জনপদ থেকে নামছে পানি, ভেসে উঠছে ধ্বংসের ছাপ
হরলাল রায় সাগর
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের নয়টি জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। বিস্তীর্ণ জনপদ থেকে সরতে শুরু করেছে বানের পানি। পানি নেমে যাওয়ায় উঠে আসছে সড়ক অবকাঠামো ও ফসলি জমির ক্ষয়-ক্ষতির নানা চিত্র। বিভিন্ন স্থানে মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মাছ ও গবাদি পশুর খামারে বড় ধরনের ধ্বংসের ছাপ রেখে গেছে বন্যা। অনেক স্থানে গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার বড় ভরসা অভ্যন্তরীণ সড়কের সিংহভাগই চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও ভেঙে পড়েছে সেতু ও কালভার্ট। পাশাপাশি দুর্গতদের বাড়ছে দুর্ভোগ। বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাব রয়েছে এখনো। কারো কারো ঘরে নেই খাবার। অনেকের চুলায় জ¦লছে না আগুন। ঠাণ্ডাজনিত ও পানিবাহিত রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন বন্যাকবলিত মানুষ। কিন্তু সরকারের ত্রাণ সরবরাহ অব্যাহত থাকলেও তা সব জায়গায় পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
সপ্তাহখানেক ধরে অতি ভারী বৃষ্টি ও পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলে দেশের উত্তর-পূর্ব, পূর্ব-দক্ষিণাঞ্চলে বন্যায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে সরকারের তরফেই বলা হয়েছে। তবে বেসরকারি হিসাবে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো অনেক বেশি। তবে অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখন পর্যন্ত নিরূপণ করতে পারেনি সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। এদিকে পাঁচটি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে আরো কয়েকটি নতুন এলাকা প্লাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে গেলেও সরকার এখন উদ্ধার কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।
চলমান বর্ষা মৌসুমের আষাঢ় মাসের শেষ দিকে এসে অস্বাভাবিক বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় বন্যা দেখা দেয়। নদ-নদীর পানি বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে এই বন্যা ছড়িয়ে পড়ে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম জেলার নিম্নাঞ্চলেও। এছাড়া দেশের বেশিরভাগ জেলার নিম্নাঞ্চলে বৃষ্টির পানি আটকা পড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রাথমিক হিসাবে দেশজুড়ে প্রায় ৩ হাজার ৮৪০ কিলোমিটার সড়ক বন্যার পানিতে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তীব্র পানির স্রোতে এবং পাহাড়ি ঢলে ৩৩৯টি সেতু ও কালভার্ট ভেঙে গেছে বা ধসে পড়েছে। শুধু বান্দরবান জেলায় প্রাথমিক হিসাবে এলজিইডি ও সড়ক বিভাগের প্রায় ১৫১ কিলোমিটার সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে বেশ কিছু এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, শুধুমাত্র চট্টগ্রাম বিভাগের ৫টি জেলাতেই প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৯ হাজার হেক্টরের বেশি ফসলি জমি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। আউশ ধান, আমন বীজতলা এবং গ্রীষ্মকালীন শাকসবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষিমন্ত্রীর দেয়া তথ্যমতে, নতুন রোপণ করা চারার প্রায় ২৫ শতাংশ বন্যার পানিতে আক্রান্ত হয়েছে। বন্যার তীব্র স্রোতে হাজার হাজার পুকুর ও ঘেরের মাছ ভেসে গেছে, যার ফলে শুধু চট্টগ্রাম ও সাতকানিয়া অঞ্চলেই শত কোটি টাকার ওপর ক্ষতি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্লাবিত অঞ্চলে মোট ৭৯ হাজার ১৮৭টি বসতঘর আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ৯ জেলার প্রায় পৌণে তিন লাখ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। গতকাল মঙ্গলবার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় এখন পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ।
বন্যা ও পাহাড় ধসে দেশের সাত জেলায় গতকাল পর্যন্ত ৫৬ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এই সময়ে আহত হয়েছেন আরো ৩৯ জন। ত্রাণমন্ত্রী বলেন, বন্যায় এখন পর্যন্ত সাতটি জেলা এবং সিলেটসহ মোট আটটি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব জেলার ৫৯টি উপজেলা, ৩৬৮টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। প্রায় ৬ লাখ ৯ হাজার ৪৪১ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার বেশিরভাগই পাহাড় ধসে।
বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে সাংবাদিকদের ত্রাণমন্ত্রী বলেন, অতি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে প্রথমে চট্টগ্রাম বিভাগের পার্বত্য এলাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এবং পরে হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেটের কিছু অংশে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
ত্রাণমন্ত্রী বলেন, পানি নামতে শুরু করায় এখন পুনর্বাসন কার্যক্রমই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। কৃষি খাতে ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন চলছে এবং সে অনুযায়ী সহায়তা দেয়া হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বন্যা-পরবর্তী রোগবালাই মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত সংস্কারে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবে। কাঁচা সড়ক কাবিখা ও কাবিটা কর্মসূচির মাধ্যমে সংস্কার করা হবে।
আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, খাদ্য মন্ত্রণালয় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালু রাখবে। এ বছরের বন্যাকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যাগুলোর একটি উল্লেখ করে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি নিজেও বুধবার (আজ) থেকে দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করবেন। তিনি জানান, ৭ জুলাই থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত বন্যাকবলিত সাত জেলার জন্য মোট এক কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং তিন হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
৫ পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার উপরে : বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পর্যবেক্ষণাধীন স্টেশনগুলোর মধ্যে তিস্তা নদীর ডালিয়া (নীলফামারী), সুরমা নদীর ছাতক (সুনামগঞ্জ), কুশিয়ারা নদীর মারকুলি (সুনামগঞ্জ) ও ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট) এবং সোমেশ্বরী নদীর কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) স্টেশনে নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে সিলেট ও সুনামগঞ্জে সুরমা-কুশিয়ারা নদীসংলগ্ন নি¤œাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় উন্নতি হতে পারে। অন্যদিকে রংপুরের কাউনিয়ায় তিস্তা নদীর পানি সাময়িকভাবে বিপৎসীমা অতিক্রম করে স্বল্পমেয়াদি বন্যার সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
আগামী ৭২ ঘণ্টায় দেশের অভ্যন্তরে এবং ভারতের আসাম, মেঘালয়, অরুণাচল ও পশ্চিমবঙ্গে মাঝারি থেকে মাঝারি-ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।
গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা নদীগুলোর পানি কমেছে। আগামী একদিন পানি স্থিতিশীল থাকতে পারে এবং পরবর্তী দুদিনে আরো কমতে পারে। এতে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার সুরমা-কুশিয়ারা নদীসংলগ্ন নি¤œাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
এছাড়া সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের যাদুকাটা, ভুগাই-কংস ও সারিগোয়াইন নদীর পানিও কমেছে। তবে সোমেশ্বরী নদীর পানি বেড়েছে। আগামী একদিন পানি স্থিতিশীল থেকে পরবর্তী দুদিনে কমতে পারে। ফলে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদীসংলগ্ন নি¤œাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকার পর উন্নতি হতে পারে।
অন্যদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বেড়েছে। আগামী একদিন তা স্থিতিশীল থাকতে পারে এবং পরবর্তী দুদিনে কমতে পারে। এতে আগামী ২৪ ঘণ্টায় নীলফামারী ও লালমনিরহাটে তিস্তা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
তবে রংপুর জেলার কাউনিয়া স্টেশনে তিস্তা নদীর পানি সাময়িকভাবে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এর ফলে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে এবং এসব নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের টাঙ্গন, পুনর্ভবা, ঘাঘট, আত্রাই, আপার আত্রাই, মহানন্দা, যমুনেশ্বরী, আপার করতোয়া ও করতোয়া নদীর পানি আগামী তিন দিন পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
