এডিবির প্রতিবেদন নতুন অর্থবছরে ৪.৫% প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কাগজ প্রতিবেদক
চলমান জুলাইয়ে শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ম্যানিলাভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। দুর্বল রপ্তানি, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, উচ্চ জ্বালানি মূল্য, অব্যাহত মূল্যস্ফীতির চাপ এবং বৈশ্বিক প্রতিকূল পরিবেশের কারণে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কিছুটা কমানো হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এডিবির এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক জুলাই সংস্করণ প্রতিবেদনে জিডিপি প্রবৃদ্ধির এই পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার সর্বশেষ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে এডিবি। এতে
আমদানি, রপ্তানি, রেমিটেন্স, বিনিয়োগসহ বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সংস্থাটি বলেছে, ৩০ জুন শেষ হওয়া বিদায়ী অর্থবছরে (২০২৫-২৬) চূড়ান্ত হিসাবে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হবে। এডিবির পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা বলা হয়েছে। অবশ্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, সাময়িক হিসাবে সদ্যবিদায়ী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হয়েছে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি কী : জিডিপি দিয়ে সাধারণত একটি দেশের অর্থনীতির আকার বোঝানো হয়। একটি নির্দিষ্ট সময়ে সাধারণত এক বছরে দেশের সব উৎপাদনের উপাদানগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে মোট যে পরিমাণ পণ্য উৎপাদন ও সেবা সৃষ্টি হয়, তার সমষ্টিকে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি বলে। জিডিপি হিসাব করার সময় মধ্যবর্তী দ্রব্য ও সেবা বাদ দিয়ে কেবল চূড়ান্ত পণ্য ও সেবা ধরা হয়।
সংস্কার অব্যাহত রাখা জরুরি : এডিবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে সংস্থাটির বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান আকিরা মাতসুনাগা বলেন, কঠিন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিবেশের মধ্যেও শক্তিশালী প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) এবং সেবা খাতের স্থিতিশীল কার্যক্রমের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি সহনশীলতা দেখিয়ে যাচ্ছে। তবে শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পুনরুদ্ধারের জন্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা এবং জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করতে সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা জরুরি। এসব সংস্কার বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে, মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা আরো শক্তিশালী করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশ : এডিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি দেশে পেট্রোলিয়াম, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের প্রভাব পরিবহন, পরিসেবা ও অন্যান্য ভোক্তাপণ্যের দামে পড়তে থাকবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে নামতে পারে। তবে এডিবির এপ্রিলে দেয়া সাড়ে ৮ শতাংশ পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি। কারণ জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির দ্বিতীয় দফার প্রভাব, বিনিময় হার সমন্বয়ের প্রভাব এবং খাদ্য ও সেবা খাতে অব্যাহত মূল্যস্ফীতি কমার গতি ধীর করবে।
এডিবি বলছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং ব্যক্তিগত ভোগব্যয় সীমিত করছে। দুর্বল রপ্তানি এবং আমদানির মাঝারি প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক চাহিদার দুর্বলতা ও বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরবরাহের দিক থেকে রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাত উচ্চ জ্বালানি মূল্য, বৈদেশিক বাজারে দুর্বল চাহিদা এবং কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কারণে চাপে থাকবে। অন্যদিকে সারের ঘাটতির কারণে কৃষি খাত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তবে রেমিট্যান্সনির্ভর পারিবারিক আয়ের কারণে সেবা খাত প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা সহায়তা করবে।
এডিবির মতে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ঘাটতির কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ধীরে ধীরে বাড়বে, শক্তিশালী হবে না।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরো তীব্র হলে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে, বৈদেশিক খাতে চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহও দুর্বল হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরো বাড়লে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে এবং জ্বালানি ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধির কারণে সরকারের আর্থিক চাপও বাড়বে। এ ছাড়া উচ্চ শুল্ক, বিস্তৃত বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা বা প্রধান অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধি দুর্বল হলে রপ্তানি চাহিদা আরো কমতে পারে এবং উৎপাদন খাতের দুর্বলতা দীর্ঘায়িত হতে পারে।
এ ছাড়া বিনিময় হারের ওপর অব্যাহত চাপ, বৈদেশিক অর্থায়নের কঠোর পরিস্থিতি এবং জলবায়ুজনিত অভিঘাতও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে বলে মনে করে এডিবি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরেছে বিএনপি সরকার, যা এডিবির পূর্বাভাসের চেয়ে ২ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।
গত ১০ জুন বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জিডিপির সাময়িক হিসাব প্রকাশ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএস। তাতে বলা হয়, গেল অর্থবছরে আগের বছরের (২০২৪-২৫ অর্থবছর) চেয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হারে বেড়েছে। গেল ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
প্রতিবছর এপ্রিলে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক প্রকাশ করে এডিবি। পরে বিশ্ব অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে তিনটি আপডেট (সংস্করণ) রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। একটি করা হয় জুলাইয়ে। পরেরটি প্রকাশ করা হয় সেপ্টেম্বরে। আর সর্বশেষটি প্রকাশ করা হয় ডিসেম্বরে। এবারের জুলাইয়ের প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হলো গতকাল বৃহস্পতিবার। পরের তিনটি প্রতিবেদনকে সম্পূরক প্রতিবেদন বলা হয়ে থাকে।
গত ১১ এপ্রিল প্রকাশিত এডিবির এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক এপ্রিল সংস্করণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের ৪ দশমিক ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল। এখন তা কমিয়ে দেয়া হলো।
এর কারণ হিসেবে জুলাই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রপ্তানি আয়ের নেতিবাচক ধারা, বেসরকারি বিনিয়োগের মন্থর গতি, উচ্চ জ্বালানি মূল্য, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং প্রতিকূল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানো হয়েছে।
এপ্রিল সংস্করণে বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল এডিবি।
