আটলান্টায় ‘ফকল্যান্ড’ যুদ্ধ
মুহাম্মদ রুহুল আমিন
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফুটবলের ভাষায় আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড কেবল একটি ম্যাচ নয়, এটি ইতিহাস, আবেগ, রাজনীতি আর প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক বিরল সংমিশ্রণ। বিশ্বকাপের মঞ্চে দুই দলের দেখা হলেই ফিরে আসে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড (আর্জেন্টিনার ভাষায় মালভিনাস) যুদ্ধ, দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’, ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’, ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড কিংবা অসংখ্য বিতর্কের স্মৃতি। সেই দীর্ঘ ইতিহাসে আজ বুধবার বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় যোগ হতে যাচ্ছে আরেকটি অধ্যায়। ২০২৬ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ১৯৬৬ সালের পর আবার শিরোপার স্বপ্ন দেখা ইংল্যান্ড।
ম্যাচটির গুরুত্ব কেবল ফাইনালের টিকেটে সীমাবদ্ধ নয়। একদিকে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের পথে আরেক ধাপ এগোতে চায়। অন্যদিকে প্রায় ৬ দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারো বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে ওঠার সুযোগ দেখছে ইংল্যান্ড। ফলে এটি দুই দলের সামর্থ্যরে লড়াই যেমন, তেমনি দুই প্রজন্মের স্বপ্নেরও সংঘর্ষ।
আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রেক্ষাপট ফকল্যান্ড যুদ্ধ। দক্ষিণ আটলান্টিকের ওই দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে ১৯৮২ সালে ৭৪ দিনের যুদ্ধে জড়ায় আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্য। যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন ও ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হন। ব্রিটেন সামরিকভাবে জয়ী হলেও দ্বীপটির মালিকানা নিয়ে আর্জেন্টিনার দাবি কখনো থেমে যায়নি।
যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যারাডোনা দুটি গোল করে ইতিহাস বদলে দেন। প্রথমটি হাত দিয়ে- যা পরে ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে পরিচিত হয়। চার মিনিট পর করেন একক নৈপুণ্যে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল। পরে ম্যারাডোনা স্বীকার করেছিলেন, সেই জয়কে তিনি ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতীকী প্রতিশোধ হিসেবে দেখেছিলেন। এরপর থেকেই আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচ ফুটবলের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশেষ আবেগের নাম হয়ে ওঠে।
তবে এবার দুই দেশ থেকেই ভিন্ন বার্তা এসেছে। আর্জেন্টিনার যুদ্ধপ্রবীণদের সংগঠন সমর্থকদের মনে করিয়ে দিয়েছে, এই ম্যাচ কোনো যুদ্ধের প্রতিশোধ নয়; এটি কেবল ফুটবল। কোচ লিওনেল স্কালোনি ও ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডও একই কথা বলেছেন- মাঠে সিদ্ধান্ত হবে ফুটবলের, রাজনীতির নয়।
২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পরও লিওনেল মেসির ক্ষুধা কমেনি। ২০২৬ বিশ্বকাপেও তিনি আর্জেন্টিনার আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু। গোল করা, সুযোগ তৈরি, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ- সব ক্ষেত্রেই তার প্রভাব স্পষ্ট। বড় ম্যাচে অভিজ্ঞতা এবং মুহূর্তের মধ্যে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার সামর্থ্যই তাকে এখনো আলাদা করে। তবে এই আর্জেন্টিনা শুধু মেসির ওপর নির্ভরশীল নয়। স্কালোনির অধীনে দলটি আরো ভারসাম্যপূর্ণ। রক্ষণ থেকে আক্রমণ- প্রতিটি বিভাগে রয়েছে কার্যকর সমন্বয়। বলের দখল ধরে রেখে আক্রমণ গড়া যেমন পারে, তেমনি দ্রুত পাল্টা আক্রমণেও সমান দক্ষ।
