×

প্রথম পাতা

মৃত্যু বেড়ে ৪৪, বন্যার কবলে দেশের সাত জেলা

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মৃত্যু বেড়ে ৪৪, বন্যার কবলে দেশের সাত জেলা

কয়েকদিন ধরে টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ-এই সাত জেলা বন্যার কবলে পড়েছে। প্লাবিত হয়েছে এসব জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে পাহাড় ধসের ঘটনাও ঘটেছে। সৃষ্ট এ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১০ লাখের বেশি মানুষ। ইতোমধ্যে বন্যা ও পাহাড় ধসে ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এই তথ্য জানিয়েছে।

শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ প্রতিবেদন বলছে, এসব জেলার ৫৮টি উপজেলার ৩৮৬টি ইউনিয়ন ও ১১টি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে। সাত জেলায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার। এদিকে বন্যাকবলিত এলাকায় নিরাপদ পানি ও খাবারের অভাব দেখা দিয়েছে। বন্যার্ত মানুষের মাঝে এখন পর্যন্ত খাদ্য উপকরণ সরবরাহ করতে পারেনি সরকার। তবে ত্রাণ বরাদ্দের কথা জানিয়েছে সরকার।

এদিকে সাঙ্গু, খোয়াই, মনু ও কুশিয়ারা নদীর ৬টি জেলার ৬টি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়াও বরিশাল ও খুলনাসহ দেশের প্রায় সব অঞ্চলে টানা কয়েকদিন ধরে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। উপকূলীয় নদ-নদীতে পানি বেড়েছে। ফলে ফসলি ক্ষেত ও নি¤œ এলাকা ডুবে গেছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বাসিন্দারা। তুমুল বৃষ্টিতে ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন লোকজন। পাশাপাশি ক্ষতির মুখে পড়েছে নানা জাতের ফসল।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ভারতের মধ্য উত্তর প্রদেশ এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত লঘুচাপটি দুর্বল হয়ে মৌসুমি অক্ষের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। মৌসুমি বায়ুর বর্ধিতাংশের অক্ষ পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় বিরাজমান আছে। এখন বর্ষা ঋতুর আষাঢ়ের শেষ। এই সময়ে মুষলধারে বৃষ্টি ও বন্যা স্বাভাবিক। তার ওপরে লঘুচাপ। এর প্রভাবেই সারাদেশে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে।

ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বন্যা ও পাহাড় ধসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজারে। সেখানে পাহাড়ধস ও বন্যায় ২৩ জন মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে ১০ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিক। কক্সবাজারে আহত হয়েছেন ২৪ জন। বিভাগীয় শহর চট্টগ্রামে বন্যা ও দেয়াল ধসের ঘটনায় ১১ জন নিহত এবং ১২ জন আহত হয়েছে। পার্বত্য জেলা বান্দরবানে ঢলের পানিতে ভেসে ও পাহাড় ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ৬ জন; আহতের সংখ্যা ২। আরেক পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটিতে মৃত্যু হয়েছে ৩ জনের। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা মৌলভীবাজারে বন্যায় ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায়। জেলার ১৬টি উপজেলায় আংশিক ও পূর্ণ জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় ৭ লাখ ৫৯ হাজার ৫৩০ জন মানুষ ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।

চট্টগ্রামে পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি। এরপরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কক্সবাজারে, যেখানে ১০টি উপজেলার ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৭ জন মানুষ বন্যাকবলিত এবং ৩৯ হাজার ৫০৬টি পরিবার পানিবন্দি।

অন্যান্য জেলার মধ্যে খাগড়াছড়ির ৯ উপজেলায় ২৭ হাজার ২২০ জন, রাঙ্গামাটির ৯ উপজেলায় ৩ হাজার ৫২৪ জন, বান্দরবানের ৭ উপজেলায় ৮ হাজার ৩৫০ জন, মৌলভীবাজারের চার উপজেলায় ৩৮ হাজার ১৭২ জন এবং হবিগঞ্জের তিন উপজেলায় ২৮ হাজার ১৪০ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

হঠাৎ উপচে পড়া পানি ও পাহাড়ি ঢলে ঘরবাড়ি হারিয়ে জীবন বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে হাজারো মানুষ। সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি আশ্রয় দিতে মোট ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ইতোমধ্যে ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু মানুষ এখনো নিজের জলমগ্ন ভিটেমাটি আঁকড়ে পড়ে আছেন। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে ঠাঁই নেয়া বিপন্ন মানুষের মাঝে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি মানবিক সহায়তা জোরদার করার কথা বলা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় গত ৭ জুলাই দেশের ৬৪টি জেলার জেলা প্রশাসকদের অনুকূলে মোট ৬ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন চাল এবং ৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা নগদ বরাদ্দ দেয়ার কথা বলেছে। এর মধ্যে দুর্গত এই ৭টি জেলায় বিশেষ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জরুরি ত্রাণ পাঠানো হয়েছে।

