×

প্রথম পাতা

মধ্যপ্রাচ্যে আবারো যুদ্ধের আগুন

Icon

মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মধ্যপ্রাচ্যে আবারো যুদ্ধের আগুন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে তীব্র সংঘাত শুরু হয়েছে। গত মঙ্গলবার থেকে ধারাবাহিকভাবে পাল্টাপাল্টি বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে উভয় দেশই। এতে স্থাপনা ধ্বংসসহ হতাহতের ঘটনা ঘটছে। হামলার অনুমতি দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন- সবকিছু দ্রুত ঘটবে। অপরদিকে ট্রাম্পকে বোকা প্রেসিডেন্ট আখ্যা দিয়ে ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ও আকাক্সক্ষা কোনো অবস্থাতেই পূরণ হতে দেয়া হবে না। চূড়ান্ত বিজয় না হওয়া পর্যন্ত পিছু হটবে না দেশটি। ফলে পাল্টাপাল্টি এমন অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে ফের যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠেছে।

মূলত ঘটনার সূত্রপাত গত সোমবার। এদিন ওমান উপকূলের অদূরে হরমুজ প্রণালিতে অন্তত তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। ইরান এই হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করে যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিশোধ হিসেবে গত মঙ্গলবার, বুধবার ও বৃহস্পতিবার ইরানে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, গত ৪৮ ঘণ্টায় তারা ইরানের ১৭০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, এ তীব্র বোমাবর্ষণের উদ্দেশ্য হলো ‘হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও নিরপরাধ বেসামরিক নাবিকদের ওপর হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা আরো দুর্বল করে দেয়া’।

সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এসব হামলায় ইরানের অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগপ্রধান হোসেন কেরমানপোর বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি বহাল থাকা অবস্থায়ই যুক্তরাষ্ট্র ৭ ও ৮ জুলাই ইরানের পাঁচটি প্রদেশে হামলা চালিয়েছে। হামলায় ১৪ জন শহীদ এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন।’ তবে ৯ জুলাই বৃহস্পতিবারও ইরানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এদিন ইরানের একমাত্র বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের এলাকা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। বুশেহর প্রদেশের উপ-গভর্নরের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।

উপ-গভর্নর এহসান জাহানিয়ান বলেন, ‘বুশেহর প্রদেশের বেশ কয়েকটি জায়গায় হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের এলাকা, চোগাদক শহরের একটি সামরিক ঘাঁটি এবং প্রদেশের দক্ষিণে অবস্থিত একটি মাছ ধরার ঘাট আছে। তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।’

এমন চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে প্রতিশোধ নিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরানও। মঙ্গলবারের পর বুধবার রাতে ফের কুয়েত এবং বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটির বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে দেশটি। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি লঙ্ঘন করে যুক্তরাষ্ট্র যে হামলা চালিয়েছে তার জবাব দিতেই কুয়েত এবং বাহরাইনে একাধিকরার হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলায় অংশ নিয়েছে আইআরজিসির নৌ এবং অ্যারোস্পেস বাহিনীর যোদ্ধারা। প্রথম পর্যায়ে কুয়েতের আরিফান এবং আল আল-সালেম ঘাঁটি এবং বাহরাইনের জাফাইর এবং শেখ ইসা ঘাঁটিতে একটি যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অপারেশন পরিচালনা করেছে তারা। যদি শত্রæপক্ষ ফের এমন আগ্রাসন চালায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ঘাঁটিগুলোতেও কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে হুঁশিয়ারি দিয়েছে আইআরজিসি।

চলমান উত্তেজনার মধ্যেও হরমুজ নিয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছে ইরান। বুধবার দেশটি জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ডে নতুন করে মার্কিন হামলা হলে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হবে। ইরান এখন ‘একটির বদলে দুটি’ নীতিতে পাল্টা জবাব দেবে। এর অর্থ হলো, ইরানের যেকোনো একটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হলে, বিপরীতে শত্রæপক্ষের অন্তত দুটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হবে। ইরানের একটি নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা সূত্র দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রেস টিভিকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

মূলত যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে এবং একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তির আলোচনার সুযোগ তৈরি করার লক্ষ্যে গত ১৭ জুন ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছিল। এরপর বৃহস্পতিবারের এই পাল্টাপাল্টি হামলা ছিল সবচেয়ে বড় ধরনের সংঘাত।

