×

প্রথম পাতা

সুইস ঘড়ি থামল আকাশি ঝড়ে

Icon

মুহাম্মদ রুহুল আমিন

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সুইস ঘড়ি থামল আকাশি ঝড়ে

ম্যাচের ঘড়িতে তখন ১১২ মিনিট। কানসাস সিটির গ্যালারিজুড়ে নিস্তব্ধতা আর উৎকণ্ঠা। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে জয় নিশ্চিত করতে না পারা আর্জেন্টিনা ধীরে ধীরে টাইব্রেকারের শঙ্কার দিকে এগোচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই যেন দৃশ্যপটে হাজির হন হুলিয়ান আলভারেস। বক্সের বাইরে থেকে তার বাঁকানো নিখুঁত শট মুহূর্তেই ভেঙে দেয় সুইজারল্যান্ডের দুর্ভেদ্য রক্ষণ। আর শেষ বাঁশি বাজার আগমুহূর্তে লাউতারো মার্তিনেজের নিশ্চিত করা তৃতীয় গোল রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের পর্দা নামায়। ৯০ মিনিটে ১-১ সমতার পর অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ গোলের জয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠে গেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।

স্কোরশিটে গোল নেই লিওনেল মেসির নামের পাশে। তবু পুরো ম্যাচে সবচেয়ে প্রভাবশালী ফুটবলারদের একজন ছিলেন তিনিই। প্রথম গোলের অ্যাসিস্ট, আক্রমণের ছন্দ তৈরি, প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ব্যস্ত রাখা- সব মিলিয়ে অধিনায়ক আবারো প্রমাণ করলেন, গোলই একজন ফুটবলারের একমাত্র পরিচয় নয়। কঠিন মুহূর্তে দলকে নেতৃত্ব দেয়ার নামও মেসি।

তবে এই জয় কোনোভাবেই সহজ ছিল না। বরং এবারের নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি হয়ে উঠেছিল সুইজারল্যান্ড। শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার মানসিকতা দিয়ে মুরাত ইয়াকিনের দল বারবার অস্বস্তিতে ফেলেছে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। একজন কম নিয়েও সুইসরা যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তা এই ম্যাচকে বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় কোয়ার্টার ফাইনালে পরিণত করেছে।

ম্যাচের শুরু থেকেই অবশ্য ছন্দে ছিল আর্জেন্টিনা। মাঝমাঠে রদ্রিগো ডি পল, এনজো ফার্নান্দেজ ও ম্যাক অ্যালিস্টারের পাসিং ফুটবলে বলের দখল নিজেদের কাছে রাখে স্কালোনির দল। সুইজারল্যান্ডও শুরু থেকেই নিচু ব্লকে রক্ষণ সাজিয়ে অপেক্ষা করছিল ভুলের।

প্রথম বড় সুযোগ থেকেই আসে কাক্সিক্ষত গোল। দশম মিনিটে মেসির নেয়া নিখুঁত কর্নার থেকে দারুণ হেডে গ্রেগর কোবেলকে পরাস্ত করেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের দ্রুত এগিয়ে দেয়া এই গোল ম্যাচের গতি বদলে দেয়। গোলের পরও আক্রমণ থামায়নি আর্জেন্টিনা। আলভারেসের গতিময় দৌড়, মেসির ড্রিবল আর ডি পলের দূরপাল্লার পাসে বারবার চাপে পড়ে সুইস রক্ষণ। কিন্তু কোবেলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ এবং আকাঞ্জি-এলভেদিদের দৃঢ় রক্ষণে ব্যবধান বাড়ানো সম্ভব হয়নি।

প্রথমার্ধে পিছিয়ে থাকলেও পরিকল্পনা বদলায়নি সুইজারল্যান্ড। দ্বিতীয়ার্ধে আরো আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে তারা। আর্জেন্টিনার রক্ষণে চাপ বাড়তে থাকে। গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ টানা দুটি দুর্দান্ত সেভ করে দলকে রক্ষা করলেও ৬৭তম মিনিটে আর পারেননি। বাঁ দিক দিয়ে দারুণ আক্রমণে উঠে ডান পায়ের কোনাকুনি শটে দান এনদোয়ে সমতায় ফেরান সুইজারল্যান্ডকে। গোল হজমের পর মুহূর্তেই বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। আত্মবিশ্বাস ফিরে পায় সুইসরা, আর আর্জেন্টিনা পড়ে যায় চাপে।

কিন্তু সেই উচ্ছ¡াস বেশিক্ষণ টেকেনি। মাত্র পাঁচ মিনিট পরই বড় ধাক্কা খায় সুইজারল্যান্ড। ভিএআরের পর ব্রেল এমবোলো দ্বিতীয় হলুদ কার্ড এরপর লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে ৭২তম মিনিট থেকেই ১০ জন নিয়ে খেলতে হয় ইয়াকিনের দলকে। সংখ্যাগত সুবিধা পেয়ে পুরোপুরি আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা। একের পর এক কর্নার, ক্রস ও দূরপাল্লার শটে সুইস রক্ষণে ঝড় তোলে তারা।

তবু গোল যেন অধরাই থেকে যায়। মেসির একটি শট অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়, আরেকটি প্রচেষ্টা কোবেল দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন। আলভারেস, লাউতারো এবং

বদলি খেলোয়াড়দের আক্রমণও প্রতিহত করে সুইস রক্ষণ। একজন কম নিয়ে খেলেও প্রতিটি বলের জন্য জীবনপণ লড়াই করে ইউরোপের দলটি। নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে স্কোরবোর্ডে তখন ১-১। ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

সেই মুহূর্তে অনেকের মনেই ফিরে আসে ২০১৪ বিশ্বকাপের স্মৃতি। সেবারও শেষ ষোলোতে সুইজারল্যান্ডকে হারাতে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল আর্জেন্টিনাকে। আনহেল দি মারিয়ার সেই জয়সূচক গোল আজ ইতিহাস। এবার প্রশ্ন ছিল- দি মারিয়া নেই, নতুন নায়ক কে হবেন?

অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেও সুইজারল্যান্ডের রক্ষণ ভাঙা সহজ হয়নি। একজন কম নিয়ে খেললেও নিজেদের অর্ধে ঘন রক্ষণ সাজিয়ে আর্জেন্টিনার প্রতিটি আক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা চালায় তারা। মেসি মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ সাজাচ্ছেন, ডি পল ও এনসো ফার্নান্দেজ বলের জোগান দিচ্ছেন, দুই প্রান্ত দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন মলিনা ও তাগলিয়াফিকো। কিন্তু শেষ পাস কিংবা শেষ শটে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন গ্রেগর কোবেল ও সুইস ডিফেন্ডাররা। ধীরে ধীরে ম্যাচ যেন টাইব্রেকারের দিকেই এগোচ্ছিল।

কিন্তু বড় দলগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো- তারা সুযোগের জন্য অপেক্ষা করতে জানে। আর্জেন্টিনাও সেটিই করেছে। ১১২তম মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বদলি মানুয়েল লোপেজের কাটব্যাক থেকে বক্সের বাইরে বল পেয়ে হুলিয়ান আলভারেস ডান পায়ের দারুণ বাঁকানো শটে বল জড়িয়ে দেন জালে। কোবেলের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া সেই শট মুহূর্তেই বদলে দেয় পুরো ম্যাচের চিত্র। দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে তোলা সুইজারল্যান্ডের প্রতিরোধ এক ঝটকায় ভেঙে পড়ে, আর কানসাস সিটির গ্যালারিতে শুরু হয় আর্জেন্টাইন সমর্থকদের উচ্ছ¡াস।

গোল হজমের পর আর হারানোর কিছু ছিল না সুইজারল্যান্ডের। শেষ কয়েক মিনিটে তারা সবাইকে তুলে আনে আক্রমণে। তবে সেই ঝুঁকির সুযোগ কাজে লাগায় আর্জেন্টিনা। অতিরিক্ত সময়ের যোগ করা মিনিটে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে থিয়াগো আলমাদার শট কোবেল ফিরিয়ে দিলেও ফিরতি বলে সবার আগে পৌঁছে যান বদলি ফরোয়ার্ড লাউতারো মার্তিনেজ। সহজ ফিনিশে ব্যবধান ৩-১ করে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জয় নিশ্চিত করেন তিনি। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠজুড়ে শুরু হয় আকাশি-সাদা উৎসব।

গোল না পেলেও ম্যাচের অন্যতম নায়ক ছিলেন লিওনেল মেসি। প্রথম গোলটি তার কর্নার থেকেই এসেছে। আক্রমণের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ছিল তার উপস্থিতি। সুইস ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রেখে সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করেছেন, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন এবং কঠিন সময়ে দলের মানসিক শক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তাই স্কোরশিটে নাম না থাকলেও ম্যাচের গল্পে মেসি ছিলেন কেন্দ্রীয় চরিত্র।

ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনা অধিনায়ক বলেন, আমরা জানতাম ম্যাচটি কঠিন হবে। সুইজারল্যান্ড আমাদের ভীষণ চাপে ফেলেছে। কিন্তু এই দল কখনো বিশ্বাস হারায় না। আমরা শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছি, আর সেটিই আমাদের জিতিয়েছে।

তবে এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় শিক্ষা পরিসংখ্যান নয়, আর্জেন্টিনার মানসিকতা। শুরুতে এগিয়ে গিয়েও সমতায় ফিরে আসা, তারপর প্রতিপক্ষ ১০ জনে নেমে গেলেও অধৈর্য না হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত একই ছন্দে আক্রমণ চালিয়ে যাওয়া- সব মিলিয়ে এটি ছিল ধৈর্য, বিশ্বাস ও পরিকল্পনার জয়। অন্যদিকে, হারলেও সুইজারল্যান্ড প্রমাণ করেছে কেন তারা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, নির্ভীক ফুটবল এবং একজন কম নিয়ে প্রায় ৫০ মিনিট লড়াই- সবকিছুই প্রশংসার দাবিদার। তবে ব্রেল এমবোলোর দ্বিতীয় হলুদ কার্ডে লাল কার্ড দেখাই শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়।

সুইসদের বিপক্ষে এই জয় শুধু শেষ চারে ওঠার গল্প নয়; এটি বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের চরিত্রেরও প্রতিচ্ছবি। যে দল প্রতিকূলতায় ভেঙে পড়ে না, সুযোগের অপেক্ষায় থাকে এবং সময় এলে শেষ আঘাতটি হানতে জানে- শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্নে সেই আর্জেন্টিনা আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল। আগামী লড়াই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে, কিন্তু কানসাস সিটির রাত বলে দিল, এই দলকে হারাতে হলে শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

বিশ্বের অন্যতম সুন্দর ৩ প্রজাতির পাখি

বিশ্বের অন্যতম সুন্দর ৩ প্রজাতির পাখি

বিদায় নিয়ে সাদিক কায়েমের আবেগঘন স্ট্যাটাস

বিদায় নিয়ে সাদিক কায়েমের আবেগঘন স্ট্যাটাস

১০০ কোটি ডলার আয়ের ইতিহাস গড়লো ‘মাইকেল’

১০০ কোটি ডলার আয়ের ইতিহাস গড়লো ‘মাইকেল’

বন্যার পানিতে যেসব ভুল কখনো করবেন না

বন্যার পানিতে যেসব ভুল কখনো করবেন না

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App