প্যারাগুয়ের কঠিন প্রতিরোধ ভেঙে শেষ আটে উঠল ফ্রান্স
মুহাম্মদ রুহুল আমিন
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বকাপে আগের চার ম্যাচে প্রতিপক্ষকে দাপটের সঙ্গে হারানো ফ্রান্সের জন্য শেষ ষোলো ছিল একেবারেই ভিন্ন ধরনের পরীক্ষা। গ্রুপ পর্বে সেনেগাল, ইরাক ও নরওয়েকে এবং নকআউটে সুইডেনকে হারিয়ে ১৪ গোল করা দিদিয়ের দেশমের দল এবার মুখোমুখি হয়েছিল এমন এক প্রতিপক্ষের, যারা শুরু থেকেই নিজেদের অর্ধে শক্ত রক্ষণ গড়ে ফরাসিদের আক্রমণভাগকে নিষ্ক্রিয় করে রাখতে চেয়েছিল। তীব্র গরম, শারীরিক লড়াই, বারবার খেলা থেমে যাওয়া এবং ভিএআরের নাটকীয়তার মধ্যে শেষ পর্যন্ত কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে ফ্রান্স।
ফিলাডেলফিয়ার গরম আবহাওয়ায় ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল নিয়ে খেলতে থাকে ফ্রান্স। প্রথম ১০ মিনিটেই ৮০ শতাংশের বেশি সময় বল ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু সেই আধিপত্যকে পরিষ্কার গোলের সুযোগে রূপ দিতে পারেনি তারা। এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে ও ব্র্যাডলি বারকোলাকে ঘিরে বহুস্তরের রক্ষণ সাজিয়েছিল প্যারাগুয়ে। পাঁচ ডিফেন্ডার ও ঘন মিডফিল্ডের কারণে ফ্রান্সকে বারবার পাশের দিকে বল ঘোরাতে হয়েছে, কিন্তু ডি-বক্সের ভেতরে কাক্সিক্ষত ফাঁক তৈরি হয়নি।
অন্যদিকে প্যারাগুয়ে তাদের পরিকল্পনা থেকে এক ইঞ্চিও সরে যায়নি। তারা ডিফেন্সিভ লাইনে অতিরিক্ত খেলোয়াড় নামিয়ে বক্সের সামনে প্রায় ‘ডাবল শেল’ তৈরি করে। ফরাসি ফরোয়ার্ডদের সঙ্গে শারীরিকভাবে লড়াই করে তাদের ছন্দ ভাঙাই ছিল প্রধান কৌশল। ফলে ম্যাচটি ধীরে ধীরে ফুটবলের চেয়ে বেশি পরিণত হয় ধৈর্য ও শারীরিক শক্তির লড়াইয়ে।
ম্যাচের মাঝামাঝি সময়ে স্পষ্ট হয়ে যায়, ফ্রান্সকে ভাঙতে হলে ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে। তাই দ্বিতীয়ার্ধে দেশম সরাসরি আক্রমণের বদলে উইং সাইড ও দ্রুত পাসিং কম্বিনেশনের দিকে ঝুঁকেন। মাঝমাঠে বল দ্রুত সরালেও প্যারাগুয়ের ডিফেন্সিভ ব্লক এতটাই সংকুচিত ছিল যে, বক্সের ভেতর কোনো স্পেস তৈরি হচ্ছিল না। ফলে ফ্রান্সকে বারবার দূরপাল্লার শট ও ক্রসের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
৫২ মিনিটে গোলরক্ষক মাইক মেনিয়োর লম্বা পাসে একাই এগিয়ে যান এমবাপ্পে। তবে শেষ মুহূর্তে হুয়ান কাসেরেসের দারুণ ট্যাকলে রক্ষা পায় প্যারাগুয়ে। এরপর মান কোনের দূরপাল্লার শক্তিশালী শট অসাধারণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল, যিনি পুরো ম্যাচজুড়েই ছিলেন দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফুটবলার।
ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যায় ৭০ মিনিটে। বদলি হিসেবে নামা দেজিরে দুয়ে বক্সে ঢোকার সময় ফাউলের শিকার হলেও রেফারি প্রথমে খেলা চালিয়ে দেন। পরে ভিএআরের পরামর্শে মনিটরে রিপ্লে দেখে সিদ্ধান্ত বদলান এবং পেনাল্টি দেন। স্পটকিক থেকে কোনো ভুল করেননি এমবাপ্পে। শান্ত ও নিখুঁত শটে গোল করে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন অধিনায়ক। এটি এবারের বিশ্বকাপে তার সপ্তম গোল। একইসঙ্গে বিশ্বকাপে ফ্রান্সের ইতিহাসে ১৫০তম গোলের মাইলফলকও স্পর্শ করে দলটি।