ইংল্যান্ড এবারের বিশ্বকাপে নিজেদের সবচেয়ে পরিণত দলগুলোর একটি হিসেবে প্রমাণ করেছে। শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, শক্তিশালী মিডফিল্ড, কার্যকর সেটপিস এবং দ্রুত ট্রানজিশন- সব মিলিয়ে তারা কঠিন প্রতিপক্ষ। নকআউট পর্বে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাদের আত্মবিশ্বাস আরো বাড়িয়েছে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মেসিকে জায়গা না দেয়া। আবার আর্জেন্টিনার জন্য বড় পরীক্ষা হবে ইংল্যান্ডের শারীরিক শক্তি ও সংগঠিত রক্ষণ ভাঙা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নকআউট ম্যাচের মানসিক চাপ। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে একটি ছোট ভুলও পুরো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। আর্জেন্টিনার পক্ষে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা কিছুটা বাড়তি সুবিধা এনে দিতে পারে। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের এই দলটিও আগের প্রজন্মের মতো মানসিক চাপে ভেঙে পড়া দল নয়। ধারাবাহিকভাবে বড় টুুর্নামেন্টের শেষ দিকে ওঠার অভিজ্ঞতা তাদের আরো পরিণত করেছে। ফলে শুরু থেকেই দুই দলই ঝুঁকি কম নিয়ে প্রতিপক্ষের ভুলের অপেক্ষায় থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে ম্যাচটি কৌশলগত লড়াইয়ে রূপ নেয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
প্রথমত, মেসি বনাম ইংল্যান্ডের রক্ষণ। বল পায়ে জায়গা পেলেই মেসি ম্যাচের চিত্র পাল্টে দিতে পারেন। তাই তাকে মাঝমাঠ থেকেই চাপে রাখার চেষ্টা করবে ইংলিশরা। দ্বিতীয়ত, মিডফিল্ডের নিয়ন্ত্রণ। যে দল বলের দখল ও খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করবে, তারাই ম্যাচের গতি নির্ধারণ করবে। তৃতীয়ত, সেটপিস। সেমিফাইনালের মতো ম্যাচে একটি কর্নার কিংবা একটি ফ্রি-কিকই ভাগ্য গড়ে দিতে পারে। দুই দলই এই জায়গায় কার্যকর হওয়ায় সেটপিস বড় ফ্যাক্টর হতে পারে।
বিশ্বকাপে দুই দলের প্রতিটি লড়াই আলাদা গল্প তৈরি করেছে। ১৯৬৬ সালে বিতর্কিত কোয়ার্টার ফাইনাল, ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার জাদু, ১৯৯৮ সালে ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড ও টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার জয়, ২০০২ সালে ইংল্যান্ডের প্রতিশোধ- প্রতিটি ম্যাচই ইতিহাসের অংশ। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হতে যাচ্ছে আরেকটি সেমিফাইনাল। তবে ৪ দশক আগের যুদ্ধ কিংবা অতীতের বিতর্ক মাঠে কোনো গোল এনে দেবে না। ফাইনালে উঠবে সেই দল, যারা নিজেদের পরিকল্পনা সবচেয়ে নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবে।
পরিসংখ্যান বলছে, নকআউট পর্বে দুই দলই প্রতিপক্ষকে খুব বেশি সুযোগ দেয়নি। তাই ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের পাশাপাশি বেঞ্চের খেলোয়াড়, কোচের কৌশলগত পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত সময়ের সম্ভাবনাও ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সেমিফাইনালের মতো ম্যাচে প্রায়ই দেখা যায়, প্রথম একাদশের বাইরের একজন ফুটবলারই হয়ে ওঠেন নায়ক।
আটলান্টার রাত তাই শুধু আরেকটি সেমিফাইনালের অপেক্ষায় নয়- এটি এমন এক লড়াইয়ের অপেক্ষায়, যেখানে ইতিহাস থাকবে পেছনের ক্যানভাসে, কিন্তু সিদ্ধান্ত হবে বর্তমানের ফুটবলে। একদিকে টানা দ্বিতীয় শিরোপার স্বপ্নে বিভোর আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে প্রায় ৬০ বছরের অপেক্ষা ঘোচানোর প্রত্যয়ে ইংল্যান্ড। সব হিসাব শেষে উত্তর মিলবে সবুজ ঘাসেই- কে পাবে বিশ্বকাপের ফাইনালের টিকেট, আর কার জন্য শেষ হয়ে যাবে স্বপ্নের যাত্রা।
