনি কোন ধরনের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তবে রোগতত্ত্ববিদেরা বলেন, এক বছর একটি ধরনের প্রাদুর্ভাব বেশি থাকলে এবং তারপর অন্য একটি ধরনের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা দিলে, রোগের জটিলতা বেশি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

দেশে ডেঙ্গুর বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ২০০০ সালে। তবে ডেঙ্গুর ধরন বিশ্লেষণ শুরু হয় ২০১৩ সালে। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) তথ্য অনুযায়ী ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ডেন-১ ও ডেন-২ বেশি ছিল। দেশের ইতিহাসে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন ২০১৯ সালে। ওই বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন এক লাখের বেশি মানুষ। তখন ৯০ শতাংশ মানুষ ডেন-৩-এ আক্রান্ত হয়েছিলেন। ২০২২ সালে নমুনা বিশ্লেষণে প্রাধান্য ছিল ডেন-৩, ২০২৩ সালে ডেন-২ এবং ২০২৪ সালেও ডেন-২-এর প্রাধান্য ছিল। আর ২০২৫ সালে প্রাধান্য ছিল ডেন-৩-এর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. বে-নজির আহমেদ জানান, জ্বর থাকা, প্লাটিলেট কমে যাওয়া, শরীরে ব্লিডিংয়ের মেনিফেস্টেশন এবং ফ্লুইড ডিকেড এবিজেন্স থাকা- সমস্ত কিছু মিলে বলা হয় হেমোরেজিক ডেঙ্গু। যে প্রথমবার ডেঙ্গু থেকে সুস্থ হয়েছে তার যদি দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু হয়, এই ধরনের রোগীদের জটিলতা বেশি থাকে।

গত বছরগুলোতে ডেঙ্গুতে যারা মারা গেছেন, তাদের অধিকাংশেরই মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গুর ‘শক সিনড্রোম’-এ। চিকিৎসকরা জানান, শক সিনড্রোমের অর্থ ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর রক্তের অণুচক্রিকা দ্রুত কমে যায়। রোগীর পরিস্থিতি খারাপ হয়ে পড়ে, রোগী অনেক ক্ষেত্রে অজ্ঞান হয়ে যায়।

জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ডেঙ্গুর অধিকাংশ মৃত্যুর জন্য অবহেলা দায়ী। রিপোর্ট নেগেটিভ হলেও ডেঙ্গুর লক্ষণ ও উপসর্গ ঠিকই থাকে। কিন্তু রিপোর্ট নেগেটিভ আসায় রোগী চিকিৎসক কিংবা হাসপাতালে যায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় নানা জটিলতা শুরু হয়। রোগীর অবস্থা বেশি খারাপের দিকে গেলে, তখন তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে তার শরীরে ডেঙ্গু অনেকটা ক্ষতি করে ফেলে। বিলম্বে আসার কারণে শত চেষ্টা করেও চিকিৎসকের পক্ষে অনেক রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। রিপোর্ট যাই আসুক, লক্ষণ ও উপসর্গ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়ার তাগিদ দেন তিনি।

ডেঙ্গু শনাক্তে সঠিক সময়ে নমুনা পরীক্ষার পরামর্শ : গত কয়েক বছর ধরেই দেখা গেছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে নমুনা পরীক্ষায় রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। এ প্রসঙ্গে চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গুর ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর অর্থাৎ জ¦র হবার ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে এনএস-১ পরীক্ষা করলে পজিটিভ হতে পারে। এরপর অর্থাৎ ৫-৬ দিন পর পরীক্ষা করলে নেগেটিভ আসে। ৭ম দিনে আইজিএম পরীক্ষা করলে রিপোর্ট পজিটিভ আসবে। এর দুই দিন পর পরীক্ষা করলে নেগেটিভ আসবে। তখন আইজিপি পরীক্ষা করতে হবে। সবার সক্ষমতা এক নয়। তাই শরীরে ভাইরাস ঢুকলেও জ¦র পরে আসে। জ¦রের ৪, ৫ ও ৬ এই দিনগুলোকে বলা হয় ‘উইন্ডো পিরিয়ড’। এই সময়টাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবে রিপোর্ট নেগেটিভ হলেও ডেঙ্গুর লক্ষণ ও উপসর্গ থাকলে অবশ্যই চিকিৎসাসেবা নিতে হবে।

জটিল রোগী কমলেও কমেনি রোগীর চাপ : সম্প্রতি হামে আক্রান্ত গুরুতর রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমেনি। হাসপাতালের কোনো বেডই খালি নেই। হাসপাতালে দায়িত্বরত নার্সদের বক্তব্য, সিরিয়াস রোগীর সংখ্যা কমলেও রোগীর সংখ্যা কমেনি। হামের উপসর্গ বা র?্যাশ নিয়ে অনেক রোগী আসছে। রোগী কমে গেলে তো বেড ফাঁকাই থাকত। কিন্তু বেডই ফাঁকা নেই। এদিকে হামের রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেলেও ডেঙ্গুর রোগীর চাপ এখনো তেমনভাবে পড়েনি হাসপাতালগুলোতে। ডেঙ্গু ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। এই চাপ কম থাকায় রক্ষা হয়েছে। যদি হামের মতো ডেঙ্গুর চাপ হলে তাহলে চিকিৎসক-নার্সসহ রোগীদের সেবায় যারা কাজ করছেন, তারা বড় বিপদের মুখে পড়ত।

সম্পূর্ণ সুস্থ না হলে ডেঙ্গুরোগীদের ছাড়পত্র নয়; হামকে আটকে ফেলা হয়েছে- স্বাস্থ্যমন্ত্রী : গতকাল রাজধানীর ন্যাশনাল নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের ৫শ শয্যাবিশিষ্ট দ্বিতীয় ইউনিট উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত প্রস্তুতিমূলক সভায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত দুই মাস ধরে সরকার বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। উপজেলা হাসপাতালের চিকিৎসকদের ডেঙ্গুরোগী চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সিভিল সার্জনদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে ছাড়পত্র দেয়া হবে না। রোগীরা যেন হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যেতে না পারেন, সে লক্ষ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।

হাম পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ মুহূর্তে হাম পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এরইমধ্যে দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। মূলত শিশুদের পুষ্টিহীনতার কারণে হাম পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

বিদায়েও ব্রাজিলের ঝুলিতে মোটা অঙ্কের পুরস্কার

বিদায়েও ব্রাজিলের ঝুলিতে মোটা অঙ্কের পুরস্কার

সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা

সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা

নিম্নচাপের প্রভাবে ৪ সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

নিম্নচাপের প্রভাবে ৪ সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

প্রধানমন্ত্রী-আইএপিবির প্রধান নির্বাহীর সাক্ষাৎ

প্রধানমন্ত্রী-আইএপিবির প্রধান নির্বাহীর সাক্ষাৎ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App