ভিএআরের সিদ্ধান্ত আসার আগ মুহূর্তে ম্যাচে তৈরি হয় চরম উত্তেজনা। একদিকে প্যারাগুয়ের খেলোয়াড়দের তীব্র প্রতিবাদ, অন্যদিকে ফ্রান্সের বেঞ্চে অস্থিরতা- সব মিলিয়ে স্টেডিয়ামের পরিবেশ কয়েক মিনিটের জন্য সম্পূর্ণ বদলে যায়। সেই চাপ সামলে এমবাপ্পের নিখুঁত পেনাল্টিই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।
গোল হজমের পর বাধ্য হয়ে কিছুটা ওপরে উঠে আসে প্যারাগুয়ে। তবে এতক্ষণ যে রক্ষণাত্মক ছক তাদের ম্যাচে রেখেছিল, সেটি ভাঙতেই উল্টো ফাঁকা জায়গা পেয়ে যায় ফ্রান্স। শেষ দিকে ব্যবধান বাড়ানোর একাধিক সুযোগ তৈরি করেন এমবাপ্পে। যোগ করা সময়ে তার পরপর দুটি শট দুর্দান্ত নৈপুণ্যে ফিরিয়ে দেন অরল্যান্ডো গিল। সেই সেভ না হলে জয়ের ব্যবধান আরো বড় হতে পারত।
পরিসংখ্যানও ফ্রান্সের শ্রেষ্ঠত্বের কথাই বলছে। ম্যাচজুড়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ সময় বলের দখল ছিল ফরাসিদের। তারা ১৫টি শট নিয়ে পাঁচটি লক্ষ্যে রাখতে সক্ষম হয়। বিপরীতে প্যারাগুয়ে মাত্র পাঁচটি শট নেয়, যার মধ্যে একটিই ছিল লক্ষ্যে। তবে সংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল প্যারাগুয়ের শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, যা টুর্নামেন্টে প্রথমবারের মতো ফ্রান্সকে দীর্ঘ সময় গোলহীন আটকে রাখে।
এই ম্যাচে নান্দনিক ফুটবলের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ধৈর্য, মানসিক দৃঢ়তা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা। আগের ম্যাচগুলোর মতো দৃষ্টিনন্দন আক্রমণ না খেলেও জয় আদায় করে নেয়ার সামর্থ্য দেখিয়েছে দেশমের দল। বড় টুর্নামেন্টে শিরোপাপ্রত্যাশী দলগুলোর জন্য এমন ম্যাচই প্রায়শই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়, আর সেই পরীক্ষায় সফলভাবেই উত্তীর্ণ হয়েছে ফ্রান্স।
এই জয়ে টানা পঞ্চমবারের মতো মাঠ ছাড়ল বিজয়ী হিসেবে ফরাসিরা। সেনেগালকে ৩-১, ইরাককে ৩-০, নরওয়েকে ৪-১, সুইডেনকে ৩-০ এবং এবার প্যারাগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে পাঁচ ম্যাচে তাদের গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪, বিপরীতে হজম করেছে মাত্র ২টি। গোল্ডেন বুটের দৌড়েও সাত গোল নিয়ে শীর্ষ সারিতেই রয়েছেন এমবাপ্পে।
এবার কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ মরক্কো। ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এই আফ্রিকান দলকেই হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিল ফ্রান্স। তবে চার বছর পর বদলে যাওয়া বাস্তবতায় মরক্কোও অনেক বেশি পরিণত ও আত্মবিশ্বাসী। তাই শেষ ষোলোয় প্যারাগুয়ের কঠিন প্রতিরোধ ভাঙার পর এবার আরো বড় পরীক্ষার অপেক্ষায় রয়েছে দেশমের শিষ্যরা।
