ইংলিশ চ্যানেলে ডুবল নরওয়ের স্বপ্নের নৌকা
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে শেষ বাঁশি বাজতেই দুই দলের দুই রকম দৃশ্য। একদিকে জুড বেলিংহ্যামকে ঘিরে উল্লাসে ফেটে পড়ছে ইংল্যান্ড। অন্যদিকে হতাশ মুখে মাঠ ছাড়ছেন আর্লিং হলান্ড, মার্টিন ওদেগার্ডরা। বিশ্বকাপজুড়ে একের পর এক চমক দেখিয়ে লেখা নরওয়ের রূপকথার শেষ অধ্যায়টি লিখে দিল ইংল্যান্ড। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ১-১ সমতার পর অতিরিক্ত সময়ে জুড বেলিংহ্যামের দ্বিতীয় গোলে ২-১ ব্যবধানে জিতে ২০১৮ সালের পর আবারো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছে থ্রি লায়ন্সরা।
স্কোরলাইন বলছে ইংল্যান্ড জিতেছে, কিন্তু ম্যাচের গল্প ছিল আরো অনেক গভীর। নরওয়ে হারলেও মাথা উঁচু করেই বিদায় নিয়েছে। ব্রাজিলকে বিদায় করে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা দলটি ইংল্যান্ডের চোখে চোখ রেখে লড়েছে ১২০ মিনিট। এমনকি একসময় ম্যাচ জয়ের দিকেও এগিয়ে ছিল তারা। কিন্তু বড় ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন বেলিংহ্যাম- যেমনটি বড় তারকারা করে থাকেন।
শুরু থেকেই বলের দখলে এগিয়ে ছিল ইংল্যান্ড। হ্যারি কেইন, বুকায়ো সাকা, অ্যান্থনি গর্ডন ও বেলিংহ্যামকে ঘিরে আক্রমণ সাজাচ্ছিল টমাস টুখেলের দল। তবে প্রথম ২৫ মিনিটে সুসংগঠিত নরওয়েজিয়ান রক্ষণ খুব বেশি সুযোগ দেয়নি। ধীরে ধীরে ম্যাচে ছন্দ খুঁজে পায় স্টালে সোলবাক্কেনের দলও।
৩৬ মিনিটে আসে প্রথম বড় বিস্ফোরণ। ইংল্যান্ডের মাঝমাঠে বল কেড়ে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ওঠেন মার্টিন ওদেগার্ড। তার বাড়ানো বল পেয়ে বক্সে ঢুকে দুর্দান্ত শটে জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করেন ২২ বছর বয়সী আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ। বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোলেই নরওয়েকে এগিয়ে দেন এই তরুণ উইঙ্গার। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় ইংলিশ সমর্থকদের গ্যালারি। গোল হজমের পর কিছুটা অস্থির হয়ে পড়ে ইংল্যান্ড। নরওয়ে আরো কয়েকটি বিপজ্জনক আক্রমণও গড়ে তোলে। আর্লিং হলান্ড ও আলেকজান্ডার সোরলথ সুযোগ পেলেও ব্যবধান বাড়াতে পারেননি। সেই সুযোগ হাতছাড়া করাই শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়ায় নরওয়ের জন্য।
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে ম্যাচে ফেরে ইংল্যান্ড। অ্যান্থনি গর্ডনের পাস ধরে বক্সে ঢুকে একাধিক ডিফেন্ডারের মাঝখান থেকে কোনাকুনি জোরালো শটে সমতাসূচক গোল করেন জুড বেলিংহ্যাম। বিরতির ঠিক আগ মুহূর্তে হ্যারি কেইন বল জালে পাঠালেও অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়। ফলে ১-১ সমতা নিয়েই বিরতিতে যায় দুই দল।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচ আরো জমে ওঠে। দুই দলই জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ৫৫ মিনিটে কর্নার থেকে নরওয়ে আবারো বল জালে জড়ালেও ভিএআরে দেখা যায়, কর্নারের আগে এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে ফাউল করেছিলেন হলান্ড। ফলে গোল বাতিল করেন রেফারি। বড় ধাক্কা খায় নরওয়ে। এরপরো থামেনি তাদের আক্রমণ। ৭৫ মিনিটে ক্রিস্তোফার আয়েরের হেড ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। কয়েক মিনিট পর সাকার বিপজ্জনক ক্রসও শেষ মুহূর্তে ক্লিয়ার করেন নরওয়ের ডিফেন্ডাররা। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর কোনো দল গোলের দেখা না পাওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানেই আবারো সামনে এসে দাঁড়ান জুড বেলিংহ্যাম।