এমন পরিস্থিতির মধ্যে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রæথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘এটি গত (মঙ্গলবার) জাহাজে ইরানের বোমাবর্ষণের প্রতিশোধ। যদি এটি আবার ঘটে, তবে পরিস্থিতি আরো অনেক খারাপ হবে!’ এর কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি প্রতিশ্রæতি দিয়েছিলেন এই হামলা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের দিকে যাবে না, বরং এটি হবে ‘খুবই দ্রুতগতির’।

ট্রাম্প মনে করেন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। দেশটির সঙ্গে কোনো চুক্তিতে জড়াতে চান না এবং সামরিক বাহিনীকে ‘কাজ শেষ করার’ তাগিদ দিয়েছেন তিনি। আবার বলেছেন, হামলার অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণাঙ্গ কোনো যুদ্ধে জড়াচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের নাটকীয় অবস্থান স্পষ্ট হলো।

এদিকে নাজুক এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ও যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে পর্দার আড়ালে দিনরাত উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে মধ্যস্থতাকারীরা। কূটনৈতিক আলোচনার সঙ্গে যুক্ত আঞ্চলিক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে বর্তমান সংঘাতটি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে এই নাজুক পরিস্থিতি সামাল দিতে ও যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে আলোচনা চলছে। এ উদ্যোগের নেতৃত্বে আছেন পাকিস্তান ও কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং মিশরের গোয়েন্দাপ্রধান। পাশাপাশি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ও সৌদি আরবের নেতারাও যুক্ত হয়েছেন।

তিনি আরো জানান, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ক্ষুব্ধ। অন্যদিকে তেহরানের ভাষ্য, ওয়াশিংটনই হরমুজ প্রণালি সংক্রান্ত চুক্তি লঙ্ঘন করছে। পাশাপাশি লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নেয়ার ইস্ট পলিসির সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক মাইকেল আইজেনস্ট্যাট মনে করেন, সব পক্ষ এখনো আলোচনার পথে আছে। যা কিছু ঘটছে সেগুলো আলোচনারই একটি অংশ।

উল্লেখ্য, ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে বৃহস্পতিবার তার জন্মস্থান মাশহাদ শহরে শিয়া মুসলিমদের ইমাম রেজার মাজারে দাফন করার কথা ছিল। তবে এ রিপোর্ট লেখার সময় রাত ৯টায় এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গত শনিবার থেকে প্রয়াত খামেনির রাষ্ট্রীয় শোক ও জানাজার আনুষ্ঠানিকতা চলে। ইরানের রাজধানী তেহরান, কোম ও ইরাকে খামেনির জানাজা ও বিদায় মিছিলে লাখ লাখ মানুষের ঢল নামে। বৃহস্পতিবার খামেনির দাফন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে মাশহাদের রাজপথে লাখো মানুষের ঢল নামে। এ সময় শোকে কাতর জনতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চরম প্রতিশোধ নেয়ার দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। মিছিলে অংশ নেয়া নারীদের হাতে ‘ট্রাম্পকে হত্যা করো’ লেখা প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। এ সময় জনতা স্লোগান দেন, ‘সর্বোচ্চ নেতার রক্তের কসম, ট্রাম্প, আমরা তোমাকে মেরেই ছাড়ব।’

এমন আবহে বিশ্ব ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে শুধু মধ্যপ্রাচ্যই নয়, পরোক্ষভাবে ভুগছে পুরো বিশ্বই। ফলে যুদ্ধ বন্ধে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আলোচনার বিকল্প নেই।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সেনাবাহিনীর সহায়তায় সাজেক ছাড়লেন ৩১১ পর্যটক

সেনাবাহিনীর সহায়তায় সাজেক ছাড়লেন ৩১১ পর্যটক

দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ চায় এনসিপি

দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ চায় এনসিপি

বন্যায় বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম, জেলা প্রশাসনের সব ছুটি বাতিল

বন্যায় বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম, জেলা প্রশাসনের সব ছুটি বাতিল

বৃষ্টির দিনে ঘরেই তৈরি করুন পারফেক্ট খিচুড়ি

বৃষ্টির দিনে ঘরেই তৈরি করুন পারফেক্ট খিচুড়ি

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App