স্পেনিশ ঝড়ে কাত বেলজিয়াম
মুহাম্মদ রুহুল আমিন
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বকাপের শুরুতে কেপ ভার্দের বিপক্ষে ড্রয়ের পর স্পেনকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ছোট ছোট পাসে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার তাদের ঐতিহ্যবাহী ফুটবল কতটা কার্যকর- তা নিয়েও শুরু হয়েছিল বিতর্ক। সমালোচনার সেই ঝড়কে শক্তিতে পরিণত করেছে লা রোহা। ম্যাচের পর ম্যাচ নিজেদের পরিকল্পনা আরো পরিণত করেছে তারা। সেই ধারাবাহিকতার আরেকটি প্রমাণ মিলল কোয়ার্টার ফাইনালে। বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে হারিয়ে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছে স্পেন। তবে এই জয় শুধু একটি গোলের নয়; এটি কৌশল, ধৈর্য, বেঞ্চের শক্তি এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার এক অসাধারণ উদাহরণ।
লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামে শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় স্পেন। বল দখলে ছিল ৬৫ শতাংশের বেশি সময়। ১৭টি শটের ৮টিই ছিল লক্ষ্যে। বিপরীতে বেলজিয়াম পুরো ম্যাচে মাত্র পাঁচটি শট নিতে পারে, যার দুটি ছিল অন টার্গেটে। পাস, পজেশন, আক্রমণ তৈরি ও সুযোগ সৃষ্টিতে প্রতিপক্ষকে প্রায় পুরো ম্যাচেই ছাপিয়ে যায় স্পেন।
৪-২-৩-১ ফরমেশনে লুইস দে লা ফুয়েন্তের পরিকল্পনা ছিল স্পষ্ট- রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইসের মাধ্যমে মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ, লামিনে ইয়ামালের গতিকে কাজে লাগিয়ে দুই প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ তৈরি এবং ছোট ছোট পাসে বেলজিয়ামের রক্ষণে ফাঁক বের করা। অন্যদিকে বেলজিয়ামও একই ফরমেশনে খেললেও তাদের পরিকল্পনা ছিল মূলত কাউন্টার অ্যাটাক নির্ভর। কিন্তু স্পেনের বলের নিয়ন্ত্রণ ও প্রেসিংয়ের কারণে সেই পরিকল্পনা খুব একটা কাজে আসেনি।
৩০ মিনিটে স্পেনের আধিপত্যের প্রতিফলন আসে স্কোরলাইনে। ইয়ামাল-পোরো-ওলমোর দারুণ সমন্বিত আক্রমণে দানি ওলমোর শট দুর্দান্তভাবে ঠেকান থিবো কোর্তোয়া। তবে ফিরতি বলে ফাবিয়ান রুইসের শট ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে জালে জড়ায়। চলতি বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোলেই দলকে এগিয়ে দেন এই মিডফিল্ডার।
কিন্তু ম্যাচে ফিরে আসতে বেশি সময় নেয়নি বেলজিয়াম। ৪১ মিনিটে টিমোথি কাস্তানের নিখুঁত ক্রস থেকে চার্লস ডি কেটেলারের দুর্দান্ত হেডে সমতা ফেরে। এই গোলেই শেষ হয় স্পেন গোলরক্ষক উনাই সিমনের বিশ্বকাপে টানা ৬৫০ মিনিট গোল না খাওয়ার অবিশ্বাস্য রেকর্ড। চলতি আসরে এটিই ছিল স্পেনের প্রথম গোল হজম।
প্রথমার্ধে সমতায় ফিরলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছাড়েনি স্পেন। দ্বিতীয়ার্ধে আরো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে তারা। ইয়ামাল একের পর এক সুযোগ তৈরি করেন, ওলমো ও ওইয়ারসাবালও বেলজিয়ামের রক্ষণকে ব্যস্ত রাখেন। কিন্তু প্রতিবারই দেয়াল হয়ে দাঁড়ান থিবো কোর্তোয়া। কয়েকটি নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে ম্যাচে বেলজিয়ামকে টিকিয়ে রাখেন রিয়াল মাদ্রিদের এই গোলরক্ষক। তবে ৭২ মিনিটে চোট পেয়ে কান্নাভেজা চোখে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন কোর্তোয়া। ম্যাচের সবচেয়ে বড় মোড়ও ঘুরে যায় তখনই। তার বদলি হিসেবে নামা সেনে লামেন্স শুরুতে আত্মবিশ্বাসী থাকলেও শেষ পর্যন্ত চাপ সামলাতে পারেননি।