অতিরিক্ত সময়েই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেন জুড বেলিংহ্যাম। ৯২তম মিনিটে মর্গ্যান রজার্সের দূরপাল্লার শট নরওয়ের গোলরক্ষক আরিয়ান নাইল্যান্ড ঠেকালেও বল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। ফিরতি বলে সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়ে সহজ ফিনিশে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন বেলিংহ্যাম। টানা দ্বিতীয় নকআউট ম্যাচে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ৬ এ নিয়ে যান রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা।
গোল হজমের পর মরিয়া হয়ে ওঠে নরওয়ে। ৯৯ মিনিটে ইংল্যান্ড সম্ভাব্য একটি পেনাল্টি পেলেও ভিএআরের পর রেফারি সিদ্ধান্ত বদলে দেন। এতে কিছুটা স্বস্তি ফেরে নরওয়ের শিবিরে। অতিরিক্ত সময়ের বিরতিতে কোচ স্টালে সোলবাক্কেন বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে তুলে নেন অধিনায়ক আর্লিং হলান্ডকে। তার জায়গায় নামেন ইয়র্গেন স্ট্রান্ড লারসেন। শেষ ১৫ মিনিটে ওদেগার্ডদের একাধিক আক্রমণও ইংলিশ রক্ষণ ভাঙতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলের হার নিয়েই শেষ হয় বিশ্বকাপে নরওয়ের স্বপ্নযাত্রা।
হারলেও প্রশংসা কুড়িয়েছে নরওয়ে। ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে তারা গ্রুপ পর্ব উতরে নকআউটে আইভরি কোস্টকে হারায়। এরপর রেকর্ড পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে বিদায় করে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। সেই রূপকথার ইতি টানলেও ইংল্যান্ডকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চাপে রেখেছিল ইউরোপের দলটি।
অন্যদিকে বড় ম্যাচে আবারো নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিল ইংল্যান্ড। পুরো ম্যাচে বলের দখল ও আক্রমণে এগিয়ে থাকার পাশাপাশি চাপের মুহূর্তে ধৈর্য হারায়নি টমাস টুখেলের দল। বিশেষ করে বেলিংহ্যাম, হ্যারি কেইন, সাকা ও মর্গ্যান রজার্সের সমন্বিত আক্রমণই শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেয়। যদিও কেইনের একটি গোল অফসাইডে বাতিল হয়, আর নরওয়ের একটি গোল ভিএআরে বাতিল হওয়ায় ম্যাচে নাটকীয়তার কমতি ছিল না।
জোড়া গোল করে বেলিংহ্যাম এখন চলতি বিশ্বকাপে ছয় গোলের মালিক। গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও তিনি শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছেন। বড় ম্যাচে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে ইংল্যান্ডের আক্রমণের প্রধান ভরসায় পরিণত হয়েছেন ২৩ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার।
এই জয়ে ২০১৮ সালের পর আবারো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠল ইংল্যান্ড। ১৯৬৬ সালে একমাত্র শিরোপা জয়ের পর এটি তাদের চতুর্থ সেমিফাইনাল। আগামী ১৫ জুলাই দিবাগত রাত ১টায় (বাংলাদেশ সময়) আটলান্টায় তারা মুখোমুখি হবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার। একদিকে লিওনেল মেসির অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে বেলিংহ্যামের দুর্দান্ত ফর্ম- বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণীয় লড়াই হওয়ার সব উপাদানই রয়েছে এই সেমিফাইনালে।
কোয়ার্টার ফাইনালের এই ম্যাচটি প্রমাণ করেছে, ইংল্যান্ড শুধু তারকানির্ভর নয়; কঠিন পরিস্থিতি সামলে ম্যাচ জেতার মানসিক দৃঢ়তাও অর্জন করেছে। আর নরওয়ে বিদায় নিলেও রেখে গেল সাহসী ফুটবলের এক অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প। ফলাফল ইংল্যান্ডের পক্ষে গেলেও, ১২০ মিনিটের এই লড়াই বিশ্বকাপের স্মরণীয় কোয়ার্টার ফাইনালগুলোর একটি হয়ে থাকবে।