বন্যাকবলিত জেলাগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ৭০০ মেট্রিক টন চাল ও ৪০ লাখ টাকা নগদ এবং কক্সবাজারে ৪৫০ মেট্রিক টন চাল ও ৩০ লাখ টাকা নগদ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

এ ছাড়া পার্বত্য তিন জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের প্রতিটিতে ৪০০ মেট্রিক টন করে চাল এবং ২০ লাখ করে টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মৌলভীবাজারে ২০০ মেট্রিক টন চাল ও ১০ লাখ টাকা এবং হবিগঞ্জে ১০০ মেট্রিক টন চাল ও ৫ লাখ টাকা ত্রাণ কার্য (নগদ) হিসেবে বরাদ্দ করা হয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্গত এলাকায় শুকনো খাবার, চাল ও নগদ টাকা বিতরণ শুরু হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অনেক জায়গাতে সরকারি-বেসরকারি সাহায্য পৌঁছতে বেগ পেতে হচ্ছে। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ এখন পানি কমার অপেক্ষায় দিন গুনছেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের ত্রাণ কর্মসূচি, জরুরি সাড়াদান সমন্বয় অধিশাখার যুগ্মসচিব সেখ ফরিদ আহমেদ গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, ওই সব (বন্যাক্রান্ত) জেলাগুলোর সঙ্গে আমাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ আছে। ওখানে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে শুরু করে স্থানীয় যারা জনপ্রতিনিধি আছেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং আমাদের এনজিও কর্মী যারা আছেন, সবার সঙ্গে যোগাযোগ করে সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। আর আমরা মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দের যে বিষয়গুলো আছে এগুলো সব জায়গায় মোটামুটি জেলাপ্রশাসনের চাহিদামতো দিয়ে রেখেছি। এতে কোনো সমস্যা নেই। অর্থাৎ জেলা প্রশাসন এবং আমাদের মিনিস্ট্রি, দুই পক্ষেরই সার্বিক সহযোগিতা আছে। অন্যান্য যারা জনপ্রতিনিধি আছেন, স্থানীয় এবং যারা সমাজকর্মী যারা আছেন, সবার সার্বিক সহযোগিতায় মোটামুটি উত্তরণের চেষ্টা করা হচ্ছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বুলেটিনে বলা হয়েছে, পর্যবেক্ষণাধীন স্টেশনসমূহের মধ্যে ৪টি নদীর ৬টি জেলার ৬টি পয়েন্টে - সাঙ্গু নদীর বান্দরবান ও দোহাজারী; খোয়াই নদীর বাল্লা ও হবিগঞ্জ; মনু নদী মৌলভীবাজার; কুশিয়ারা নদী মারকুলি (সুনামগঞ্জ) ও ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট) স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগে এবং উজানে ভারতের ত্রিপুরা প্রদেশে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। একইসঙ্গে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে এবং তৎসংলগ্ন উজানে ভারতের মেঘালয়, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে।

পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় চট্টগ্রাম বিভাগের হালদা, সাঙ্গু, মুহুরী ও ফেনী নদী, ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার মুহুরী, সেলোনিয়া, হালদা ইত্যাদি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এতে নদীসংলগ্ন নি¤œাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া ল²ীপুর ও নোয়াখালী জেলার নদীসংলগ্ন নি¤œাঞ্চল কোথাও কোথাও এ সময়ে সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।

সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার সারিগোয়াইন, যাদুকাটা, সোমেশ্বরী ও ভুগাই-কংস নদী, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে কিছু কিছু স্থানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদীসংলগ্ন নি¤œাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। কুশিয়ারা নদীসংলগ্ন নি¤œাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হতে পারে এবং সুরমা নদীসংলগ্ন নি¤œাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

৩৯ দিনের বিশ্বকাপে ফিফার রাজস্ব ২ লাখ কোটি টাকার বেশি

৩৯ দিনের বিশ্বকাপে ফিফার রাজস্ব ২ লাখ কোটি টাকার বেশি

কুমার শানুর ছেলে করোনায় আক্রান্ত

কুমার শানুর ছেলে করোনায় আক্রান্ত

‘শেখ হাসিনা যেখানেই আত্মসমর্পণ করুক, তাকে আগে কারাগারে যেতে হবে’

‘শেখ হাসিনা যেখানেই আত্মসমর্পণ করুক, তাকে আগে কারাগারে যেতে হবে’

বিপৎসীমা ছাড়াল সুরমার পানি, প্রস্তুত ১৩১১ আশ্রয়কেন্দ্র

বিপৎসীমা ছাড়াল সুরমার পানি, প্রস্তুত ১৩১১ আশ্রয়কেন্দ্র

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App