×

প্রথম পাতা

টানা বৃষ্টিতে ডুবল ঢাকা, নগরবাসীর চরম দুর্ভোগ

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

টানা বৃষ্টিতে ডুবল ঢাকা, নগরবাসীর চরম দুর্ভোগ

কয়েক ঘণ্টা ধরে টানা তুমুল বৃষ্টিতে কার্যত পানিতে তলিয়ে গেছে রাজধানী ঢাকার বেশিরভাগ এলাকা। প্রধান সড়ক থেকে অলিগলিতে পানি থইথই করেছে। বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি জমে থাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। অফিসগামী কিংবা অফিস থেকে বাসায় ফেরা মানুষ, শিক্ষার্থী ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। নগরীর বেশিরভাগ স্কুলের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। এর মধ্যে বৃষ্টির কারণে সড়কে গণপরিবহনের সংখ্যাও কমে গেছে। চালকদের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, যানবাহন বিকল হয়ে পড়া এবং ব্যবসায় মন্দা- সব মিলিয়ে সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসেই বিপাকে পড়েছেন রাজধানীর বাসিন্দারা। রাজধানীতে গতকাল রবিবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হওয়ার তথ্য দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এমন বৃষ্টিপাত আরো দুদিন অব্যাহত থাকার আভাস দিয়েছে সংস্থাটি।

এদিকে জলজট নিরসন এবং উপড়ে পড়া গাছ অপসারণ করে সড়ক সচল রাখতে ভোর থেকেই মাঠে কাজ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ওয়ার্ডভিত্তিক ইমারজেন্সি রেসপন্স টিম।

মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের উপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় বিরাজমান আছে। এর প্রভাবে রাজধানী ছাড়াও দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে রবিবার। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১০০ থেকে ১৮৭ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। সর্বোচ্চ বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে পটুয়াখালীতে ১৮৭ মিলিমিটার।

মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বেশ কয়েকদিন ধরেই থেমে থেমে চলছে বৃষ্টি। শনিবার রাত থেকে বৃষ্টি আরো বাড়ে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত টানা তুমুল বৃষ্টিতে প্রায় পুরো ঢাকা নগরী পানিতে তলিয়ে গেছে। মালিবাগ, মৌচাক, কাকরাইল, ফকিরাপুল, সচিবালয় এলাকা, ধানমন্ডি, জিগাতলা, সাইন্সল্যাব, এলিফ্যান্ট রোড, মতিঝিল, খিলগাঁও, বনানী, খিলক্ষেত, মিরপুর ১০ নম্বর, কাজীপাড়া, নিউমার্কেট, পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার প্রধান সড়ক থেকে গলির ভেতর পর্যন্ত পানি জমে গেছে। ফলে ঘর থেকে বের হওয়া থেকে শুরু করে কর্মস্থলে পৌঁছানো এবং কর্মস্থল থেকে ঘরে ফেরা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়েছে নগরবাসীকে। রাস্তায় গণপরিবহন তেমন ছিল না। এতে ভোগান্তি আরো বাড়ে।

মিরপুরের বাসিন্দা মাহফুজুর রহমান বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তার অফিস বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউতে। তিনি বলেন, মিরপুর থেকে প্রতিদিনের মতো মোটরসাইকেল নিয়ে অফিসের উদ্দেশে বের হয়েছিলেন। কিন্তু বনানীর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র?্যাম্পের কাছে এসে দেখেন রাস্তায় হাঁটুসমান পানি। সেই পানির মধ্যেই তার বাইক বিকল হয়ে যায়। এরপর আর স্টার্টই নেয়নি।

তিনি বলেন, ‘বাধ্য হয়ে বাকি পথ মোটরসাইকেল ঠেলে হেঁটে অফিসে যেতে হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে অফিসে পৌঁছাতে পারেননি। সময় ও শ্রম- দুটোই অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।

অন্যদিকে, গ্রীন রোডের বাসিন্দা শামীমা নাসরিন একটি আন্তর্জাতিক এনজিওতে কর্মরত। তার অফিস গুলশানে। তিনি বলেন, ‘সকালে ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় গিয়ে দেখি বাসার সামনের রাস্তা পানিতে তলিয়ে গেছে। ভাবছিলাম কীভাবে অফিসে যাব। তখনই অফিসের গ্রুপে জানানো হয়, আজকের জন্য ওয়ার্ক ফ্রম হোম চালু করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এতে অনেকটা স্বস্তি পেয়েছি। কারণ আজ ঢাকার প্রায় সব সড়কের অবস্থাই খুব খারাপ। অনেক জায়গায় পানি জমে আছে। তাই বাসা থেকে বের না হওয়াটাই ভালো হয়েছে। বাসাবোর বাসিন্দা সাংবাদিক গাজী আব্দুল হাদী বলেন, তুমুল বৃষ্টির কারণে সকালে তার মতিঝিলের অফিসে যেতে পারেননি। দুপুরে বের হয়েও আবার বাসায় ফিরেন।