এদিকে ম্যাচের শেষ ভাগে আবারো নিজের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র ব্যবহার করেন স্পেন কোচ। পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ ষোলোয় বদলি নেমে জয়সূচক গোল করা মিকেল মেরিনোকে ৮৬ মিনিটে মাঠে নামান তিনি। মাত্র দুই মিনিট পরই সেই সিদ্ধান্তের সুফল পায় স্পেন। ৮৮ মিনিটে তরুণ ডিফেন্ডার পাউ কুবারসির দূরপাল্লার শট লামেন্স ঠিকভাবে তালুবন্দি করতে পারেননি। বল হাত ফসকে সামনে চলে আসতেই সুযোগ লুফে নেন মেরিনো। সহজ টোকায় জালে বল পাঠিয়ে আবারো স্পেনের ত্রাতায় পরিণত হন আর্সেনাল মিডফিল্ডার। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে টানা দুই ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে জয়সূচক গোল করে তিনি প্রমাণ করলেন, বেঞ্চ থেকেও ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়া যায়।
স্পেনের জয়ের অন্যতম বড় কারণ ছিল তাদের ধৈর্য। সমতায় ফেরার পরও তারা নিজেদের পরিকল্পনা বদলায়নি। অযথা লং বল বা তাড়াহুড়ো না করে ছোট পাস, পজিশনাল ফুটবল এবং ক্রমাগত চাপ ধরে রেখেছে। সেই চাপই শেষ পর্যন্ত বেলজিয়ামের রক্ষণকে ভুল করতে বাধ্য করেছে।
অন্যদিকে বেলজিয়ামের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল আক্রমণে কার্যকারিতার অভাব। কেভিন ডি ব্রুইনা, জেরেমি দোকু কিংবা পরে নামা রোমেলু লুকাকু- কেউই ম্যাচে প্রভাব ফেলতে পারেননি। শেষ আধা ঘণ্টা খেলেও লুকাকু গোলমুখে একটি শটও নিতে পারেননি। পুরো ম্যাচে মাত্র পাঁচবার বল স্পর্শ করেন তিনি। কাউন্টার অ্যাটাকের ওপর নির্ভর করা বেলজিয়াম স্পেনের উচ্চমানের প্রেসিং ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে।
এই হারের মধ্য দিয়ে বেলজিয়ামের তথাকথিত ‘সোনালি প্রজন্ম’-এর বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নও কার্যত শেষ হয়ে গেল। থিবো কোর্তোয়া, কেভিন ডি ব্রুইনা ও রোমেলু লুকাকুর আরেকটি বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটল।
অন্যদিকে স্পেনের সামনে এখন আরো কঠিন চ্যালেঞ্জ। সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ ফ্রান্স। এমবাপ্পে, দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে ও দেজিরে দুয়ের আক্রমণভাগকে সামলাতে হবে লা রোহাকে। অনেক ফুটবল বিশ্লেষকের চোখে এটিই এবারের বিশ্বকাপের ‘আগাম ফাইনাল’। তবে টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকা স্পেনও আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। এই দলটি প্রমাণ করেছে, শুধু তারকানির্ভর নয়- পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা, ধৈর্য এবং বেঞ্চের গভীরতাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
কোয়ার্টার ফাইনালের এই লড়াই তাই শুধু একটি জয় নয়; এটি স্পেনের ফুটবল দর্শনেরও জয়। যে দর্শনে বলের নিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য, কৌশলগত পরিবর্তন এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেয়। আর সেই কারণেই বলা যায়- বেলজিয়াম হারেনি শুধু মেরিনোর গোলে, হারেছে স্পেনের পরিণত কৌশল, পরিকল্পনা ও অবিচল ধৈর্যের কাছেই।