বৃষ্টি হলেই পরিবহন চালকদের বাড়তি ভাড়া আদায় এক স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম রিকশা ও সিএনজি চালকরা। প্রতিনিয়তই তাদের সঙ্গে যাত্রীদের ভাড়া নিয়ে বাগবিতণ্ডা চোখে পড়ে। বৃষ্টি হলে তা যেন আরো বেড়ে যায়। এই নিয়েই ক্ষোভ প্রকাশ করেন যাত্রীরা।

মালিবাগের বাসিন্দা সাগর বলেন, শান্তিবাগের বাসা থেকে মৌচাকের অফিসে যাওয়ার জন্য রিকশা পাচ্ছিলেন না। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর একটি অটোরিকশা পেলেও মাত্র ২০ টাকার ভাড়া ৪০ টাকা দিতে হয়েছে। মিরপুরের বাসিন্দা আফজাল হোসেন বলেন, মিরপুর ২ নম্বর মসজিদ মার্কেট থেকে ১০ নম্বর মেট্রো স্টেশনের ভাড়া ৩০ থেকে ৪০ টাকা। তাকে গুণতে হয়েছে ১০০ টাকা। তিনি

বলেন, অবাক হয়ে যাই আমি রিকশাওয়ালাদের কারবার দেখলে। বৃষ্টি হচ্ছে ঠিক আছে, তাদের যেমন সমস্যা আমাদেরও তেমন সমস্যা। তাই বলে ভাড়া চাওয়ার কোনো মাত্রা থাকবে না! তারা যা ইচ্ছা তাই চাইছে। এই বৃষ্টি-বাদলের দিনে অফিস যেতে এভাবেই অনেক খরচ বেড়ে যায়। যদি সম্ভব হতো তাহলে বেরই হতাম না।

জিগাতলার বাসিন্দা সাব্বির আহমেদের অফিস মতিঝিলে। তিনি বলেন, ‘বাসা থেকে বের হয়ে আর বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার মতো অবস্থা নেই। হাঁটুর ওপরে পানি। রিকশা নিয়ে যে যাব, তাও পারছি না। ৪০ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকেও খালি রিকশা পেলাম না। ১০টায় অফিস, কিন্তু দেরি হয়ে যাচ্ছে। পরে হেঁটেই রওনা দেব ভেবেছি। তখন দেখি একটা ভ্যানে পারাপার করছে। ডাকছে পানি পার, পানি পার। পরে ভ্যানে চড়ে ৫০ টাকা দিয়ে বাসস্ট্যান্ডে আসলাম। ভ্যানে বসে শার্টটা ছাতা দিয়ে শুকনা রাখতে পেরেছি, কিন্তু প্যান্ট ভিজে গেছে। এরপর মতিঝিলে এসে দেখি এখানেও পানি। পরে রিকশা পেয়ে অফিসে এলাম। এই হচ্ছে আমার সপ্তাহের শুরু।

বৃষ্টিতে শুরু হওয়া জলাবদ্ধতার কারণে কেবল যাত্রীরাই নয়, ভোগান্তিতে পড়েছেন যানবাহনের চালকরাও। অটোরিকশা চালক মো. মজিদ বলেন, ‘রিকশা নিয়ে বের হয়েছি সকালে। ভাবলাম আজকে বৃষ্টি আছে, কিছু টাকা বেশি পাওয়া যাবে। কিন্তু পানিতে ডুবে রিকশাই বন্ধ হয়ে গেছে। এখন যাচ্ছি মেকারের কাছে। আজকে সারাদিনের টাকাটাই মাইর গেল।’

সিএনজি চালক আব্দুর রহমান বলেন, ‘আমাদের তো কাজ করেই যেতে হবে, যতই বৃষ্টি হোক। একদিন বসে থাকলেই আমাদের লস। তাই বৃষ্টির মধ্যেই বের হয়েছি। যদিও পানিতে গাড়ি চালানো কঠিন। কারণ বুঝতে পারি না কোথায় গর্ত আছে বা ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা কিনা। তার মধ্যে যদি ইঞ্জিনে পানি ঢুকে তাহলে পুরো দিনই মাটি। তাই এরকম বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি চালানো অনেক কঠিন। তারপর আবার ভাড়া একটু বেশি চাইলে যাত্রীদের নানান কথা শুনতে হয়।’

টানা বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপরও। মিরপুর ২ নম্বর এলাকায় ভ্যানে সবজি বিক্রি করেন কাওসার মিয়া। তিনি বলেন, ‘এই দুই-তিনদিন ধরে যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, এটা আমাদের ব্যবসার অনেক ক্ষতি করল। সব সবজির দাম তো বাড়তি আছেই। সঙ্গে আমি যে ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করব বা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে বিক্রি করব, সেটাও পারছি না। কারণ কাস্টমার বাসা থেকে বের হতে পারছেন না। আবার আমিও বৃষ্টিতে ভ্যান এত টেনে নিয়ে যেতে পারছি না। তাই বেচাকেনা খারাপ। তারপর আবার সবকিছুর দাম বেশি হওয়াতে মাল কিনতে পারি কম। এই কারণে আমার মতো যারা ভ্যানে করে তরকারি বিক্রি করে, সবারই বেচাকেনার অবস্থা খারাপ।

বৃষ্টিপাত আরো দুদিন থাকবে : আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক বলেন, এমন অঝোর ধারায় বৃষ্টি আরো দুদিন হতে পারে। সারাদেশে যে বৃষ্টিপাত হচ্ছে, সেই ধারা আরো ৪৮ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে। এরপর বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমতে পারে।

ভারী বৃষ্টিপাতজনিত সতর্কবার্তায় আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, রবিবার দুপুর ১২টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে।

তদারকিতে ডিএসসিসি প্রশাসক : ডিএসসিসির জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, রাজধানীর জলজট নিরসন এবং উপড়ে পড়া গাছ অপসারণ করে সড়ক সচল রাখতে ভোর থেকেই মাঠে কাজ করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ওয়ার্ডভিত্তিক ইমারজেন্সি রেসপন্স টিম।

অব্যাহত বৃষ্টিপাতে সৃষ্ট জলজট দ্রুত নিরসনে ডিএসসিসির কমলাপুরের দুটি এবং ধোলাইখালের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাম্পের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন কার্যক্রম শুরু করা হয়। পাশাপাশি সড়কের পানি নিষ্কাশনের মুখগুলো সচল রাখতে ভোর থেকেই কাজ করছে ইমারজেন্সি রেসপন্স টিম। দুপুরে নীলক্ষেতসংলগ্ন আজিমপুরে ইডেন মহিলা কলেজের ২ নম্বর গেটের বিপরীত পাশে একটি বড় গাছ উপড়ে পড়ে সড়ক বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে যান। তিনি হাঁটুসমান পানিতে দাঁড়িয়ে কর্মীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন এবং গাছ অপসারণের কাজ সরজমিন তদারকি করেন। দুপুর ১টার দিকে গাছটি সরিয়ে নেয়ার পর ওই সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

সকাল থেকেই ডিএসসিসি প্রশাসক তার আওতাধীন এলাকার প্রধান সড়ক ও গলিপথ পরিদর্শন করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় চলমান ইমারজেন্সি রেসপন্স টিমের পানি নিষ্কাশন কার্যক্রমও সরজমিন পর্যবেক্ষণ করেন।

ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম বলেন, টানা ভারী বর্ষণে সাময়িক জলজট তৈরি হলেও আমাদের কর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভোর থেকে মাঠে রয়েছে। জলাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করে নগরজীবন স্বাভাবিক রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। এ সময় যেকোনো পরিস্থিতিতে নাগরিকদের ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে সবাইকে সম্মিলিতভাবে এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলার আহ্বান জানান।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

বিশ্বের অন্যতম সুন্দর ৩ প্রজাতির পাখি

বিশ্বের অন্যতম সুন্দর ৩ প্রজাতির পাখি

বিদায় নিয়ে সাদিক কায়েমের আবেগঘন স্ট্যাটাস

বিদায় নিয়ে সাদিক কায়েমের আবেগঘন স্ট্যাটাস

১০০ কোটি ডলার আয়ের ইতিহাস গড়লো ‘মাইকেল’

১০০ কোটি ডলার আয়ের ইতিহাস গড়লো ‘মাইকেল’

বন্যার পানিতে যেসব ভুল কখনো করবেন না

বন্যার পানিতে যেসব ভুল কখনো করবেন না

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App